আইএলও কে সন্তুষ্ট ও মালিকদের শোষন ও মুনাফার স্বার্থ রক্ষার জন্যই শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে-সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট

Logo-SLFশ্রম আইন সংশোধন ২০১৮ করার মাধ্যমে সরকার আইএলও কে সন্তুষ্ট ও মালিকদের স্বার্থ রক্ষার কাজ একই সাথে করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রাজ্জাক ও সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন এক বিবৃতিতে বর্তমান সরকার কর্তৃক দ্বিতীয় বার শ্রম আইন সংশোধন ২০১৮ করা প্রসঙ্গে বলেন, শ্রমিকদের অধিকারের আইনি স্বীকৃতি হল শ্রম আইন, গণতান্ত্রিক আইন বলা যাবে তাকে যে আইন কারো বৈষম্য করবে না, যে আইন গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষা দিবে এবং যে আইনের চোখে সকলেই সমান বিবেচিত হবে। শ্রম আইন ২০০৬ প্রবর্তনের পর থেকেই দীর্ঘদিন ধরেই শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ধারাসমূহ বাতিল করার কথা শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হল কিন্তু সরকার ২০১৩ এর ন্যায় ২০১৮ সালেও যে সংশোধনী করা হয়েছে তাতেও পুরনো ধারার সাথে নতুন করে আরো অগণতান্ত্রিক ধারা বা আইন যুক্ত করছে।
মালিকের অবহেলা জনিত কারণে শ্রমিকের মৃত্যুতে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ দিন বিশেষ করে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এ বিষয়টি আরোও জোরালো হল। কিন্তু সরকার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে ফ্যাটাল অ্যাকসিডেন্ট এ্যাক্ট, আইএলও কনভেনশন, সোহরাওয়ার্দী কমিশনের সুপারিশ ও দেশে বিভিন্ন মৃত্যুতে (রানা প্লাজা, সড়ক দুর্ঘটনা, নির্মাণ) প্রদত্ত ক্ষতিপূরণ (১০ লাখ থেকে ৬৭ লাখ) প্রদানের বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে ২০০৬ সালের আইনে প্রদেয় ১ লাখ টাকার পরিবর্তে দ্বিগুণ করে ২ লাখ টাকা দেওয়া ঘোষণা দিয়ে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্ত বিবেচনা বাদ দিয়ে একজন শ্রমিকের জীবনের দাম ২ লাখ টাকা! এটা শ্রমিক ও তার পরিবারের সাথে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, আইনের চোখে সবাই সমান বা কারো প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবেনা একথাগুলি আমাদের সংবিধানে ও আইনে থাকলেও দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করে মাতৃত্বকালীন ছুটি সরকারি শ্রমিক-কর্মচারী ৬ মাস ভোগ করলেও বেসরকারি ক্ষেত্রে ৪ মাস এর বিধান এখনও চালু থাকলো। এর মাধ্যমে একদেশে দুই বিধান ও অধিকারের বৈষম্য চালু থাকলো। উল্টো এতদিন ধরে চলে আসা অর্জিত অধিকার মাতৃত্বকালীন ছুটিকে মাতৃত্বকালীন অনুপস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করাসহ এ বিষয়টিকে আরো জটিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে একজন নারী শ্রমিককে চাকুরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। পূর্বে ৮ ঘন্টা কর্মদিবসের মধ্যেই ১ ঘন্টা খাবার বিরতি ছিল। এখন সংশোধনী এনে খাবার বিরতি ৮ ঘন্টার বাইরে নেওয়া হল এবং এর সাথে অতিরিক্ত ২ ঘন্টা কাজ করার অনুমতি দিয়ে মালিক পক্ষকে বাস্তবে ১১ ঘন্টা কর্মদিবস চালু করল। বাস্তবে মালিকের শোষন ও মুনাফার স্বার্থেই এই শ্রম আইনের সংশোধন।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী যে কোন শ্রমিকের স্বাধীনভাবে সংগঠন ও নেতা নির্বাচন করার অধিকার থাকার কথা। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে আইএলও কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও শ্রম আইনে ৩০ শতাংশ সমর্থন ছাড়া শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার বিধান এতদিন চালু ছিল এখন তা সংশোধন করে ২০ শতাংশ করার কথা বলা হচ্ছে যা আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ এর সাথে সম্পূর্ণ বিরোধাত্মক। আর শ্রম আইনের ২৩ ধারা অসদাচরণ ও দ- প্রাপ্তির শাস্তি, ২৬ ধারা মালিক কর্তৃক শ্রমিকের চাকুরির অবসান, ২৭ ধারা শ্রমিক কর্তৃক চাকুরির অবসান ও ১৮০ ধারা ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য হওয়ার অযোগ্যতা এই ধারাসমূহ বহাল থাকলে কোন শতাংশ নয়, শ্রমিকের ইউনিয়ন করা না করা মালিকদের ইচ্ছা ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। শতাংশ দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্তারোপ করা নয় আমরা অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার চাই। আর ‘যেখানে ট্রেড ইউনিয়ন থাকবে না সেখানে অংশগ্রহণকারী কমিটি (PC) ট্রেড ইউনিয়ন যত কাজ করতে পারবে’ শ্রম আইন সংশোধন করে এই বাক্য সংযোজন করার ফলে মালিকরা অংশগ্রহণকারী কমিটি করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হবে। কারণ পিসি কমিটি মালিকদের পরিচালিত মালিক-শ্রমিকদের একটি সংগঠন। যা মালিকের ইচ্ছায় পরিচালিত হয়। এর দ্বারা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কাজেই এই সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার আইএলও’র কাছে মুখ রক্ষা এবং মালিকদের মান রক্ষার কাজটি একই সাথে করলো।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এর মাধ্যমে সরকার আইএলওকে সন্তুষ্ট ও মালিকদের স্বার্থ রক্ষার কাজটিও একই সাথে করা হচ্ছে বলে জানান। নেততৃবৃন্দ অবিলম্বে শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী এই অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বালিত করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রবর্তন করার দাবি করেন।