কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসীরা আজও অবহেলিত-কৃষক সমাবেশে কমরেড খালেকুজ্জামান

মওলানা ভাসানীর জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে শোষণ মুক্তির লক্ষ্যে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলুন
নওগাঁর ঐতিহাসিক নওযোয়ান মাঠের বিশাল কৃষক সমাবেশে কমরেড খালেকুজ্জামান191216-spf-12বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর কৃষক সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমুজুর ও কৃষক ফ্রন্ট এর উদ্যোগে আজ ১৯শে ডিসেম্বর ২০১৬ দুপুর ২.০০ টায় নওগাঁর ঐতিহাসিক নওযোয়ান মাঠে এক বিশাল কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আলতাফুল হক চৌধুরী আরব-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ভাসানী গবেষক কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ভারতের নর্থ বেঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক অধ্যাপক অজিত কুমার রায়, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড জাহেদুল হক মিলু, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজ, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড এ্যাড: সাইফুল ইসলাম পল্টু, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি প্রদ্যুৎ ফৌজদার ও সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি কমরেড মঙ্গল কিসকু। বিশাল কৃষক সমাবেশ সঞ্চালনা করেন সমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সদস্য ও নওগাঁ জেলা বাসদের সমন্বয়ক কমরেড জয়নাল আবেদীন মুকুল। সকাল থেকেই নওগাঁ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্ষেতমজুর ও আদিবাসীরা শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে সমাবেশ স্থলে উপস্থিত হতে শুরু করে। দুপুর ১.০০ টার মধ্যে বিশাল সমাবেশ মাঠের মঞ্চের সামনে চেয়ারে বসে বসে পড়েন আগত কমরেডরা। ঐতিহাসসিক নওযোয়ান মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
ঠিক দুপুর ২.০০ টায় সভার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রথমে সভার সঞ্চালক জয়নাল আবেদীন মুকুল সমাবেশের সভাপতি জনাব আলতাফুল হক চৌধুরী আরব-কে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিসহ অন্যান্য বক্তাদের মঞ্চে আহ্বান করেন। মঞ্চে আসন গ্রহণের পরে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিসহ নেতৃবৃন্দকে সমাবেশ আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করা হয়। এরপর সভাপতির স্বাগত ভাষণের পর একে একে নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
191216-spf-4191216-spf-khalequzzamanসমাবেশের প্রধান অতিথি বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান মওলানা ভাসানীর জীবন সংগ্রামের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং বাংলাদেশের কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসীদের জীবনে নেমে আসা দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে তার কারণ ও সমাধানের উপায় উল্লেখ করে বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী উপনিবেশিক ব্রিটিশ-ভারতে, পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সারাজীবন কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসীসহ গ্রামের অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষ ও শ্রমজীবি মেহনতি জনতার অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আপোষহীন যোদ্ধা। মওলানা হয়েও তিনি ছিলেন আপাদ-মস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি কখনো ক্ষমতার জন্য মোহগ্রস্থ ছিলেন না। কৃষক-শ্রমিকের মুক্তিই ছিল তাঁর জীবনের সাধনা। তাই মওলানা ভাসানীর জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়েই বাংলার কৃষক সমাজের মুক্তি সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে।
খালেকুজ্জামান বলেন, এই ভু-খণ্ড অর্থাৎ বাংলার ইতিহাস হলো- কৃষক সংগ্রামের ইতিহাস, ফকির মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানী, রাণী ভবানী, নুরুলদীন, ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের আন্দোলন, নাচোলের রাণী ইলা মিত্রের নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন, সালংগার বিদ্রোহ, টংক বিদ্রোহ সহ অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ বিপ্লবের মধ্য দিয়েই আমরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি।
তিনি বলেন ত্রিশ লক্ষ মানুষের শহীদী আত্মদান, আড়াই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে এ বছর আমরা বিজয়ের ৪৫তম বার্ষিকী পালন করে ৪৬ বছরে পদার্পণ করলাম। কিন্তু স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে আজো কৃষক-শ্রমিকের অধিকার অর্জিত হয়নি। গত ৪৫ বছরে আমল ভূমি সংস্কার, কৃষকের ফসলের নায্য দাম, কম দামে সার-বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত ও সময়মত সরবরাহ, ক্ষেতমজুরদের সারাবছর কাজ ও খাদ্য নিশ্চয়তা, ক্ষেতমজুর ভূমিহীনদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড প্রদান, আদিবাসীদের ভূমির অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির কোনটাই বাস্তবায়িত হয় নাই। যার ফলে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ভূমিহীনদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে মানুষ শহরে ভিড় করছে। সহজ শর্তে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ সরবরাহ না করায় আড়াই লক্ষ কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষক-ক্ষেতমজুরসহ গ্রাম-শহরের শ্রমজীবিদের জীবনে দুর্দশার মূল কারণ শোষণমূলক পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। সরকার উন্নয়নের ঢাক বাজাচ্ছে আর তার নিচে চাপা পড়ছে জনগণের কান্না। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু, ফ্লাইওভার, চারলেন রাস্তাসহ উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্প যেমন ঘোষণা করা হচ্ছে দূর্নীতি-লুটপাটের পরিমাণও তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কথিত উন্নয়ন যত বাড়ছে সমাজের বৈষম্য ততই বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন শোষণমূলক পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন করে শোষণ বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
মওলানা ভাসানীর সেই বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বলেন, আজ প্রমাণ হয়েছে গত ৪৫ বছরে দেশের আওয়ামী-বিএনপি কেন্দ্রীক দ্বি-দলীয় বুর্জোয়া শাসন মানুষের জীবনে শান্তি-সস্তি, সুখ-সমৃদ্ধি দিতে পারেনি। ফলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ও বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের অধঃপতিত বুর্জোয়া রাজনীতির বিপরীতে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, আমরা বাসদ-সিপিবি জোটবদ্ধ হয়ে সেই বিকল্প গড়ে তোলার সংগ্রাম করছি। অপরাপর বাম-গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিকল্প গড়ার সংগ্রাম করতে হবে।
খালেকুজ্জামান বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে যেমন রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তোলার সংগ্রাম করতে হবে তেমনি স্থানীয়ভাবে গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলায় কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসীসহ শ্রমজীবি মানুষের শোষণ মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বিকল্প গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, গত ৪৫ বছরে শাসক শ্রেণি গণতন্ত্র-গণতান্ত্রিকত চেতনা ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছে। গণতন্ত্রের অন্যতম অঙ্গ নির্বাচন কে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া এরা আর ধরে রাখতে পারেন নাই। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের একজনের অস্তিত্ব রক্ষা আর অপরের ধ্বংস সাধনের উপর নির্ভর করছে। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়ে বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থকে মোটেও তোয়াক্কা করছেন না। দেশে কায়েম করা হয়েছে এক বেপরোয়া ফ্যাসিবাদী শাসন। বাক-স্বাধীনতা, সমাবেশ করার অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। নারী নির্যাতন, নারী-শিশু হত্যা নির্যাতন বিচারহীনতার সংস্কৃতি হত্যা, খুন, ধর্ষণকে উসাহিত করেছে। বিচারবিহীন হত্যাকা-, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টারের নামে হতাযজ্ঞ চলছে অহরহ। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, গণতান্ত্রিক শ্রমআইন, কর্মস্থলে নিরাপত্তা নাই। নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শাসকদলের সংশ্লিষ্টতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জে বাগদা পল্লীতে খোদ পুলিশ আদিবাসীদের বাড়ী-ঘরে আগুন লাগিয়ে শত শত একর আদিবাসীদের জমি আত্মসাৎকারীদের স্বার্থকে মদদ দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, জঙ্গীবাদী অপতৎপরতা শাসক শ্রেণির আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ের মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। জনগণের শিক্ষা স্বাস্থ্যের অধিকার ক্রমেই সংকোচিত হচ্ছে। গত ৪৫ বছরে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান লংঘন করে দেশ শাসন করছে। এখন তারা নির্বাচন এলেই এরা সংবিধানের জন্য মায়াকান্না করে। এবারও নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচন যখন কাছে আসছে ততই সংবিধানের দোহাই পারছে। বিচারক নিয়োগ, নির্বাচন কমিশন গঠন করা নিয়ে আজো কোন আইন এরা প্রণয়ন করে নাই।
191216-spf-abul-maksudসৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, মওলানা ভাসানী ছিলেন এ দেশের কৃষক শ্রমিকের মুক্তিসংগ্রামের অগ্রসৈনিক। তিনি আজীবন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। তিনি সকল প্রকার শোষণ বৈষম্য বঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলতেন।
এই নওগাঁয় কৃষক সমাবেশ করার জন্য বাংলা থেকে ব্রিটিশ আমলে বহিস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি শুধু বাংলাদেশ নয় আসামসহ বিভিন্ন জায়গায় যেখানেই কৃষকের উপর শোষণ-জুলূম নেমে এসেছে সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন করেছেন।
কাজেই আজকের বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিকের মুুক্তির জন্য যারা আন্দোলন করতে চান তাদের অবশ্যই মওলানার জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
ভাসানী গবেষক জনাব মকসুদ বলেন, ভাসানীর জীবন এক বর্নাঢ্য সংগ্রামে পরিপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, শুধু কৃষক সমিতি-ক্ষেতমজুর সমিতি দিয়ে হবে না, সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলে তার মাধ্যমে কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। কারণ কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি রাজনৈতিক বিষয়। ফলে রাজনৈতিক সংগ্রামের পথেই তাদের মুক্তি অর্জন করতে হবে।
191216-spf-ajit-kumar191216-spf-br-firoz191216-spf-zahedul-haq-milu191216-spf-razequzzaman-ratan191216-spf-arabসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলতাফুল হক চৌধুরী আরব তাঁর সমাপনী ভাষণে বলেন, এই নওগাঁয় কৃষক নেতা আস্তান মোল্লা জমিদারদের অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে বিদ্রোহ করেছিলেন। আজকে কৃষক-ক্ষেতমজুর-আদিবাসীদের সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্ট এবং বাসদের পতাকা তলে সংগঠিত হয়ে সকল প্রকার শোষণ, বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে কৃষক নেতা আস্তান মোল্লার পথ ধরে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে হবে।