উত্তরবঙ্গ তথা বাংলাদেশকে মরুভূমি হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা করুন

2017_02_16_11_7_b-D-star১৪ ফেব্রুয়ারি ’১৭ বগুড়ার সাত মাথায় উদ্বোধন শেষে বগুড়া থেকে তিস্তা ব্যারেজ অভিমুখী রোডমার্চ
তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বাসদ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের উদ্যোগে ১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি ’১৭ দুইদিনব্যাপী বগুড়া থেকে তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত রোডমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ ১৫ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় বগুড়ার সাতমাথায় বাসদ বগুড়া জেলা আহ্বায়ক অ্যাড. সাইফুল ইসলাম পল্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। রোডমার্চের উদ্বোধন করেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, ভাষা সৈনিক প্রবীন রাজনীতিবিদ জনাব মাহফুজুল হক দুলু, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, কমরেড জাহেদুল হক মিলু, নওগাঁ জেলা বাসদ সমন্বয়ক কমরেড জয়নাল আবেদিন মুকুল, সিরাজগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক কমরেড নব কুমার কর্মকার, রাজশাহী জেলা আহ্বায়ক কমরেড দেবাশীষ রায় ও সাইফুজ্জামান টুটুল। উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে রোডমার্চটি তিস্তা ব্যারেজ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে সাতমাথা থেকে শহর প্রদক্ষিণ করে মাটিডালি পর্যন্ত মিছিল করে যায়। পথিমধ্যে রোডমার্চ মহাস্থানগড়, মোকামতলা, ফাঁসিতলা, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ি, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, শঠিবাড়ী ও মডার্ন মোড়ে সমাবেশ করে মিছিলসহকারে রংপুর শহরে যায় এবং সেখানে রাত্রীযাপন করে এবং পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ শহিদ মিনারে সমাবেশ শেষে মিছিলসহকারে মেডিকেল মোড়, পাগলাপীর, তারাগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা, তিস্তা ব্যারেজ গিয়ে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী সমাবেশে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশ আজ মরুকরণের হুমকীর মুখে। উজানে পানি সরিয়ে নেয়ার ভারতীয় আগ্রাসী তৎপরতা ও দেশের ভিতরে সরকারের ভ্রান্তনীতি ও দখল-দূষণে ১২০০ নদী কমে ২৩০ এ নেমে এসেছে এবং নদীর চেহারা খালে পরিণত হয়েছে। দেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী তিস্তায় শুষ্ক মৌসুম আসতে না আসতেই পানি প্রবাহ আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গেছে। ২০ জানুয়ারি ২০১৭ তিস্তার পানি প্রবাহ ছিল ইতিহাসে সর্বনি¤œ ৪০০ কিউসেক (২১ জানুয়ারি ২০১৭ বাংলাদেশ প্রতিদিন)। ঐতিহাসিক গড় (১৯৭৩-১৯৮৫) অনুযায়ী এই পানির প্রবাহ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক। বিগত কয়েক বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। তিস্তা ব্যারেজের বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে ১ লক্ষ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে যে সেচ সুবিধা প্রদান করা হতো তা কমতে কমতে ইতিমধ্যে বন্ধ হওয়ার পথে। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বর্তমান সেচ মওসুমে লক্ষ্যমাত্রা রংপুর ও দিনাজপুরের কমান্ড এলাকা বাদ দিয়ে শুধু নীলফামারীর ৮ হাজার হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবার কারণে বিকল্প সেচ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, তিস্তার এই বেহাল অবস্থা কেন? প্রমত্তা তিস্তা নামে খ্যাত এই নদী পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের পরে চতুর্থ বৃহত্তম নদী। উত্তর সিকিমে সোলাস হ্রদ থেকে শুরু করে হিমালয় পর্বতের বুক চিরে সাপের মত এঁকে বেঁকে ভারতের জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ছাতনাই দিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে তিস্তা। ৩১৫ কি.মি. দীর্ঘ তিস্তা অববাহিকার ১১৫ কি.মি. ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ১৭% পড়েছে বাংলাদেশে। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়া সত্বেও ভারত একতরফা বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের জন্য পানি প্রত্যাহার করে নেবার পর বাংলাদেশের জন্য পানি ছেড়েছে।
কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ভারত থেকে আগত ৫৪টি নদীতে একতরফা বাঁধ দিয়ে সকল প্রকার আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতি লংঘন করে পানি প্রত্যাহার করছে। ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার কথা সকলের জানা আছে। সুরমা-কুশিয়ারা তথা মেঘনা নদীর উজানে বরাক নদীর টিপাই মুখে বাঁধ দিয়ে ভারত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে কার্যত সুরমা-কুশিয়ারা তথা মেঘনা নদীকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য আন্তঃনদী সংযোগের খড়গ মাথায় ঝুলছে। ভারতের এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে নদীমাতৃক সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ অনিবার্যভাবে মরুভূমির দেশে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাসহ ভারত থেকে আগত সকল আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি ভারত সরকার বিভিন্ন অজুহাতে ঝুলিয়ে রেখেছে। ভারতের শাসকগোষ্ঠী তাদের হীন স্বার্থে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে কখনো পানি সমস্যাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে, কখনো সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার নামে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। একই ভাবে বর্তমান সরকারসহ অতীতের সকল সরকার নির্লজ্জভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের প্রতি নতজানু থেকে কার্যত ভারতের আগ্রাসী পানি নীতিকে সমর্থন যুগিয়েছে। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার ও সরকারের নতজানু নীতির প্রতিবাদে এবং পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে সোচ্চার হোন। ভারত আন্তর্জাতিক নীতি লংঘন করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ন্যূনতম স্বার্থ বিবেচনা না করে একের পর এক নদীর পানি প্রত্যাহার করছে। বাংলাদেশের সরকার কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বাসদসহ বিভিন্ন বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলসমূহের পক্ষ থেকে বার বার দাবি জানানো সত্বেও ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের কারোরই কর্ণ-কুহরে এই দাবি প্রবেশ করছে না। জোট-মহাজোটের ভোটের রাজনীতির কাছে দেশ, জনগণ, নদ-নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ কোন কিছুই গুরুত্ব পায় না। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার আর সরকারের নতজানু নীতির প্রতিবাদে এবং তিস্তাসহ সকল নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর উদ্যোগে ৫-১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দুই দিনব্যাপী বগুড়া-তিস্তা রোডমার্চ কর্মসূচি পালিত হয়। সকল বাম প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, পরিবেশ ও নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণকে তিস্তা রোডমার্চ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার এবং আর্থিক-নৈতিক সকল প্রকার সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছি।
কমরেড বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘শুধু তিস্তার পানিরই সমস্যা নয়, ফারাক্কার প্রভাবে গোটা উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হওয়ার পথে। ভারতের সাথে পদ্মা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীসহ ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে এবং অভিন্ন নদীর পানি সমন্বিত ও যৌথ ব্যবস্থাপনা-ব্যবহার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং এ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চীন, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সাথে যৌথ অববাহিকা কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশে এসে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেক কিছু নিয়ে গেলেন অথচ তিস্তাসহ পানির ন্যায্য হিস্যার চুক্তি করলেন না। কারণ আমাদের সরকার তো না চাইতেই সব দিয়ে দেয়ার জন্য বসে আছে। ফলে আমরা আমাদের অধিকার আদায় করতে পারছি না।
তিনি বলেন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব জয় সংকর ঢাকা আসবেন, এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের কথা রয়েছে। এবারে তিস্তার পানি চুক্তি ছাড়া বাংলাদেশের জনগণ অন্য কিছু দেখতে চায় না। আর তিস্তা চুক্তি করতে না পারলে জনগণকে আন্দোলনের মাধ্যমেই পানির ন্যায্য হিস্যা যেমন আদায় করতে হবে তেমনি নতজানু সরকারের বিরুদ্ধেও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
কমরেড জাহেদুল হক মিলু বলেন, ‘বাস্তবে ভারত বন্ধু বা হিন্দু নয় একটি সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। ফলে সা¤্রাজ্যবাদের চরিত্র অনুযায়ী ভারত পার্শ্ববর্তী দেশের উপর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামরিক-সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়। সেই জন্যই ভারতের বাতিল প্রকল্প বাংলাদেশে এনে সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করার চক্রান্ত করছে। বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহার করতে চায় অথচ তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি এবং মাত্র ৩০ কি.মি. করিডোর দিচ্ছে না নেপাল, ভুটানের সাথে যোগাযোগের জন্য। কেউ কেউ আবার ভারত বিরোধিতার নামে উগ্র সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে ফায়দা তুলতে চায়।’
১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠের সমাবেশে জেলা বাসদ সমন্বয়ক কমরেড আব্দুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, জাহেদুল হক মিলু, রাজেকুজ্জামান রতন, ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য ও নওগাঁ জেলা বাসদ আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল, বগুড়া জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম পল্টু, রংপুর জেলা সদস্যসচিব মমিনুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক নিখিল দাস, ছাত্র ফ্রন্টের রংপুর জেলা আহ্বায়ক সাদেক হোসেন প্রমুখ। রোডমার্চের সাথে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রবীণ জননেতা মোহাম্মদ আফজাল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমরেড শাহাদত হোসেন, সাংস্কৃতিক কর্মী ডা. মফিজুল ইসলাম মন্টু।
পাবলিক লাইব্রেরি মাঠের সমাবেশ শেষে রোডমার্চটি তিস্তা ব্যারেজ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। পথিধমধ্যে পাগলাপীর, তারাগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা, তিস্তা ব্যারেজসহ বিভিন্ন স্থানে জনসংযোগ, পথসভা ও সমাবেশ শেষে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্ট পার হয়ে লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলার সাধুর বাজারে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জয়পুরহাট জেলা বাসদ আহ্বায়ক অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, জাহেদুল হক মিলু, রাজেকুজ্জামান রতন, সাইফুল ইসলাম পল্টু, জয়নাল আবেদীন মুকুল, আব্দুল কুদ্দুস, ফুলবর রহমান, নীলফামারী জেলা সমন্বয়ক ইউনুস ও লালমনিরহাট জেলা সংগঠক প্রভাষক কামরুজ্জামান সুজনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ প্রমুখ।
সমাবেশ থেকে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব জয় সংকরএর ঢাকায় সফরের সময় তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ, ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জেলাসমূহে সভাসমাবেশ, জনসংযোগ ও জনমত সংগঠিত করা এবং এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে চুক্তির দাবিতে ৩০ মার্চ ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে মিছিলসহকারে স্মারকলিপি পেশ করা হবে।