গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করে জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করা ও বাজেটে নারী উন্নয়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দের দাবিতে নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত

270516-SWF Home labour-2গৃহস্থালির কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করে জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করা, নির্যাতিত-অসহায় নারীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য বাজেটে বরাদ্দের পরিমান বৃদ্ধি করা, প্রতিষ্ঠান ও এলাকাভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার (শিশু দিবা যত্নকেন্দ্র) চালু করতে বাজেট বরাদ্দ, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সকল বিভাগীয় শহরে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহণ (টাউন সার্ভিস) ব্যবস্থা চালুর জন্য বরাদ্দসহ নারীদের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাজেট প্রণয়নের দাবিতে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর উদ্যোগে ২৭ মে ২০১৬ শুক্রবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নারী সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয় এবং মিছিল শেষে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ফ্যাক্সযোগে অর্থমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রওশন আরা রুশো। বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ম-লীর সদস্য সামসুন্নাহার জ্যোৎস্না, সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসু, সংগঠনের ঢাকা নগর শাখার সদস্য রুখসানা আফরোজ আশা, সদস্য জেসমিন আক্তার প্রমূখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাজেটের মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয় সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীও প্রতিফলিত হয়। নারীর শ্রমের স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে দেশের কোন বছরের বাজেটেই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকেনি। গত বছর অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ২,৯৫,১০০ কোটি টাকা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ৭৯,০৮৭ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট বাজেটের মাত্র ২৬.৮০%। নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বাজেট ছিল ১,৬৭৯ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ০.৫৭%। অর্থাৎ নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম। এই ১% এরও কম বরাদ্দে কিভাবে নারীদের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে? যে যৎসামান্য বরাদ্দ হয় তাও দুর্নীতি-দলীয়করণের কারণে উপযুক্ত নারীদের হাতে পৌঁছে না।
বক্তারা আরও বলেন, গত অর্থবছরের বাজেটে নারীদের যে উন্নয়ন হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন সেখানেও দেখা যায় শুভঙ্করের ফাঁকি। দুস্থ মহিলাদের খাদ্য-নগদ আর্থিক-উৎপাদনশীল সহায়তা প্রদান (ভিজিডি-এফ.এল.এস) এর আওতায় গত ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটে এই সহায়তা পেয়েছেন ৮.৩ লক্ষ নারী। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী এবং প্রতি ৪ জনে ১ জন দরিদ্র এই হিসেবে দেখা যায় দরিদ্র নারীদের মাত্র ৪.১৫% সহায়তা পেয়েছেন। দুস্থ ও বৃদ্ধা ভাতা দেওয়া হয় মাসে ৫০০ টাকা করে। অর্থাৎ দিনে একজন বৃদ্ধা পান ১৬.৬৭ টাকা। দিনে ৩টি পান খেলেই টাকা শেষ। এই টাকা দিয়ে ১ কেজি চাল কেনাও সম্ভব নয়। আবার অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন ১২,৯৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে এবং ৮০% নারী ও শিশু কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন আছেন। প্রতি কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য বরাদ্দ গড়ে মাত্র ৮,২৫০ টাকা। এই টাকায় ডাক্তারের বেতন কি দেওয়া হবে আর রুগীর কি ওষুধ দেওয়া হবে। তাই দেখা যায়, কমিউনিটি ক্লিনিক আছে কিন্তু সেখানে চিকিৎসা সেবা চালু নেই।
270516-SWF Home labour-1সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাজেট হতে হবে জনগণের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে এবং ভবিষ্যতের ভাবনাকে যুক্ত করে। ফলে কর্মক্ষেত্রে আছেন যে নারীরা তারা যাতে কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে না যান সেজন্য তাদের কাজে অংশগ্রহণের বাধাগুলি দূর করতে হবে। সেক্ষেত্রে শিল্পাঞ্চলে-জেলায়-উপজেলায় নারী হোস্টেল, ডে-কেয়ার সেন্টার, পাবলিক টয়লেট এবং নিরাপদ পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে এবং বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দেশের ১ কোটি ৬২ লাখ নারী বেকার। এদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। যেমন ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে দুস্থ ও বয়স্ক নারীদের কর্মসংস্থান হতে পারে।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি নারীর প্রতি সমাজের অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। সেক্ষেত্রে নারীর গৃহস্থালির কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করে জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করাটা জরুরী। গৃহে সবার জন্য খাবার তৈরি, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, শিশুদের দেখা-শোনা করা, বৃদ্ধদের সেবা প্রদান, শিশুদের পাঠদান, বিদ্যালয়ে আনা-নেয়াসহ গৃহ ব্যবস্থাপনার যাবতীয় কাজ নারীরা করে থাকেন। যে সকল পরিবার কৃষিকাজের সাথে যুক্ত সেখানে নারীরা উল্লেখিত কাজের বাইরে কৃষিকাজ করেন, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল পালন করেন। এমনকি যারা ঘরের বাইরে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন তারাও গৃহের অধিকাংশ কাজ করে থাকেন। গৃহে নারীরা প্রতিদিন গড়ে ১৬ ঘণ্টায় প্রায় ৪৫ ধরনের কাজ করে থাকেন। সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ)-এর “জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান নিরূপণ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত” শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, নারীদের গৃহস্থালী কাজের আর্থিক মূল্য ১১লক্ষ কোটি টাকারও উপরে। এই হিসাব করা হয়েছে বাজার প্রতিস্থাপন খরচ পদ্ধতিতে। গৃহকর্ম করতে বিকল্প কাউকে নিয়োগ দিলে কত টাকা ব্যয় হতো, তার ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে।
সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর পক্ষ থেকে আগামী বাজেটে নিন্মোক্ত দাবিসমূহ বাস্তবায়নের জন্য অর্থমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপির পেশ করা হয়-
১. গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করে জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করুন।
২. নির্যাতিত-অসহায় নারীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য বাজেটে বরাদ্দের পরিমান বাড়ান।
৩. প্রতিষ্ঠান ও এলাকাভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার (শিশু দিবা যতœ কেন্দ্র) চালু করতে বাজেটে বরাদ্দ দিন
৪. ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সকল বিভাগীয় শহরে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহণ (টাউন সার্ভিস) ব্যবস্থা চালুর জন্য বরাদ্দ চাই
৫. সকল দরিদ্র প্রসূতি মাকে ভাতা দিতে বরাদ্দের পরিমান বাড়ান।
৬. সকল জেলা-উপজেলায় মাতৃসদন কার্যকর করা এবং মহিলা ডাক্তার নিয়োগ দিতে বরাদ্দ দিন
৭. প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ও শিল্পাঞ্চলে সরকারি নারী হোস্টেল নির্মাণ করতে বরাদ্দ দিন
৮. বয়স্ক অসহায় মায়েদের জন্য সরকারি উদ্যোগে জেলায় জেলায় পরিচর্যা কেন্দ্র নির্মাণ করতে বরাদ্দ দিন
৯. নির্যাতিত-ধর্ষিত নারীদের জন্য প্রত্যেক জেলাতে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার নিমার্ণ ও কার্যকর করতে বরাদ্দ দিন
১০. প্রত্যেক শহরে নারীর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট নির্মাণে বরাদ্দ দিন