কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিব সরকারের পতন, সেনা অভ্যুত্থানে স্বপরিবারে হত্যা নয়

কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিব সরকারের পতন, সেনা অভ্যুত্থানে স্বপরিবারে হত্যা নয়
—————————————————– তাহের দিবসের আলোচনা সভায় কমরেড খালেকুজ্জামান
Khalequzzaman on Colonel Abu Taher-21072020“কর্নেল তাহের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ধারণকারী সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছিল তাহেরের স্বপ্ন, সেনা অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবের স্বপরিবারে হত্যা করা নয়, গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিব সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিলেন কর্নেল তাহের।” তাহের দিবসের আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাসদ এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান একথা বলেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ কর্ণেল তাহের (বীর উত্তম) এর ৪৪তম ফাঁসি দিবস উপলক্ষে গতকাল ২১ জুলাই ২০২০ সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর উদ্যোগে অনলাইনে ‘কর্নেল তাহের : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাসদ এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামানের সভাপতিত্বে আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কর্নেল তাহেরের পতœী মিসেস লুৎফা তাহের, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আবু সাঈদ খান, ডাকসুর সাবেক জিএস ডাক্তার মুশতাক হোসেন ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ।
সভায় কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, কর্নেল তাহের ছিলেন এক অসীম সাহসী, ত্যাগী, নির্ভীক, সৎ, নীতিবান, উন্নত আদর্শ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির অধিকারী। শৈশব থেকেই তার মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবমুক্তির আকাক্সক্ষা গড়ে ওঠে। শিক্ষা জীবনে তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসন-শোষণের যাতাকল থেকে কিভাবে বাঙালী জাতিকে মুক্ত করা যায় সেই চিন্তা তিনি করতেন। পাকিস্তানী শাসনামলে পাকিস্তানী শাসক শোষক ধনিক শ্রেণি যে বাংগালীদের শত্রু একথা তিনি বিশ্বাস করতেন তাইতো সিরাজ সিকদারের চিন্তার সাথে তাঁর মিল হয়েছিল। সে কারণে কর্নেল জিয়াউদ্দীন ও তাহের সিরাজ সিকদারের সাথে বেশ কয়েক দফা বৈঠকও করেছিলেন। কি করে উপনিবেশিক শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা যায়। দেশকে স্বাধীন করতে হলে  সামরিক প্রশিক্ষণ লাগবে, সেজন্য তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কর্নেল তাহের পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে ভারতের দেরাদুন হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ১১নং সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। মুুক্তিযুদ্ধকে তিনি ভেবেছিলেন জনযুদ্ধ হিসেবে। তাইতো তিনি কৃষক-শ্রমিকদের বেশি বেশি করে যুক্ত করেছিলেন এবং ২২ হাজার গেরিলা বাহিনী তৈরি করেছিলেন।
খালেকুজ্জামান বলেন, কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন পাকিস্তান আর্মি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। ভারতীয় বাহিনী ঢাকা পৌঁছার আগেই তাঁর বাহিনী ঢাকা দখল নেবে। কিন্তু কামালপুরের যুদ্ধে পা হারানোর ফলে তাঁর সে স্বপ্নপূরণ হয় নি।
চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলে কর্নেল তাহেরকে স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীর প্রথম এডজুটেন্ট জেনারেল করা হয়। তাঁর বিশ্বাস ছিল ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানী উপনিবেশিক আমলের সেনাবাহিনী ও তাঁর চিন্তাচেতনা দ্বারা স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী চলতে পারে না। স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে হবে উৎপাদনমুখী-কর্মমুখী করে জনগণের বাহিনী হিসেবে। সেনাবাহিনী ধনীক শ্রেণির শাসন শোষণের লাঠিয়াল বাহিনী হতে পারে না। তাই তিনি কুমিল্লা ক্যান্টমেন্টে ৪৪ বিগ্রেডের কমান্ডার হিসেবে সেনাবাহিনীকে জনগণের বোঝা হিসেবে নয় কৃষি উৎপাদন কাজে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু শাসক দল ও সেনাবাহিনীর অপরাপর কর্মকর্তাদের সেটা পছন্দ ছিল না সেকারণে লোভনীয় নিরাপদ চাকুরি থেকে তিনি পদত্যাগ করেন।
খালেকুজ্জামান বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও অঙ্গীকার ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর শাসন ক্ষমতায় বসে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ‘ঐ’ ঘোষণা ও অঙ্গীকার থেকে অনেক দূরে সরে যেতে থাকে। তাই কর্নেল তাহের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ধারন করে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত করেন, রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন।
খালেকুজ্জামান বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা অভ্যুত্থানে স্বপরিবারে শেখ মুজিব এর হত্যাকা- কর্নেল তাহের চান নি, তিনি চেয়েছিলেন গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের অবসান। তাই শেখ মুজিব হত্যার পর তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, যে জনগণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে মহানায়ক বানিয়েছেন, জনগণের আকাঙ্খার বিরুদ্ধে দেশ শাসনের অভিযোগে সেই জনগণই একদিন শেখ মুজিবকে ক্ষমতা থেকে নামাতো। কিন্তু উচ্চাভিলাসী ক্ষমতা লিপ্সু কতিপয় সেনা কর্মকর্তা, ধনিক শ্রেণির গড় স্বার্থ রক্ষাকারী গোষ্ঠী এবং দেশী বিদেশী সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি সেটা হতে দিল না বাংলাদেশের লুটেরা পুঁজিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য।
খালেকুজ্জামান বলেন, ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের পর দেশে যখন চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল, যখন সেনা বাহিনীর অভ্যন্তরে ক্যু-পাল্টা ক্যু চলছিল তখন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক জিয়া সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের ফসলকে আত্মসাৎ করে দেশকে ক্রমাগত মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিপরীতে নিয়ে যায় এবং  বাংগালী জাতীয়তাবাদের বদলে মুসলিম জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় দেশকে পরিচালিত করতে থাকে।
খালেকুজ্জামান বলেন, জিয়া কর্নেল তাহেরকে কারাভ্যন্তরে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে, কিন্তু যে তাহের জনতার সে তাহেরের মৃত্যু নেই। তাইতো ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও কর্নেল তাহের বলতে পারেন নিঃশংক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোন বড় সম্পদ নাই, আমি সেই সম্পদের অধিকারী; আমি দেশের মানুষকে সেই সম্পদ অর্জনের ডাক দিয়ে যাই।
খালেকুজ্জামান বলেন, কর্নেল তাহের ছিলেন আপাদমস্তক বিপ্লবী। তাই আজকে যারা বাংলাদেশে সমাজ বিপ্লবের সংগ্রামে নিয়োজিত, বিশেষ করে তরুণ যুবক তাদের অবশ্যই কর্নেল তাহেরের জীবন সংগ্রাম ও চিন্তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, ভগৎ সিং, আশফাক উল্লাহ্ যেমন স্মরণীয় তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশে কর্নেল তাহের হলো ’৭৬ এর ক্ষুদিরাম।
খালেকুজ্জামান বলেন, কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন ধনিকশ্রেণির কোন অংশের সাথে আপোষ করে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা সমাজ বিপ্লব করা যাবে না। সমাজ বিপ্লব করতে হলে প্রয়োজন শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে জনগণের গণঅভ্যুত্থান। আর সেজন্য আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশে বিপ্লব করতে হলে ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০ এর অভ্যুত্থান এবং ’৭৫ এর ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে তার সার সংকলন ও  সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশে বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের রূপরেখা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, কর্নেল তাহেরের স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আজকের বাংলাদেশ যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। শোষণমুক্তির বদলে ২২ পরিবারের শোষণের জায়গায় ৩৬ পরিবারের জন্ম হয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসনের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র-পরিবারতন্ত্র কায়েম হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামসহ সাম্প্রদায়িক-জঙ্গীবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে রাষ্ট্র-সরকার, স্বাধীন বিকাশের জাতীয়তবাদের জায়গায় সা¤্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদের কাছে নতজানু নীতি নিয়ে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। আর দুর্নীতি, দুঃশাসন, বেকারত্বের লাগামহীন প্রসার ঘটেছে। এই করোনাকালেও চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবায় তা উন্মেচিত হয়েছে। কর্মসংস্থানের বদলে রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করা হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করে ভারতকে বন্দর ব্যবহার করতে দিচ্ছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেই, এমনকি প্রতিবাদও করছে না সরকার। ফলে যা চলছে তা দিয়ে হবে না, এক শোষকের বদলে আরেক শোষক নয়, ব্যবস্থা পাল্টাতে হবে। ফলে কর্নেল তাহেরের স্বপ্ন শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদেরকে আরো বেশি বেশি যুক্ত করেই কর্নেল তাহেরের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা ও সম্মান দেয়া যাবে। তাই নতুন প্রজন্ম, ছাত্র-যুব শক্তি তারুণ্যের শক্তিকে এবং সর্বস্তরের শোষিত জনগণকে সমাজ পরিবর্তনের  সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেকুজ্জামান বলেন, যুগ যুগ জিও কমরেড তাহের তুমি আমাদের সংগ্রামে সাধনায়, কর্নেল তাহের তোমায় লাল সালাম।

Translate »