দেশকে সংঘাত-সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেবেন না, সরকারের প্রতি খালেকুজ্জামান

সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় সরকার গঠন, সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন করে অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে সংকট সমাধান করুন
280918-SPB Dhaka-5অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় তদারকি সরকার গঠন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন চালুসহ নির্বাচনে কালো টাকা, পেশী শক্তি, সাম্প্রদায়িকতা এবং প্রশাসনিক কারসাজি বন্ধ করে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান।
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বেলা সাড়ে তিনটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাসদ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতাকালে তিনি এ দাবি জানান।
ঢাকা মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সংগঠক নিখিল দাস, রাহাত আহমেদ প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন নগর নেতা জুলফিকার আলী। জনসভা শেষে এক বিশাল লাল পতাকা মিছিল বিভিন্ন দাবি দাওয়া সম্বলিত ফেস্টুনসহকারে রাজধানীর তোপখানা রোড, পল্টন, জিপিও, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, গুলিস্তান, কাপ্তান বাজার, গোলাপশাহ মাজার প্রদক্ষিণ করে পুনরায় প্রেসক্লাবে এসে শেষ হয়।
????????????????????????????????????

জনসভায় বক্তৃতাকালে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন আসন্ন। কিন্তু বর্তমানে দেশে নির্বাচনের কোন পরিবেশ নাই। বর্তমান সরকার ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে অতীতের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় সকল গণতান্ত্রিক প্রথা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। এ সরকারের আমলে কোন নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। বরিশালসহ ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সর্বশেষ পেরেক ঠুকে নির্বাচনকে বাস্তবে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশবাসীর অভিজ্ঞতা গত ৪৭ বছরে বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। বাংলাদেশে বিগত ১০টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ১৯৭৩ এবং ২০১৪ সালে আওয়ামীলীগ, ১৯৭৯ এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপি, ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭৩ সালে ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ১৯টি আসনে বিরোধী প্রার্থীর বিজয়ও আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারেনি

শুধু ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন আপেক্ষিক অর্থে কিছুটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে দেশবাসী মনে করে।
খালেকুজ্জামান বলেন, দেশে আজ গণতন্ত্র নাই, বাক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। সভা-সমাবেশে বাধা প্রধান, গুম-খুন-ক্রসফায়ারে বিচার বহির্ভূত হত্যা, নারী-শিশু নির্যাতন ও কালো আইনের বেড়াজালে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার হরণ, ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে দমন-পীড়ন নির্যাতন বর্তমান সরকারের প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করা হয়েছে। সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসন দেশকে সংঘাত সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
280918-SPB Dhaka-4সম্প্রতি জনমত উপেক্ষা করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাশ করে বাক স্বাধীনতা হরণের সর্বশেষ নজির সৃষ্টি করেছে। ইতিপূর্বের বিশেষ ক্ষমতা আইন নামক কালো আইন তো বহাল রয়েছেই। তিনি অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল দাবি করেন।
তিনি বলেন, দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষ আজ দিশেহারা। শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ১৮০০০ টাকা মজুরির দাবি না মেনে ৮০০০ টাকা ঘোষণা করে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের বেতন বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার যে অঙ্গীকার সেই সাম্য চেতনার পরিপন্থী। ব্যাংকের টাকা লুট করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বর্ণ দস্তা হচ্ছে, খনির কয়লা উধাও হচ্ছে, পাথর গায়েব হচ্ছে। প্রতি বছর ৭৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। বিদেশে বেগম পাড়া, সেকেন্টড হোম তৈরি করছে লুটেরারা। দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। চৌকিদার থেকে রাষ্ট্রপ্রতি পর্যন্ত সর্বত্র দলীয়করণ। বিচার বিভাগের কোন স্বাধীনতা নাই। গণতান্তিক আইনের শাসন, ন্যায় বিচারের বাণী আজ নিভৃতে কাঁদে।
280918-SPB Dhaka-6তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে চলেছে বাণিজ্যিকীকরণের সীমাহীন জোয়ার। ধনির জন্য শিক্ষা এই নীতিতেই চলছে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনের যৌক্তিক দাবি না মেনে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে হেলমেট বাহিনী হামলা চালালেও তাদেরকে গ্রেপ্তার না করে আন্দোলনকারীদেরকেই হয়রানী করছে। এহেন পরিস্থিতিতে দেশ ও জনগণকে বাচানো এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় দেশ গড়তে হলে শাসকশ্রেণির ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের শক্তির বিপরীতে বাম গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে জনগণের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। তিনি গণতন্ত্র-ভোটাধিকার ও ভাত-কাপড়-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান ও কাজের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। একই সাথে ব্যবস্থা পাল্টানোর নীতিনিষ্ঠ সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়া ও গণতান্ত্রিক শাসনের উপযোগি অবাধ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার জন্য সকল বাম গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক দেশপ্রেমিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির ভাষণে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ব্যাঙক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা একদল লুটেরা ঋণ নিয়ে মেরে দিচ্ছে। অন্য দিকে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা কৃষি ঋণের জন্য ১ লক্ষ ৬৮ হাজার কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা এবং ১২ হাজার কৃষকের নামে ওয়ারেন্ট জারি করেছে সরকার। একদেশে দুই আইন মেনে নেওয়া যায়না। কৃষক ফসলের দাম পায়না, ক্ষেতমজুরের সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তা নাই। ক্ষেতমজুরদের সারা বছরের কাজ এর নিশ্চয়তা বিধান ও কৃষকের ফসলের ন্যায্য দামের নিশ্চয়তার জন্য সরকারী ক্রয় কেন্দ্র খোলার দাবি জানান তিনি।
280918-SPB Dhaka-3রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, সরকার সংবিধান লংঘন করে সরকারি বেসরকারি শ্রমিকের বেতনে বৈষম্য সৃষ্টি করছে, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১৮০০০ টাকার দাবি না মেনে। তিনি বৈষম্য দূর করে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১৮০০০ টাকা ঘোষণার দাবি জানান। তিনি বলেন, অপরাপর সকল বিষয়কে বাদ দিয়ে দুর্ঘটনার দায় শুধুমাত্র শ্রমিকের উপর চাপিয়ে সড়ক পরিবহন আইন পাশ করেছে। তিনি সড়ক পরিবহন আইনের শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ধারা বাতিলের দাবি জানান। তিনি শ্রম আইনের গণতান্ত্রিক সংশোধন, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা দাবি করেন।
নেতৃবৃন্দ বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেপ্তারকৃত সাতক্ষীরা জেলা বাসদের সমন্বয়ক নিত্যানন্দ সরকার, খগেন ঘোষ, প্রশান্ত রায় এবং ৫৭ ধারায় আটকৃত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলামের অবিলম্বে নিঃস্বার্থ মুক্তি দাবি করেন।