জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর করবেন না-রাষ্ট্রপতির প্রতি​ কমরেড খালেকুজ্জামান

অগণতান্ত্রিক, নিবর্তনমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে বাসদ-এর সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত
SPB-05 October-18-1সম্প্রতি জনমত উপেক্ষা করে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাশ করে বাক স্বাধীনতা হরণের সর্বশেষ নজির সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে আইনটি অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। জনমত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এহেন কালো আইনে স্বাক্ষর না করার জন্য আজ ঢাকায় এক সমাবেশে কমরেড খালেকুজ্জামান রাষ্ট্রপতির প্রতি এ আহ্বান জানান।
অগণতান্ত্রিক, নিবর্তনমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে আজ ৫ অক্টোবর ২০১৮ সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
বাসদ ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান। আরো বক্তব্য রাখেন বাসদ নেতা নিখিল দাস, আবদুর রাজ্জাক, জুলফিকার আলী, খালেকুজ্জামান লিপন, আহসান হাবিব বুলবুল প্রমুখ। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তোপখানা রোডে এসে শেষ হয়।
SPB-05 October-18-2খালেকুজ্জামান বলেন, দেশে আজ গণতন্ত্র নাই, বাক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান, গুম-খুন-ক্রসফায়ারে বিচার বহির্ভূত হত্যা, নারী-শিশু নির্যাতন ও কালো আইনের বেড়াজালে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার হরণ, ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে দমন-পীড়ন নির্যাতন বর্তমান সরকারের প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করা হয়েছে। সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসন দেশকে সংঘাত সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কথিত এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দেশের নাগরিকদের কেবল কণ্ঠরোধ করবে না, এই আইনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতা ও স্বেচ্ছাচারীতা চালাবার সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল আইনের বিরুদ্ধে সরকার ছাড়া সবাই কথা বলছে। তিন দিন আগে সম্পাদক পরিষদ মন্ত্রীদের অনুরোধে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে আলোচনায় বসালো, সেখানে তারা ২৫,২৮,৩১,৩২,৩৩ ধারাসহ ৯টি ধারা বাতিলের দাবি জানান। তিনজন মন্ত্রী বিষয়টি মন্ত্রী পরিষদে উত্থাপনের পর সংশোধনের বিবেচনার কথা বলার পরও তা না করে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য পাঠানোকে বর্তমান সরকার ও মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নতুন নজির বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ডকুমেন্টারী তৈরি করে রাখা হয়েছে, এ ধরনের অসত্য সংবাদের জন্য ডিজিটাল আইন। ফলে যারা সত্য সংবাদ পরিবেশন করবে তাদের ভয় নাই। একথা থেকে বুঝা যায় প্রধানমন্ত্রীর কোন সমালোচনা করা যাবেনা। তিনি সমালোচনার উর্ধ্বে, ঈশ্বরের সমতুল্য।
খালেকুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল আইনে পুলিশকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা, তল্লাশী করা, মামলা করা; এটাতো মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ না এটি বৃটিশ, পাকিস্তানের উপনিবেশিক শাসনকেও হার মানিয়েছে। এ আইন পাশের পর বাংলাদেশ এখন বাস্তবেই পুলিশী রাষ্ট্র।
তিনি বলেন, ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারাসহ বিভিন্ন ধারায় ১৪ বছর জেল বা ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ- হতে পারে। অথচ দুর্নীতি করলে সাজা ৭ বছর, দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলে সাজা ১৪ বছর, এ কেমন মগের মুল্লুক।
খালেকুজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোন সমালোচনা করলেও ১৪ বছর সাজা ও ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য-সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, আজ অসাম্যের পাহাড়, বিচারহীনতার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে, মানবেতর জীবন যাপন করছে মানুষ ফলে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলুণ্ঠিত করে দেশ পরিচালনা করছে; বঙ্গবন্ধুর আমলে ৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ  হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, বাংলদেশ ব্যাংকের টাকা লুট হয়েছে, সোনা দস্তা হয়েছে, খনির কয়লা-পাথর গায়েব হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে দালানে, ব্রীজে লোহার রড এর বদলে বাঁশ দিয়েছে; এসব খবর সংগ্রহ, প্রকাশ- প্রচার ও সংরক্ষণ করলে ডিজিটাল আইনে সাজা দেয়া হবে? তাহলে কি এসব দুর্নীতির খবর যাতে প্রকাশ না পায় তার জন্যই কি ডিজিটাল আইন? সরকারের দুর্নীতি, লুণ্ঠন, সেচ্ছাচারীতা, দলীয়করণের ধারা অর্থাৎ স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই এ কালো আইন করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ থরায় এখন পর্যন্ত ৭৫০টির বেশি মামলা হয়েছে। আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, চ. বি. শিক্ষক মাঈদুল ইসলামসহ অসংখ্য নিরাপরাধ মানুষকে ৫৭ ধারায় জেলে পুরে হয়রানী করা হচ্ছে।
ইতিপূর্বের বিশেষ ক্ষমতা আইন নামক কালো আইন তো বহাল রয়েছেই। যে আইনে বাসদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সমন্বয়ক নিত্যানন্দ সরকার, প্রশান্ত রায়সহ অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মীকে এখনও বিনা বিচারে জেলে পুরে রাখা হয়েছে। বরিশালে ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী, ইমরান হাবিব রুমন, মিঠুন চক্রবর্ত্তী, জাকির হোসেন, নুশরাত জাহান টুম্পাসহ নেতা-কর্মীদের নামে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মিথ্যা মামলায় হয়রানী করা হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল দাবি করেন এবং বাসদ নেতা নিত্যানন্দসহ সকলের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। তিনি ডিজিটাল আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল ও সরকারের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।