কমরেড লেনিনের শিক্ষা থেকে

V.I Lenin-19কমরেডস, আমরা এখন ইতিহাসের অন্যতম সংকটপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত আগ্রহোদ্দীপক সময়ের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছি। এটা এমন এক সময় যখন বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিণতির দিকে যাচ্ছে। যারা সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব ও সম্ভাবনা থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন, এখন তাদের কাছেও এটা দৃশ্যমান হচ্ছে যে, এই যুদ্ধটা যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে শেষ হবে না। অর্থাৎ পুরনো সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক উপায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে এটা শেষ হবে না। রাশিয়ান বিপ্লব এটা দেখিয়েছে যে, এই যুদ্ধের ফল (শ্রমিকশ্রেণি ও শোষকদের মধ্যে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে) অনিবার্যভাবে পুঁজিবাদী সমাজকে ভাঙ্গনের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। এখানেই রাশিয়ান বিপ্লবের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।
বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ এখন এটা অনুভব করে যে, রাশিয়ান বিপ্লব তাদের নিজেদের স্বার্থেই হয়েছে, তা আমাদের পথে যত বড় বাধাই থাকুক, বিপ্লব সম্পর্কে মিথ্যা ও অপবাদ ছড়ানোর জন্য দেশে দেশে যত শত সহস্র কোটি টাকাই খরচ করা হোক না কেন। দুই সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যকার যুদ্ধের সাথে সাথে অন্য একটি যুদ্ধ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে, যা কিনা শ্রমিকশ্রেণি রাশিয়ান বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সব লক্ষণ এখন এটাই নির্দেশ করে যে অস্ট্রিয়া এবং ইটালি এখন বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এসব দেশে আগের শৃঙ্খলা দ্রুত ভেঙ্গে পড়ছে। জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো অধিকতর শক্তিশালী ও স্থিতিশীল দেশগুলোতেও একই প্রক্রিয়া চলছে, যদিও তার ধরনটা আলাদা ও তেমন দৃশ্যমান নয়। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা ও যুদ্ধের পতন অনিবার্য।
জার্মান সাম্রাজ্যবাদীরা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক লাটভিয়া, ফিনল্যান্ড ও ইউক্রেনে বিপ্লব উৎখাত করতে যে মূল্য জার্মানিকে দিতে হয়েছে তা তার সেনাবাহিনীর জন্য হতাশাজনক। পশ্চিম ফ্রন্টে জার্মানির পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো তার আগের সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব এখন আর নেই। জার্মান সৈন্যদের ‘রুাশিকরণ’ নিয়ে সেদেশের কূটনীতিকরা যে ঠাট্টা করত এখন সেটা আর তা নেই বরং সত্যে পরিণত হয়েছে। সৈন্যদের ভিতর প্রতিবাদের স্পৃহা বাড়ছে আর ‘দেশদ্রোহীতা’ একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স রাষ্ট্র তাদের নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করছে। … এমনকি বুর্জোয়া পত্রিকাগুলোও এটা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে যে, শ্রমিক শ্রেণির চেতনার মধ্যেও একটা স্পষ্ট পরিবর্তন হয়েছে, ফ্রান্সে ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ এর ধারণা ভেঙ্গে যাচ্ছে, ব্রিটেনে শ্রমিকশ্রেণি ‘সিভিল ট্রুস’ অস্বীকার করছে। এর মানে হল ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের শেষ তাসের কার্ডটা খেলেছে এবং আমরাও দৃঢ় প্রত্যয়ে বলতে পারি যে ঐ কার্ডটাও ওভার ট্রাম্প করা হবে। কিছু লোকের দল যতই বলুক যে বলশেভিকদের পিছনে ক্ষুদ্র একটা জনগোষ্ঠী আছে, তাদের এটা স্বীকার করতেই হবে যে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে লড়ার মত কোন শক্তি তারা রাশিয়াতে খুঁজে পাচ্ছে না, বরং বাইরের হস্তক্ষেপ অবলম্বন করতেই তারা বাধ্য হচ্ছে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণি তাই ভয়ানক এক দখলদারিত্বের যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যার উদ্দেশ্যই হচ্ছে রাশিয়ার বিপ্লবকে নস্যাৎ করা। এর মানে হলো ব্রিটিশ ও ফরাসি তথা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ তার শেষ পর্যায়ে আছে ।
আমরা সবধরনের অসুবিধা মোকাবেলা করেছি, যদিও এই দেশে যেখানে জনগণ নিজেই যুদ্ধ দূর করেছে এবং আগের সেনাবাহিনী ধ্বংস করেছে, গৃহযুদ্ধের মধেই একটা নতুন সেনাবাহিনী গড়েছে সেখানে আবার সামরিক আইন জারি করা কঠিন ছিল। সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছে এবং চেক, শ্বেতপ্রহরী, ভূস্বামী, পুঁজিপতি আর কুলাকদের বিরুদ্ধে জয় নিশ্চিত। শ্রমিকশ্রেণি অনুভব করে যে তারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই লড়াই করছে, পুঁজিপতিদের জন্যে নয়। রাশিয়ার শ্রমিক এবং কৃষকরা প্রথমবারের মতো কারখানা পরিচালনার, ভূমি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, এবং এই অভিজ্ঞতার প্রভাব অবশ্যই থাকবে। আমাদের সেনাবাহিনী কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্য বাছাইকৃত শ্রেণিসচেতনদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। তাই তাদের মধ্যে থেকে যে ফ্রন্টে যাচ্ছে সে এই বিষয়ে সচেতন যে সে বিশ্ববিপ্লব ও রাশিয়ান বিপ্লবের লক্ষ্যেই লড়ছে; যাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে রাশিয়ান বিপ্লব কেবল অনেকগুলো ধারাবাহিক বিপ্লবের মধ্যে প্রথম পদক্ষেপ যার ফলে যুদ্ধ শেষ হতে বাধ্য।
আমরা এখন যে সংগ্রাম চালাচ্ছি তার মধ্যে শিক্ষাও একটা অংশ। আমরা সততা ও পূর্ণসত্য দিয়েই হঠকারীতা এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি। যুদ্ধটা এটা পরিস্কারভাবে দেখিয়েছে, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা’ এর মানে কি, যেটাকে বুর্জোয়ারা তাদের একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এটা আমাদের দেখিয়েছে যে মুষ্ঠিমেয় কিছু বিত্তবান তাদের নিজ স্বার্থে পুরো জাতিকেই সংহার করে। বুর্জোয়া গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে কাজ করে এই ধারণা চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে। আমাদের সংবিধান, আমাদের সোভিয়েত যা ইউরোপে নতুন কিন্তু যেগুলোর মাধ্যমে আমরা ১৯০৫ এর বিপ্লবের সাথে পরিচিত হয়েছি, সেগুলো বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মিথ্যা ও স্ববিরোধীতা সম্পুর্ণভাবে উন্মোচন করে আন্দোলনের আর প্রচারের চমৎকার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। আমরা প্রকাশ্যে এটা ঘোষণা দিয়েছি যে শ্রমিক ও শোষিত জনগণের শাসনের মধ্যেই আমাদের শক্তিমত্তা ও অপরাজেয়তা নিহিত রয়েছে।
ঠিক একই জিনিস শিক্ষার ক্ষেত্রেও সত্যি, মার্জিত ও বুর্জোয়া রাষ্ট্র খুবই সুক্ষ্মভাবে এই মিথ্যা প্রচার করে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতির উর্ধ্বে ও সমগ্র সমাজকে সেবা দিতে পারে।
আসলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বুর্জোয়াদের শ্রেণি স্বার্থের হাতিয়ারেই পরিণত হয়েছিল। এগুলো বুর্জোয়াদের শ্রেণিচেতনা দ্বারা সম্পুর্ণভাবে প্রভাবিত ছিল। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল বুর্জোয়াদের অনুগত দাস আর যোগ্যতাসম্পন্ন শ্রমিক সরবরাহ করা। যুদ্ধ আমাদের এটা দেখিয়েছে যে আধুনিক প্রযুক্তির অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারগুলো লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের নির্মম শোষণ করতে আর পুঁজিপতিদের জন্য বিশাল মুনাফা তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে,যুদ্ধ তাদের সৌভাগ্যের পথ উন্মুক্ত করেছে। আমরা সত্য উদঘাটন করছি এবং মিথ্যাকে উন্মোচন করে দিয়েছি ফলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা হারিয়ে গেছে। আমরা বলি যে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের কাজ বুর্জোয়াদের উৎখাতের সংগ্রামের অংশ। আমরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করি যে শিক্ষা জীবন ও রাজনীতি থেকে বিছিন্ন তা মিথ্যা এবং শঠতাপূর্ণ। বুর্জোয়া সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতরা এই শঠতা করে এসেছেন। তাদের ষড়যন্ত্রের ফলে বরং এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, তারা শিক্ষাকে তাদের একচেটিয়া অধিকারে পরিণত করেছে এবং শিক্ষা ব্যবহৃত হচ্ছে সাধারণ মানুষকে শাসন করার হাতিয়ার হিসেবে। যা আমরা লক্ষ লক্ষ প্রচারপত্র ছেপে, শত সহস্র বক্তৃতা দিয়ে, আন্দোলনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারতাম না তার চেয়েও ভালভাবে সমাজে এটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠেছে তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। তারা তাদের শিক্ষাকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে হতাশা ছাড়ানোর কাজে ব্যবহার করেছে এবং খোলাখুলিভাবে শ্রমজীবী মানুষের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ান কৃষক ও শ্রমিকদের কাছে বিপ্লবী সংগ্রামই সত্যিকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তারা দেখেছে যে শুধুমাত্র আমাদের সমাজব্যবস্থাই তাদের সত্যিকারের শাসন নিশ্চিত করে, তারা নিজেদেরকে এটা বুঝাতে পেরেছে যে কুলাক, ভূস্বামি ও পুঁজিপতিদের শোষণ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে রাষ্ট্র সবকিছুই করছে। শ্রমজীবী জনসাধারণ জ্ঞান অর্জনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে কারণ বিজয় অর্জনের জন্য তাদের এটা দরকার। দশজনের মধ্যে নয়জন শ্রমিক এটা উপলদ্ধি করতে পারছে যে, তাদের এই শৃঙ্খল ভাঙার সংগ্রামে জ্ঞান একটা অস্ত্র, শিক্ষার অভাবেই তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। আর তাই এখন সবাইকে শিক্ষার সুযোগ দেয়ার দায়িত্ব তাদেরই। আমাদের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট কারণ জনগণ নিজেরাই নিজেদেরকে নতুন রাশিয়া গড়ার লক্ষে প্রস্তুত করেছে। তারা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছে, তাদের ভুল ও ব্যর্থতা থেকে শিখছে এবং শিক্ষা তাদের সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য কতটা অপরিহার্য তা দেখছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের আপাত পতন এবং অন্তর্ঘাতকারী বুদ্ধিজীবীদের জয়োল্লাস সত্বেও আমরা দেখি যে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা জণগণকে তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে গড়ে তুলতে শিখিয়েছে। যারা জনগণের প্রতি সত্যিকারের সহানুভূতিশীল, সে সকল শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন এবং এটা নিশ্চিত যে সমাজতন্ত্র বিজয়ী হবেই।
{বি. দ্র. এই কংগ্রেসে বক্তৃতা করে যাবার পর ৩০ আগস্ট লেনিনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে ফানি কাপলান।}
[১৯১৮ সালের ২৬ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মস্কোতে শিক্ষাবিষয়ক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ৭ শ এর বেশি প্রতিনিধি এ কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করেন। ২৮ আগস্ট কমরেড লেনিন কংগ্রেসে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তৃতা করেন। এই কংগ্রেস সোভিয়েতের শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আমরা এই বক্তৃতাটির অনুবাদ ছাপালাম। অনুবাদের ক্ষেত্রে দুর্বলতার দায় সম্পূর্ণই আমাদের। এক্ষেত্রে যে কোন মতামত আমরা আনন্দের সাথে গ্রহণ করবো। সম্পাদক]