‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিন

সংবাদ সম্মেলনে বাম গণতান্ত্রিক জোট এর দাবি

‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিন অবিলম্বে করোনা মোকাবেলায় ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করুন

LDA-22032020-BR Firozকরোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতাকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে সমন্বিত উদ্যোগ ও ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দসহ ৮ দফা দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে আজ ২২ মার্চ ২০২০ সকাল ১১:৩০টায় পুরানা পল্টনস্থ মৈত্রী মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ নেতা কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান ও কমিউনিস্ট লীগ নেতা নজরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোঃ শাহ আলম, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা মানস নন্দী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা বাচ্চু ভুইয়া, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের হামিদুল হক ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ।

সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ করোনা ভাইরাস এর বিস্তার ও তা মোকাবেলায় সরকারের বেহাল প্রস্তুতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস সংক্রমণকে বিশ্বব্যাপী মহামারী ঘোষণা করলেও বাংলাদেশের সরকার গত ৩ মাসেও যথাযথ প্রস্তুতি না নিয়ে চরম উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে।

LDA-22032020-Mujahidul Islam Selimবর্তমান এই চরম দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এই মহামারীর হাত থেকে কেউ একা বাঁচতে পারবে না, সেই জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে এ মহামারী মোকাবেলা করতে হবে। তিনি এনজিও ঋণের সুদ মওকুফ ও কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পুঁজিবাদ করোনা মহামারী সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে এটা আজ প্রমাণিত। তিনি গার্মেন্টস, হকারসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবন জীবিকা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান ।

LDA-22032020-Khalequzzamanকমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের কথা ও কাজে চরম অসঙ্গতি থাকায় তাদের প্রতি জনগণের কোন আস্থা নেই। আইইডিসিআরসহ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশবাসীকে জনসমাগম ও ভীড় এড়িয়ে সতর্কভাবে চলা ও ঘরে থাকার পরামর্শ এবং ইভিএম ভোটে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির কথা বললেও সরকার জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন করে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এটা সরকারের দ্বি-চারিতার প্রমাণ।

তিনি বলেন করোনা আতঙ্কের সুযোগে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নি¤œ আয়ের শ্রমজীবী মানুষ যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা খুবই নাজুক। কমরেড খালেকুজ্জামান দেশের নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য সারাদেশে আর্মি রেটে রেশন প্রদান করার আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি বাম জোটের নেতা-কর্মীদের সারাদেশে দুর্যোগ মোকাবেলায় জনগণের পাশে থেকে সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কর্মকা- করার জন্যও আহ্বান জানান।

বাম জোটের সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সংকট মোকাবেলায় পর্যাপ্ত করোনা কীট, পিপিই, স্বাস্থ্য সেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা ও দীর্ঘমেয়াদে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা, আর্মি স্টেডিয়ামসহ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার স্টেডিয়ামকে ফিল্ড হাসপাতালে পরিণত করা এবং তারকা হোটেলসহ জেলার ভাল হোটেলসমূহ প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য ব্যবহার করাসহ ৮ দফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে পঠিত লিখিত বক্তব্য ও ৮ দফা প্রস্তাবনার কপি সাথে সংযুক্ত করা হলো।

করোনা সংক্রমণ, আতঙ্ক ও করণীয় নিয়ে

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলন

২২ মার্চ ২০২০, সকাল ১১:৩০ মি., মৈত্রী মিলনায়তন (৫ম তলা), ২ মনিসিংহ সড়ক, ঢাকা

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

নতুন শতাব্দীর ভয়াবহতম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে সারা বিশ্ব। করোনা ভাইরাসের অনেক প্রজাতির মধ্যে ৭টি মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এবার চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনা যা পরবর্তীতে নামকরণ করা হয়েছে কভিড-১৯ আতঙ্কে কাঁপিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববাসীকে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ১৩ হাজার মানুষ। মৃত্যুর সংখ্যা হাজার, লাখ ছাড়িয়ে মিলিয়ন অতিক্রম করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই রকম বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও বাংলাদেশ ঝুঁকির বাইরে নয়। ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা সংক্রমণকে বিশ্বব্যাপী মহামারী ঘোষণা করলে এর ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাদের লাগামছাড়া দায়িত্বহীন উক্তি এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে গত আড়াই-তিন মাসে যথাযথ প্রস্তুতি শুরু না করে চরম উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। ফলে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাম গণতান্ত্রিক জোট মনে করে জনগণকে আশ্বস্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিয়ে শুধুমাত্র বুলি কপচানো একটি অমার্জনীয় অপরাধের শামিল। জনগণকে সতর্ক ও সচেতন করা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে করণীয় প্রসঙ্গে আমাদের প্রস্তাব তুলে ধরতে আমরা এই সংবাদ সম্মেলনে আপনাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে সকল সাংবাদিক বন্ধু এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন তাদেরকে বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের মধ্যে অন্যতম। আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১০০ জন। যা ভারতের আড়াইগুণ, পাকিস্তানের ৪ গুণ, চীনের ৭ গুণ বেশি। ফলে সাধারণ ভাবেই সংক্রমণের ঝুঁকি বাংলাদেশে বেশি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকারের সমন্বিত কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তিন মাস আগে চীনে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর চীনের প্রস্তুতি ও চিকিৎসা প্রদানের অভিজ্ঞতা, বিশ্বের দেশে দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া দেশসমূহের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ওই সকল দেশসমূহ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু সে সম্পর্কে দৃশ্যমান তৎপরতাও দেশবাসী লক্ষ্য করেনি। সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর প্রতিদিন প্রেস ব্রিফিং করছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রী প্রেস ব্রিফিং করছেন আর বিভিন্ন মন্ত্রীদের ব্রিফিং নিয়মিত চলছে। কিন্তু তাতে জনগণ আশ্বস্ত হতে পারছে না, বরং আতঙ্কিত হচ্ছে, বিভ্রান্তিতে পড়ছে। কারণ বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকছে অনেক। একেকজন একেক রকম বলছে। সরকারের কাজে ও কথায় যে ধরণের বৈপরিত্য ও অবহেলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে কী করা উচিত আর কী উচিত নয় তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

কভিড-১৯ এ সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেবেন যে ডাক্তার ও চিকিৎসা সেবাকর্মী তাদের সুরক্ষাই এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। পিপিই বা পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট না থাকায় চিকিৎসক ও সেবাকর্মীরাই ঝুঁকির মধ্যে আছেন এবং অনেকেই চিকিৎসা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক করোনা শনাক্তকারী কিট না থাকায় এবং কেবলমাত্র আইইডিসিআর এর ১টি ল্যাবরেটরিতে কভিড-১৯ রোগ শনাক্তের পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকার ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছেন। এই প্রবাসীরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, সংসারের দায় পালন করেন। আজ তাঁরা চাকরি হারিয়ে প্রাণের ভয়ে অথবা স্বজনদের সাথে থাকার আশায় দেশে ফিরেছেন। তাদেরকে কোয়ারেন্টাইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না দেয়ায় এবং মন্ত্রী কর্তৃক নবাবজাদা বলে শ্লেষ করায় তাঁরা অপমাণিত ও আতঙ্কিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের সর্বত্র। যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি হিসেবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষের সংখ্যা ১৪ হাজার, যা খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়। স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

করোনা সংক্রমিতদের চিকিৎসার জন্য বিদ্যমান হাসপাতালে অন্যান্য রুগীদের পাশে বিশেষ করোনা ইউনিট স্থাপন কোন ভাবেই সংক্রমণ ঠেকাবে না বরং তা ডাক্তার ও হাসপাতালে চিকিৎসারত অন্যান্য রোগীদের এবং হাসপাতাল এলাকার মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

করোনা আতঙ্ককে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবাসয়ী খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। একদল সামর্থ্যবান ও আতঙ্কিত মানুষ ভবিষ্যতের সংকটের কথা ভেবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা কাঁটা করছে। চালের দাম কেজিতে ৮/১০ টাকা বেড়েছে। পিয়াজের দাম আবার ৮০/৯০ টাকা হয়েছে। সরকারি সংস্থার উদ্যোগের অভাব ও অবহেলা বাজার সিন্ডিকেটকে বেপরোয়া করে তুলেছে আর জনজীবনকে করে তুলছে দুর্বিষহ।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

এই স্বাস্থ্য দুর্যোগের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটেরও পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। শ্রমজীবীদের চাকরি ও জীবনের নিরাপত্তা আজ গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাষ্ট্র ঋণ খেলাপিদের ব্যাপারে যতটা উদার ও উদ্যোগী ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমজীবীর ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হয় নাই। শিল্পমালিকদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের বিষয়ে ছাড় দেয়ার ঘোষণা ছাড়া, লাখ লাখ শ্রমিক ও কর্মজীবিদের রুটি-রুজির নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি। করোনা আতঙ্ক আবার দেখিয়ে দিল আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা দুর্বল, বাজেট কত কম এবং দুর্নীতির কারণে বাজেটের বরাদ্দও কাজে লাগানো হয় নাই। বিশাল বাজেটের প্রচারণা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য বরাদ্দ যে জিডিপির ১ শতাংশের কম তা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশার চিত্র চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বেদনাময় এই সত্য উদ্ঘাটিত হল যে, ব্যয়বহুল ও মেগা প্রকল্প, দুর্নীতি ও লুটপাট, দেশ থেকে টাকা পাচার, সামরিক ও প্রশাসনিক বিপুল ব্যয়, সচিব, মন্ত্রী, এমপিদের বেতন ভাতা ও সুযোগ বৃদ্ধি, মাথা পিছু আয় ও জিডিপি বৃদ্ধি সত্ত্বেও জনগণ কত অবহেলিত। আমরা তাই বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে দাবি জানাই : –

১) করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতাকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে। সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এবং চিকিৎসক ও ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

২) করোনা মোকাবেলায় অবিলম্বে বাজেট পুনর্বিন্যাস করে তাৎক্ষণিকভাবে কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে। এই টাকায় পর্যাপ্ত করোনা কিট, পিপিই, কমপক্ষে ১ লাখ স্বাস্থ্য সেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। সংকটের বিস্তৃতি ও প্রতিরোধ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ করতে হবে।

৩) কিছু হাসপাতালকে বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেখানে কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন ও চিকিৎসা একই হাসপাতালে হবে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামসহ প্রতিটি জেলা-উপজেলায় স্টেডিয়ামগুলোকে ফিল্ড হাসপাতালে পরিণত করতে হবে, প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সাময়িক হাসপাতাল এবং সেনা বাহিনীর ডাক্তারদেরকে নিয়োগ দিতে হবে। হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে ভীতি ছড়ানো বন্ধ করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জায়গা বৃদ্ধি কর। প্রয়োজনে তারকা হোটেলসমূহ এবং জেলার ভালো হোটেল এ কাজে ব্যবহার কর।

৪) করোনা পরীক্ষার জন্য জেলা-উপজেলায় পর্যাপ্ত বিশেষায়িত প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করা এবং স্থাপিত ল্যাবগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকটিকে করোনা পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে না পারে। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক সাময়িক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এই দুর্যোগে কাজে লাগাতে হবে।

৫) ভর্তুকি মূল্যে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য চাল, ডালসহ স্যানিটাইজার ও সাবান সরবরাহ করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যবৃদ্ধির সিন্ডিকেটের হোতাদের শাস্তি দিতে হবে। স্যানিটাইজারের উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি রোধ কর, সহজে প্রাপ্যতা নিশ্চত কর।

৬) জনঘনত্ব পূর্ণ এলাকা যেমন বস্তি, স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসস্থল, ভাসমান মানুষদের জন্য সুরক্ষা, সচেতনতা, পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ গৃহকর্মী, গাড়িচালক, অফিস সহকারীসহ স্বল্প আয়ের মানুষেরা যাতে সংক্রমিত হতে না পারে, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটতে না পারে।

৭) গার্মেন্টসসহ শিল্প কারখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনার অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই চলবে না। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক আক্রান্ত হলে চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

৮) ডাক্তার, চিকিৎসাসেবাকর্মী, সাংবাদ কর্মী, পরিবহণ কর্মী, পুলিশসহ জন সম্পৃক্ত কাজে যারা যুক্ত আছেন তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

করোনা সংক্রমণ এবং চিকিৎসা দুটোই সামাজিক ফলে রাষ্ট্র্রীয় উদ্যোগ ও দায়িত্ব ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। ব্যাক্তিগত সতর্কতা যেমন প্রয়োজন তেমনি দরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন। কিউবা যেমন তার সীমিত সামর্থ্যে সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, চীন করোনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংক্রমণ মোকাবিলা করছে, তা থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা সত্ত্বেও ইতালি, স্পেন, আমেরিকা করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে হিমসিম খাচ্ছে কেন সে বিষয়টিও গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। রাষ্ট্র জনগণের জন্য কতটুকু দায়িত্ব পালন করে এই বিপর্যয় থেকে সেটা দৃশ্যমান হলো। এ প্রেক্ষিতে আমরা জনগণের প্রতি আহবান জানাই, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি যতœবান হোন। নিজে সতর্ক থাকুন, অন্যদেরকেও সচেতন করতে উদ্যোগ নিন। সকল রাজনৈতিক দল, সমাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তি সমন্বয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করুন। এলাকায় এলাকায় নাগরিক কমিটি গঠন করে করোনা সতর্কতা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ নাগরিক অধিকার রক্ষায় উদ্যোগি হোন। রাষ্ট্রের কাছে আহবান জানাই, দিবস, উৎসব, ব্যায়বহুল প্রকল্পের খরচ কমিয়ে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বরাদ্দের ব্যবস্থা করুন।

শুভেচ্ছান্তে

বজলুর রশীদ ফিরোজ

সমন্বয়ক

বাম গণতান্ত্রিক জোট

কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ

Translate »