সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে-বাসদ

পুঁজিবাদী শোষণ ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে-বাসদ

SPB-07112020-10বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং মহান রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ১০৩তম বার্ষিকী উপলক্ষে ০৭ নভেম্বর ২০২০ শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাসদ কেন্দ্রীয় পাঠচক্র ফোরামের সদস্য কমরেড নিখিল দাস। সমাবেশ শেষে বিভিন্ন দাবি সম্বলিত ব্যানার ফেস্টুন সহকারে এক সুসজ্জিত লালপতাকা মিছিল প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে তেপাখানা রোড, পল্টন, জিপিও, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান, গোলাপশাহ মাজার, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হয়ে পুনরায় প্রেসক্লাবে এসে শেষ হয়।
SPB-07112020-9সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, ৭ নভেম্বর আমাদের দলীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। প্রথমত, আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৮০ সালের এ দিনে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের শোষণমুক্তির লক্ষ্যে শোষণহীন সমাজ তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর জন্ম হয়েছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি প্রায় উপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এ ভূখ-ের মানুষ করেছিল। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন হয়ে শাসক দল মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা ও আকাক্সক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ধারায় দেশ পরিচালিত হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর বাসদের জন্ম হয়।

SPB-07112020-4দ্বিতীয়ত, আজ থেকে ১০৩ বছর আগে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর রাশিয়ায় বলশেভিক পার্টি ও তার নেতা কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে এক শ্রমিক বিপ্লব সংগঠিত হয়। যা ছিল পৃথিবীর বুকে প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লব। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানব সভ্যতা এক উন্নত স্তরে তুলেছিল। শ্রমিক শ্রেণিও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে এ কথার বাস্তব রূপায়ন ঘটিয়েছিল।

SPB-07112020-1সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া দুনিয়াকে দেখিয়েছিল যে, রাশিয়ায় কোন মানুষ শিক্ষা বঞ্চিত নাই, কোন মানুষ অভুক্ত নাই, কোন বেকার নাই, ভিক্ষুক নাই, পতিতা নাই। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা, সর্বক্ষেত্রে ঘটিয়েছিল অভূতপূর্ব উন্নতি-অগ্রগতি। প্রতিষ্ঠা করেছিল নারীর অধিকার, দূর করেছিল নারী পুরুষ বৈষম্য। দেখিয়েছিল মুক্তির নতুন দিশা। ফলে বাংলাদেশের মানুষের শোষণমুক্তির লক্ষ্যে সোভিয়েত বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য ঐ দিনটি স্মরণ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নেতৃবৃন্দ বলেন, আজ যখন আমরা আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও রুশ বিপ্লব বার্ষিকী পালন করছি তখন সারা দুনিয়া বৈশ্বিক মহামারি করোনার সংক্রমণে বিপর্যস্ত। করোনা সারা পৃথিবীর মতো আমাদের দেশেও অর্থনীতিসহ যাপিত জীবনে নানামুখী সংকট তীব্র করেছে। করোনা মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে অপ্রতুল বরাদ্দ, দুর্নীতি, অনিয়ম, দলীয়করণে স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা ফুটে উঠেছে।

SPB-07112020-5চাল, ডাল, তেল, পিয়াজ, আদাসহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশ ছোঁয়া। বাজার  সিন্ডিকেটের দৌরাত্মে জনগণ জিম্মি। সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই।

নেতৃবৃন্দ বলেন, এ সময়ে দেশে যেমন মানুষ কাজ হারাচ্ছে, বিদেশ থেকে শ্রমিকেরা ফিরে আসছে। এর সাথে সরকার রাষ্ট্রীয় ২৫টি পাটকল বন্ধ করে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে ৫১ হাজার শ্রমিক; পাটচাষী, তাদের পরিবার ও এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে দুর্দশায় ফেলেছে। কর্মহীন মানুষের আয় কমেছে। দারিদ্র বেড়েছে। এদের রক্ষায় কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই।

SPB-07112020-0নেতৃবৃন্দ বলেন, একদিকে করোনা মহামারী-তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারীর উপর সহিংসতা, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা। এও যেন এক মহামারি রূপ ধারন করেছে। পুঁজিবাদী সমাজের ভোগবাদী মানসিকতা, নারীকে অধস্তন হিসেবে দেখার প্রবণতা, নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগহীনতা, ধর্ষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও গণআন্দোলন গড়ে না ওঠা এবং ক্ষমতার প্রভাবে বল প্রয়োগের প্রবণতা, বিচারহীনতার রেওয়াজ সর্বোপরি গণতন্ত্রহীনতাই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের জন্য মূলত দায়ী। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সচেতনতা ও প্রতিরোধ আন্দোলন জরুরি।

নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশ আজ দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। পত্রিকায় প্রকাশিত বালিশ, পর্দা কা- থেকে শুরু করে খিচুরী রান্না, শুটকি তৈরি করা, পুকুর খনন ইত্যাদি হেন প্রকল্প নেই যাতে দুর্নীতি নাই। বর্তমান সরকারই দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি, ব্যাংক ডাকাতদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে।

SPB-07112020-14নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশ শাসনে ক্ষমতাসীন সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতার কারণ সরকার দিনের ভোট রাতে সিল মেরে গায়ের জোরে ক্ষমতায় বসে আছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ সকল প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করে ফেলেছে। গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে।
সরকারের দুর্নীতি-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কোন কথা যাতে কেউ বলতে না পারে সেজন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে কুখ্যাত কালো আইন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করেছে। সংবাদপত্রের কণ্ঠকে রুদ্ধ করেছে। মিথ্যা হয়রানীমূলক মামলা দিয়ে সাংবাদিকসহ নাগরিকদের জেলে পুরছে।

নেতৃবৃন্দ আজকে দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য অবিলম্বে ভোট ডাকাতির সংসদ বাতিল, সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সকল বাম-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

নেতৃবৃন্দ সারাদেশের নেতা-কর্মীদেরকে রুশ বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়ে, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষকীতে পুঁজিবাদী শোষণ, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন হটাতে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম বেগবান করার শপথ নেয়ার আহ্বান জানান।

Translate »