ধানের দাম না পেয়ে কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হলে দেশ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে – বাম গণতান্ত্রিক জোট

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

ধানের দাম না পেয়ে কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হলে

দেশ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে

LDA-260519-4কৃষকের ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিত, ধান ক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা, ক্রয় কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়, পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধসহ ৯ দফা দাবি মেনে নেয়া, গার্মেন্টসসহ সকল শ্রমিকের বকেয়া বেতন বোনাস ২০ রোজার মধ্যে পরিশোধ, ২% ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করে ঋণখেলাপী ব্যাংক ডাকাতদের পুরষ্কৃত করা নয়, শাস্তি দেয়া এবং তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, কৃষকের নামে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-খুন বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ সকল মেগা প্রজেক্টের মেগা দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল মুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা, বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধসহ দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভোট ডাকাতির সংসদ ভেঙে দল নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধিনে পুননির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয় বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলনে।

আজ ২৬ মে ২০১৯ সকাল সাড়ে এগারটায় ২নং কমরেড মনি সিংহ সড়কের মৈত্রী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ। বক্তব্য রাখেন কমরেড শাহ আলম ও সাইফুল হক। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আব্দু সাত্তার, মানস নন্দী, হামিদুল হক, লিয়াকত আলী, সাজ্জাদ জহির চন্দন, অনিরুদ্ধ দাস অঞ্জন, রুহিন হোসেন প্রিন্স, জুলফিকার আলী, খালেকুজ্জামান লিপন, শম্পা বসু, আকবর খান, আনসার আলী দুলাল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, কৃষক ধানের দাম না পেয়ে খেতে আগুণ দিচ্ছে, ধানের বস্তায় আগুন দিচ্ছে। খাদ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী কেউই দায় না নিয়ে বেফাস মন্তব্য করছেন। ব্যর্থতার দায় নিয়ে এই মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, কৃষকের মনের আগুন নিভাতে সরকার ব্যর্থ হলে সরকারের গদিতে আগুন লেগে যাবে। আর দাম না পেয়ে যদি কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয় তাহলে দেশ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে বলেও তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন। তিনি অবিলম্বে ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিত, ধান ক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি ও ক্রয় কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের দাবি জানান।

বজলুর রশীদ ফিরোজ আরো বলেন, সরকার ঋণ খেলাপীদের শাস্তি না দিয়ে উল্টো ২% ডাউন পেমেন্টে রিসিডিউল করে ১০ বছরের জন্য পুনরায় লুটপাটের সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে ছোবড়া করে দেবে। তিনি ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃংখলা আনতে ঋণখেলাপীদের পুরষ্কৃত নয় শাস্তি দিতে হবে এবং তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানান।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে কমরেড সাইফুল হক বলেন, দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের জন্য দায়ী গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ অনুষ্ঠিত ভোট ডাকাতির নির্বাচনে অধিষ্ঠিত সরকার। ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ দেশে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। এর অবসানের জন্য দ্রুত বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে দল নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধিনে পুনরায় নির্বাচনে র দাবি জানান।

LDA-260519-2এক প্রশ্নের জবাবে কমরেড শাহ আলম বলেন, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকেরা তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধসহ ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। সরকার বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তাদের দাবি মানছে না। ষড়যন্ত্র করছে পাটকলগুলো বিক্রির। তিনি অবিলম্বে পাটকল শ্রমিকদের ৯ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশে নারী-শিশু নির্যাতন ভায়বহ রূপ নিয়েছে। এটা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন ও দল মত নির্বিশেষে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয় দুর্নীতি আজ মহামারী রূপ নিয়েছে। যত বড় পকল্প তত বড় দুর্নীতি, মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বালিশ কা- দুর্নীতিার একটি প্রতীক মাত্র। সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ২৯ মে ২০১৯ সকাল সাড়ে ১০টায় প্রগতি সম্মেলন কেন্দ্রে বাজেট নিয়ে ‘জনগণের জন্য কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠানের এবং আগামী ২৮ মে ২০১৯ এর মধ্যে পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন সহ ৯ দফা দাবি মেনে না নিলে আগামী ৩০ মে ২০১৯ বিজিএমসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। একই সাথে কৃষকের ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিত, ঋণখেলাপীদের এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ঈদের পর বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক কার্যালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও সহ বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

বাম গণতান্ত্রিক জোট আহূত সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য
২৬ মে ২০১৯, সকাল ১১:৩০টা, মৈত্রী মিলনায়তন, মুক্তিভবন
২ কমরেড মণি সিংহ সড়ক, পুরানা পল্টন, ঢাকা।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ
আমাদের শুভেচ্ছা নিন।
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে আমাদের অবস্থান ও বক্তব্য দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতেই আমরা এই সংবাদ সম্মেলনে আপনাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আমাদের আশঙ্কা অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বরের নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির পর দেখা যাচ্ছে, সরকার দেশ পরিচালনায় আরো বেপরোয়া, আরো দায়িত্বহীন। বোরো ধানের বাম্পার উৎপাদনের জন্য কৃষককে বাড়তি প্রণোদনা ও পুরষ্কৃত করার বদলে পরোক্ষভাবে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লুটেরা ধনতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির থাবায় ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে চাষিরা ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত। এ বছর পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরো শোচনীয়। প্রতি মণ ধানে কৃষককে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মণপ্রতি ধানের দাম ১০৪০ টাকা থেকেও চাষি বঞ্চিত। ফড়িয়া-মধ্যস্বত্বভোগী, চাতালের মালিক, আটো রাইস মিলের কারবারিরা আর সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই নানাভাবে মূল্য সহায়তার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির গণবিরোধী বক্তব্য ও নেতিবাচক ভূমিকা চরম দায়িত্বহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো অপ্রয়োজনীয়ভাবে চাল আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। একদিকে চাল আমদানি করা হচ্ছে, অন্যদিকে চাল রপ্তানির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। সরকারের দ্বিমুখী নীতি, খোদ চাষির কাছ থেকে ধান কেনায় ব্যর্থতা, কৃষিবাজারের ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, সরকারের মধ্যকার গুরুতর সমন্বয়হীনতা কৃষি তথা গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ধানসহ কৃষি ফসল উৎপাদনে কৃষক নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারে এবং দেশ খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।
প্রিয় বন্ধুগণ
আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধসহ তাদের ৯ দফা বাঁচার দাবিসমূহ পূরণ করা হয়নি। বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও, সরকারের অব্যাহত দুর্নীতি ও ভুল নীতি-কৌশলের কারণে পাট ও পাটশিল্প নানা দিক থেকে বিপন্ন, সংকটগ্রস্ত; পাট শ্রমিকেরা চরম অসহায়। এই রোজার মাসেও নিজেদের ন্যায্য বকেয়া মজুরি পাওয়ার দাবিতে তাঁদেরকে বাধ্য হয়েই রাজপথে থাকতে হচ্ছে। সরকার শ্রমিকদের দেয়া অঙ্গীকার বারে বারে ভঙ্গ করে চলেছে।
ঈদ সামনে রেখে অধিকাংশ গার্মেন্টস শ্রমিকও তাদের মজুরি, ওভারটাইমের বকেয়া ও বোনাস নিয়ে বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ২০ রোজার মধ্যে শ্রমিকেরা তাঁদের যাবতীয় পাওনা পরিশোধের দাবি জানালেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি পুননির্ধারণের ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত মালিক ও সরকারের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
খাদ্যসহ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। বাজার মনিটরিং বলতে বাস্তবে কিছু নেই। টেলিভিশননির্ভর তৎপরতা তেমন কোনো কাজে আসেনি। অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটসমূহের কাছে ভোক্তারা এখনও নিতান্তই অসহায়। ভেজাল পণ্যে বাজার সয়লাব। ভেজাল রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। রয়েছে সুপেয় পানির গুরুতর সমস্যা। খোদ ঢাকা মহানগরীতেই অসংখ্য স্থানে সুপেয় পানির গুরুতর সংকট রয়েছে। পানি নিয়ে লাখ লাখ মানুষের দুর্গতি চরমে। ওয়াসার এমডিসহ দায়িত্বহীন কর্মকর্তারা এখনও স্বপদে বহাল আছে। সেবাখাতসমূহের উন্নতির বদলে অধোগতি অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সেবা ও সামাজিক খাতসমূহ এখন মুনাফাকেন্দ্রিক পণ্যে পরিণত হয়েছে।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য চরমে উঠেছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লুটেরাদের যথেচ্ছ লুটপাটের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ খুলে দেয়া হয়েছে। লক্ষ কোটি টাকা ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে খেলাপিঋণ উদ্ধারের পরিবর্তে নামে মাত্র ২% টাকা জমা দিয়ে (ডাউন পেমেন্ট) ১০ বছরের সময় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পুনরায় ব্যাংক লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঋণখেলাপিদের শাস্তির পরিবর্তে, তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পরিবর্তে প্রায় নজিরবিহীনভাবে তাদেরকে উল্টো অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকের চিহ্নিত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি, বরং তাদেরকে নতুনভাবে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা কৃষি ঋণের জন্য ১ লক্ষ ৬৮ হাজার কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা ও ১২ হাজার কৃষকের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিসর্জন দিয়ে প্রকারান্তরে ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী ব্যাংক ডাকাতদের সহযোগির ভূমিকা পালন করছে। এর ফলে লাখ লাখ আমানতকারীর আমানত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে; ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ন্যূনতম শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
অপরদিকে অব্যাহত রয়েছে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, জবরদখল, প্রশাসনিক জুলুম, নিপীড়ন, হত্যা, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনাচার। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ‘বালিশ কা-’ হাজারো বেপরোয়া দুর্নীতির একটি প্রতীকী উদাহরণ মাত্র। বস্তুত দেশে এখন এই চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারী নিপীড়ন-ধর্ষণ-হত্যা যেন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও নারীরা-শিশুরা নিরাপদ নয়; নিরাপদ নয় মানুষের জান-মাল সম্ভ্রম। ধর্ষক, খুনী, দুর্নীতিবাজ, জবরদখলকারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণে, এদের বেশির ভাগই ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে অপরাধ বাড়তেই থাকে। সম্প্রতি বিশ্বজিতের খুনীদেরকে যেভাবে অপরাধমুক্ত করা হলো, তা এই ধরনের অপরাধকে কেবল উৎসাহিত করবে। এসবের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকা অকার্যকর। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতি দমনের বদলে দুর্নীতিবাজদের নিরাপরাধী হিসাবে সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে দুর্বল ও ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যকার ন্যূনতম ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করা হয়েছে। গণমাধ্যমসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকেও ক্রমে দুর্বল ও বিভক্ত করে দেয়া হচ্ছে। আর ৩০ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত নির্বাচনী তামাশার পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গোটা নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যত ধসে পড়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকরীতা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। দেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে, সাধারণ গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে, সরকার দেশের মানুষকে প্রতিনিয়ত অপমান ও অপদস্ত করে চলেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় থাকার রাজনৈতিক ও নৈতিক কোনো অবস্থান না থাকায় এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের ভোটের প্রয়োজন না থাকায় সর্বক্ষেত্রে তারা স্বেচ্ছাচারিতা অব্যাহত রেখেছে; ধরাকে সরাজ্ঞান করছে; ক্ষমতার মদমত্ততায় তারা যা খুশি তাই করে চলেছে। বাস্তবে দেশে এক ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন চলছে। এ কারণে বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তি ও জনগণের দাবি অনুযায়ী বিদ্যমান সংসদ বাতিল করে নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক পরিবেশে পুননির্বাচনের দাবিকে তারা আমলে নিচ্ছে না। বরং ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে নানাভাবে তারা গ্রহণযোগ্য করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজী দিয়ে বিএনপি ও গণফোরামের সংসদ সদস্যদের সংসদে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তারাও তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, বিএনপি ও তার মিত্রদের সংসদে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ভোট ডাকাতির এই ভুয়া নির্বাচনের সংসদের বৈধতা পাবার কোনো অবকাশ নেই।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনাদের মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমরা বাম গণতান্ত্রিক জোট এই পরিস্থিতিতে দেশ, জনগণ ও জনগণের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় ভোট ডাকাতির এই সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীন গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে পুননির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি জনজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম আমরা অব্যাহত রেখেছি। বর্তমান সরকারের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায় সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় বৃহত্তর আন্দোলন আমরা গড়ে তুলব। এই আন্দোলনে যুক্ত হতে আমরা দেশবাসীকে উদাত্ত আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে আমরা সকল বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও শক্তিকেও আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাই।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি হওয়ার জন্য আবারও আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

(বজলুর রশীদ ফিরোজ)
সমন্বয়ক
বাম গণতান্ত্রিক জোট