জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই-সিপিবি-বাসদ-এর সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ

DSCF2243 copy১৫ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট ‘প্রতিরোধ মাস’ ঘোষণা
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-সিপিবি’র নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের বিপদ মোকাবেলায় পরস্পর দোষারোপের রাজনীতি পরিহার করে এবং দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার, বিরোধী দল, বাম-গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলনের মাধ্যমেই এই অন্ধকারের কালো শক্তিকে কার্যকরভাবে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব। শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক আচরণ, সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী হামলা, দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ করতে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
১৩ জুলাই পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনস্থ প্রগতি সম্মেলন কক্ষে সিপিবি-বাসদ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলন সূচনা বক্তব্য রাখেন বাসদ-এর সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন বাসদ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য শামছুজ্জামান সেলিম, আহসান হাবিব লাবলু, বাসদ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাহবুবুল আলম, রুহিন হোসেন প্রিন্স, অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন, বাসদ নেতা জুলফিকার আলী, খালেকুজ্জামান লিপন, আব্দুর রাজ্জাক, শামসুন্নাহার জ্যোৎস্না।
IMG_0586 copyসংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ১৫ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট ‘প্রতিরোধ মাস’ পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে বলা হয়, গোটা মাস ধরে সিপিবি-বাসদ-এর কর্মীরা ঘরে ঘরে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান ছড়িয়ে দেবেন। এই মাসে গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লায়-সর্বত্র প্রতিরোধ-সমাবেশ এবং প্রতিরোধ ব্রিগেড গঠন করার কাজ পরিচালনা করা হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কমরেড সেলিম বলেন, দেশের অস্তিত্বকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দেশের ওপর একাধারে সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদ-এই দুমুখী বিপদ। সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ একে অপরের পরিপূরক। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ প্রতিহত করার অজুহাতে আমেরিকা বিশেষজ্ঞ সহায়তা পাঠাতে চায়। এটাই কি আসল সত্য, নাকি আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর চক্রান্ত বাস্তবায়নের অজুহাতের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে? বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের খেলায় আটকে ফেলার চক্রান্ত চলছে। তালেবান, আল-কায়েদা, আইএস ইত্যাদি এ ধরনের প্রতিটি শক্তিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদেই গড়ে উঠেছে এবং লালিত-পালিত হচ্ছে। মার্কিনিদের ‘সর্প হয়ে দংশন করে, ওঝা হয়ে ঝাড়ে!’-এই কৌশলের কথা সর্বজনবিদিত। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা পাকিস্তানের গোলামী ছিন্ন করেছি, নতুন করে আমেরিকা, ভারত বা অন্য কারো গোলামী করার জন্য নয়।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীদের হামলা অতীতের এসব ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তুলছে। ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক জঙ্গি গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়া এবং ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের বিষময় ফল সম্পর্কে আমরা সতর্ক করেছি বহুবার। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা কখনোই তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং সাম্প্্রদায়িকতার ওস্তাদ দল জামায়াতকে একপক্ষ জোটসঙ্গী করেছে এবং মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছে। অপরপক্ষ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে টালবাহানা করে চলেছে। একই সাথে ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বাড়িয়েছে বহুগুণ। অনেক ইস্যুতে আমরা আন্দোলন করছি। সরকারের বিরুদ্ধেও আমাদের আন্দোলন চলবে। নানা বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আছে। কিন্তু দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সকলকে সক্রিয় হতে হবে।
DSCF2241 copyকমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দূরীভূত করার পরিবর্তে পুরনো দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গুলশানের মতো সুরক্ষিত জায়গায় এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে সন্ত্রাসীরা কী করে ঢুকতে পারল? সমস্যার সুবিধা নেয়ার তৎপরতা দৃষ্টিকটু ও বিপজ্জনকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। ক্ষমতাসীন সরকারসমূহ সব সময় উগ্র সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলার তীব্রতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। হামলাকারীদের পরিচয় উদ্ঘাটন করা, গ্রেফতার ও বিচার করার চাইতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের পক্ষ থেকে সবসময় করা হয়েছে। আইএস আছে কি নেই, এরা কি জেএমবি না অন্যকিছু-এইসব বিতর্কে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ।
তিনি আরো বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের চেতনাকে প্রতিহত করতে এ আন্দোলনকে নাস্তিকতা বলে আখ্যায়িত করা এবং হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামানোর দ্বিমুখী আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। নাস্তিক-ব্লগার আখ্যা দিয়ে তালিকা করে হত্যা করা, হত্যাকারীদের মোকাবেলা করার চাইতে কলমকে সংযত করার সরকারি পরামর্শ প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উৎসাহিত করেছে। খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিমসহ সকল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার পরিপন্থি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের চেহারার পরিবর্তন করা জরুরি।
কমরেড জাফর বলেন, যে চেতনা নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তাকে ক্রমাগত ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলেছে। ধর্মের নামে রাজনৈতিক ব্যবসা চলছে এবং দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে গিয়েছে। লুটপাট-দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বাড়ছে সামাজিক ভারসাম্য তত নষ্ট হচ্ছে। গণতন্ত্রের মূল চেতনা যে ভিন্নমত সহিষ্ণুতা, তা ধ্বংস করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকারহীন পরিবেশ শাসকদেরকে যেমন ফ্যাসীবাদী বানায়, জনগণকেও তেমনি নিষ্ক্রিয় করে। তার ফলশ্রুতিতে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের মতো মহাবিপর্যয়ের উদ্ভব ঘটে।

সংবাদ সম্মেলনের বক্তব‌্য:
“টার্গেট কিলিং, গুপ্তহত্যা, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, লুটপাটে বিপন্ন স্বদেশ-রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ”

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-এর
সংবাদ সম্মেলন

১৩ জুলাই ২০১৬, সকাল ১১টা ॥ প্রগতি সম্মেলন কক্ষ, মুক্তিভবন, ২ কমরেড মণি সিংহ সড়ক, ঢাকা

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাংলাদেশের এক সংকটময় মুহূর্তে আমরা আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। স্বাধীনতার বিপুল আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, লুণ্ঠনে আজ পর্যুদস্ত। দেশের সম্পদ ও ভবিষ্যত সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে সমর্পণ করার চক্রান্ত চলছে। এসবের বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে আন্দোলন করছি। আজ দেশের ওপর নেমে আসা আরো ভয়ঙ্কর এক বিপদ সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ জনজীবনের ন্যূনতম শান্তি ও নিরাপত্তা এবং দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে উদ্যত হয়েছে। এই সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য আপনাদের মাধ্যমে জনগণের কাছে তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনে আপনাদের সাথে মিলিত হয়েছি।
সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ দেশকে যে কী ধরনের বিপর্যয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেই বিষয়ে বহুদিন ধরে আমরা সতর্ক করে আসছি। ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক জঙ্গি গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়া এবং ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের বিষময় ফল সম্পর্কেও আমরা সতর্ক করেছি বহুবার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা এবং শক্তি বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছি বার বার। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা কখনোই তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং সাম্প্রদায়িকতার ওস্তাদ দল জামায়াতকে একপক্ষ জোটসঙ্গী করেছে এবং মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছে। অপরপক্ষ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে টালবাহানা করে চলেছে। একই সাথে ভোটের রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তি, প্রশাসনের প্রভাবের পাশাপাশি ধর্মের ব্যবহারকেও বাড়িয়েছে বহুগুণ। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীদের হামলা অতীতের এসব ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তুলছে।
গত ১ জুলাই গুলশানের ‘হলি আর্টিজান’ রেস্টুরেন্টে বিদেশিসহ ২২ জন মানুষের নৃশংস হত্যাকা- দেশবাসীকে শুধু আতঙ্কিত ও বেদনাহত করেনি, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ক্ষুব্ধ ও ভবিষ্যতের ভাবনায় উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ৭ জুলাই ঈদের দিনে ঈদের নামাজের জন্য খ্যাত দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় যে হামলা হয়েছে, তা এ আশঙ্কা ও উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কিন্তু এই উদ্বেগ আরও বেড়ে গিয়েছে যখন, এইসব ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন ও দূরীভূত করার পরিবর্তে সেই পুরনো দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়ে গেল। অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গুলশানের মতো সুরক্ষিত জায়গায় এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে ঢুকতে পারল কেন, মাদ্রাসা ও ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কেন?
সমাজের কোন সেই কারণ, যা তরুণদেরকে এই নৃশংস হত্যার রাজনীতির সাথে যুক্ত করেছে? ধনী ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা কেন মাদক ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে? সমাজে কেন গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা, ভিন্ন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা দিন দিন কমে যাচ্ছে? বৈষম্য বৃদ্ধির সামাজিক প্রভাব কী? শিক্ষা ব্যবস্থার কোন দুর্বলতা ছাত্রদেরকে সমাজ ও জীবন বিমুখ করে তুলছে? বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে কী ঘটছে? বাংলাদেশ কিভাবে সাম্রাজ্যবাদের লুণ্ঠন ও ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে? মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসহ বিদেশি রাষ্ট্র কেন বাংলাদেশে ‘সহায়তা প্রদানকারী বাহিনী’ পাঠানোর বিষয়ে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করেছে? ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কিভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করছে?
এসব বিষয় আলোচনা হলে সমস্যার কার্যকারণ ও তা দূর করার পথ অনুসন্ধান করা যেত। কিন্তু সমস্যা দূর করার চাইতে সমস্যার সুবিধা নেয়ার তৎপরতা দৃষ্টিকটু ও বিপজ্জনকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন সরকারসমূহ সব সময় উগ্র সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলার তীব্রতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। তাই কখনও ‘বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি’ বা ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে ঘটনার কারণ আড়াল করেছে। বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা সরকারের দায়িত্বশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সিপিবি’র পল্টনের মহাসমাবেশে বোমা হত্যাকা-, উদীচীর সম্মেলনে বোমা হত্যাকা-, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, মাজারে, গীর্জায়, সিনেমা হলে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ৬৩ জেলায় বোমা হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি কথা যত হয়েছে-সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার, শাস্তি সে অনুযায়ী হয় নাই। হামলাকারীদের পরিচয় উদ্ঘাটন করা, গ্রেফতার ও বিচার করার চাইতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের পক্ষ থেকে সবসময় করা হয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরে কখনও মুক্তমনা ও ব্লগে লেখেন যাঁরা তাঁদেরকে হত্যা, হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খ্রিস্টান ধর্মযাজক, ভিন্ন মতাবলম্বী, ইমাম, মুয়াজ্জিনদের উপর আক্রমণের পরেও এই মনোভাব ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে দেখানো হয়েছে। এসব ঘটনায় কখনও আইএস, কখনও আল কায়েদা ইন ইনডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট (আইকিউআইএস), কখনও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিলেও, সরকার সবসময় তা অস্বীকার করে এসেছে। আক্রান্ত কারা, আক্রমণকারীদের টার্গেট নির্ধারণের ধরন, আক্রমণ পরিচালনার দক্ষতা, আক্রমণকারীদের বয়স ও পরিচয়, আক্রমণকারীদের আদর্শিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে, সেটিই হতো সঠিক পদক্ষেপ। অথচ আইএস আছে কি নেই, এরা কি জেএমবি না অন্যকিছু, সে বিতর্কে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল আসেনি বরং সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ।

প্রিয় বন্ধুগণ
বাংলাদেশে যখন এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলা চলছে, তখন সিরিয়া, ইরাক তো জ্বলছেই এমন কি আমেরিকা, ব্রাসেলস, ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশে দেশেও হামলা হচ্ছে। একদিন টুইন টাওয়ারের হামলাকে অজুহাত করে মার্কিনিরা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করেছিল, মানব বিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে ইরাককে দখল ও ধ্বংস করেছিল, স্বৈরশাসন উৎখাতের নামে লিবিয়ার উপর যুদ্ধ ও ধ্বংস চাপিয়ে দিয়েছিল, আসাদ সরকারকে উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র (!) প্রতিষ্ঠার নামে বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, আজ তার কারণ ও ফলাফল বিশ্ববাসী দেখছে। তেলের ভা-ার দখল করা, অস্ত্রের ব্যবসা রমরমা করা, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সামরিক ঘাঁটি ও প্রতিপত্তি বাড়ানো, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও অনুগত রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা আজ প্রকাশিত।
আফগানিস্তানে তালেবান, আল কায়েদা, ইরাক-সিরিয়াতে আইএস প্রতিষ্ঠার সাথে মার্কিনিদের সম্পর্ক এখন স্পষ্ট। এদের অর্থ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সবই সরবরাহ করেছে; এদের অধিকৃত এলাকা থেকে সস্তায় তেল নিয়েছে মার্কিনিরা। এদেরকে সৃষ্টি করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা এবং দমনের নামে সামরিক হস্তক্ষেপ করার কৌশল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা ব্যবহার করছে। সৌদি আরব, তুরস্ক, জর্ডান, কাতার, কুয়েত এর প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো আজ এক সূত্রে গাথা হয়ে আছে। শিয়া-সুন্নী-কুর্দি-ইয়াজদী বিরোধকে উসকে দিয়ে উগ্র সুন্নীদের নিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ- সিরিয়া বা আইএসআইএস সংক্ষেপে আইএস প্রতিষ্ঠা করেছে। আইএস-এর নৃশংসতা, নারীদের উপর নির্যাতনের খবর কিছুটা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করানোর জন্য ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে মার্কিনিরা তৈরি করেছিল তালেবান ও পরবর্তীতে আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র ইসলামী গোষ্ঠী। সৌদি ধন কুবেরের পুত্র ওসামা বিন লাদেন, মিসরীয় চিকিৎসক আয়মান আল জাওয়াহিরি, জর্ডানের আবু মুসাব আল জারকায়ির (যাকে আইএস-এর স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয়) ‘জিহাদী’ দীক্ষা ঘটে আফগানিস্তানে। সে সময় বাংলাদেশের বহু তরুণ আফগানিস্তানে যায়। তাদের অনেকেই পরে দেশে এসে বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠী গঠন করে। পুঁজিবাদী শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের কারণ ধরতে না পেরে দলে দলে যুক্ত হয়েছে জঙ্গি সংগঠনে এবং কার্যত সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ ও পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থা রক্ষা করে যাচ্ছে। তাই বিশ্বের কোথাও এবং বাংলাদেশেও কৃষকের সমস্যা, শ্রমিকের সমস্যায় এদের কোনো প্রতিক্রিয়া নাই।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ইজরায়েল আগ্রাসন, তেল সম্পদ লুণ্ঠনের প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানরা বিপন্ন এই আবেগে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিশোধ প্রবণতা তৈরি করা খুবই সহজ। ভারতের কাছ থেকে পানিসহ ন্যায্য হিস্যা না পেয়ে অনেক সুবিধা ভারতকে দেয়া হচ্ছে। এগুলোর পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা দরকার। ফলে এই সহজ পথে তরুন-যুবকদেরকে উগ্র মৌলবাদী সংগঠনে যুক্ত করা হচ্ছে। আমরা খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলিমসহ সকল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার পরিপন্থি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের চেহারার পরিবর্তন করার জরুরি মনে করি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়, তা শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়েই শেষ হতো না। গণজাগরণ মঞ্চের চেতনাকে প্রতিহত করতে এ আন্দোলনকে নাস্তিকতা বলে আখ্যায়িত করা এবং হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামানোর দ্বিমুখী আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। নাস্তিক-ব্লগার আখ্যা দিয়ে তালিকা করে হত্যা করা, হত্যাকারীদের মোকাবেলা করার চাইতে কলমকে সংযত করার সরকারি পরামর্শ প্রকারান্তরে সাম্প্রদাযিক শক্তিকে উৎসাহিত করেছে। যে চেতনা নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তাকে ক্রমাগত ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলেছে। ধর্মের নামে রাজনৈতিক ব্যবসা ও দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে গিয়েছে। লুটপাট-দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বাড়ছে সামাজিক ভারসাম্য তত নষ্ট হচ্ছে। গণতন্ত্রের মূল চেতনা যে ভিন্নমত সহিষ্ণুতা, তা ধ্বংস করা হচ্ছে। মানুষ হওয়ার শিক্ষার পরিবর্তে ব্যবসায়ী হওয়ার শিক্ষা আজ প্রধান ধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তিবাদী মনন, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব গড়ে তোলার শিক্ষা নাই। ফলে একটি বিচ্ছিন্ন প্রজন্ম সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন, টাকা পাচার, সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি নতজানু দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সমাজে বৈষম্য প্রকট রূপ নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন সরকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে ক্ষমতাকে স্থায়ী করার চেষ্টা করছে। গণতান্ত্রিক অধিকারহীন পরিবেশ শাসকদেরকে যেমন ফ্যাসীবাদী বানায়, জনগণকেও তেমনি নিষ্ক্রিয় করে। তার ফলশ্রুতিতে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের মতো মহাবিপর্যয়ের উদ্ভব ঘটে। এ পরিস্থিতিতে উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের হামলা দেশের বিদ্যমান বিপর্যয়কে আরো তীব্র করে তুলবে।
আমরা সিপিবি-বাসদ-এর পক্ষ থেকে মনে করি যে, এই বিপদ মোকাবেলায় পরস্পর দোষারোপের রাজনীতি পরিহার করে এবং দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার, বিরোধী দল, বাম-গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলনের মাধ্যমেই এই অন্ধকারের কালো শক্তিকে কার্যকরভাবে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে সকলেরই সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক আচরণ, মৌলবাদী হামলা, দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ করতে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই। এ লক্ষ্যে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নাই।
সার্বিক বিবেচনায় আমরা জাতির প্রতি পরিপূর্ণ দায়িত্ববোধ থেকে আগামী ১৫ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট ‘প্রতিরোধ মাস’ পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। গোটা মাস ধরে সিপিবি-বাসদ-এর কর্মীরা ঘরে ঘরে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান ছড়িয়ে দেবে। এই মাসে গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লায়-দেশের সর্বত্র প্রতিরোধ-সমাবেশ এবং প্রতিরোধ ব্রিগেড গঠন করার কাজ পরিচালনা করা হবে।