পুঁজিবাদী সমাজ সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে প্রাণের স্পন্দনে শ্রেণিবন্ধন তৈরি করাই মিলন মেলার উদ্দেশ্য-কমরেড খালেকুজ্জামান

সমর্থক-শুভানুধ্যায়িদের বার্ষিক মিলন মেলা অনুষ্ঠিত
100317_SPB 16th Supporters met-17-Auidiance-1১০ মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাসদ এর সমর্থক-শুভানুধ্যায়িদের ষোড়শ বার্ষিক মিলন মেলায় উপস্থিতির একাংশ
১০ মার্চ ২০১৭ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের দিনব্যাপী ষোড়শ বার্ষিক মিলন মেলা ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কমরেড খালেকুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড জাহেদুল হক মিলু ও কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন। মিলন মেলায় দেশের বাম-গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, উদারনৈতিক রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী দরদী ও শ্রেণিপেশার ব্যক্তিবর্গ তাঁদের পরিবারের শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী সদস্য উপস্থিত হয়েছিলেন।
উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য প্রদানের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। মিলন মেলায় বক্তব্য রাখেন, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অজয় রায়, সিপিবি’র সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, গণফোরাম এর নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না, সন্ত্রাস বিরোধী ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক জনাব রফিউর রহমান রাব্বী, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ট্রাস্টি বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামসুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নাসিম আক্তার হোসাইন, গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুর রহমান বাবু, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহম্মদ, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য কমরেড বিমল বিশ্বাস, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, অ্যাডভোকেট মোস্তফা আমিন, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, জাসদের সিনিয়র সহসভাপতি এম এ গোফরান, সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন, ডা. মঈন ও ইটালি প্রবাসী সমর্থক নাজির মোহাম্মদ খান খসরু প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মিলন মেলায় সংহতি বক্তব্য রাখেন।
সুধী, সুহৃদ, শুভাকাক্সক্ষীদের বক্তব্যের মাঝে মাঝে আবৃত্তি, সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন শিশু-কিশোর, ছাত্রসহ বাসদ পরিবারের সদস্যরা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের সংগ্রামী ঐতিহ্য, মানবজাতির ও আমাদের ভূ-খণ্ডের মানুষের অগ্রগতির সহায়ক অর্জনসমূহকে রক্ষা করতে ও বিকশিত করতে চাই। আমরা আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভা-ারকে আরও ভরিয়ে তুলতে চাই, আমরা তরুণদের সৃজনীচেতনায় উদ্ভাসিত করতে চাই, আমরা যুবক-যুবতীদের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে যৌবনের প্রবল শক্তিতে দাঁড়াবার আহ্বান জানাতে চাই। আমরা শিশুদেরকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে চাই। হৃদয়হীন-লোভাতুর এই বুর্জোয়া সমাজ বেষ্টনীর বাইরে; মায়ামমতায় সিক্ত জীবনের ছবি দেখাতে চাই। বিগত সময়ে তার কতটুকু করতে পেরেছি তা বড় কথা নয়; কিন্তু অব্যাহত চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে সমাজের নানা স্তর থেকে আগত সমর্থক-শুভার্থী-সুধী জনেরা এসেছেন আমাদের উৎসাহিত করতে ও অংশ নিতে। আমরা তাঁদের পরামর্শ, সমালোচনা, উপদেশ এবং শুভকামনা নিয়ে সামনে এগুতে চাই।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কালে সমাজে একটা বন্ধন তৈরি হয়েছিল, গোটা সমাজ একটা পরিবারের রূপ ধারণ করেছিল। সেটা জাতীয় জাগরণের মধ্যে একটা জাতীয় পারিবারিক বন্ধন তৈরি করেছিল। আগামী দিনেও শোষণমুক্ত শ্রেণিহীন সমাজ নির্মাণে একটা শ্রেণি বন্ধন লাগবে। বর্তমান সমাজকাঠামো মানুষের মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে সেটা কাটিয়ে মানুষের মধ্যে প্রাণের স্পন্দনে বন্ধন তৈরি করতে হবে। আজ নানা ধরনের অশান্তি ঢুকে পরিবারগুলো ভিতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা, মমতা-দায়বোধগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্য থেকে মূল্যবোধগুলো হারিয়ে তারা অন্তসারশূন্য হয়ে যাচ্ছে। যারা স্নেহ-মমতা- ভালোবাসায় বেড়ে উঠে সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখতে পারতো; তারা হৃদয়হীন ভোগবাদী আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশের অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। এই রকম পরিস্থিতিতে আমাদের এই মিলন মেলার আয়োজন। এখানে শিশু-কিশোরেরা ক্ষণিকের জন্য মুক্ত পরিবেশ পাবে। পারিবারিক জীবনে তারা দেখে, মা-বাবা’র বাইরে স্নেহ করার কেউ নেই, এখানে তারা দেখবে বড় পরিসরে হাজার হাজার মানুষ তাদের স্নেহ-ভালোবাসা দিচ্ছে। তারা সমাজকে যে ভীতির চোখে দেখতো এখানে দেখবে ভীতিহীন সমাজের সেই চিত্র। আয়োজনের পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে যদিও আমরা পুরোপুরি সেই ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি।
ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। দৈনন্দিন কর্ম ব্যস্ততায় তারা হয়তো রাজনৈতিক সকল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেন না, তারাও এখানে এসেছেন। সমাজের বদলের সাথে ভাবজগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক-সামাজিক সমস্ত ক্ষেত্রে পরিবর্তনের একটা যুগপৎ প্রচেষ্টা না থাকলে, সার্বিক আয়োজন না থাকলে একটা বিপ্লবী কাজ সম্পন্ন হয় না। কারণ বিপ্লব সেই দিনই সম্পন্ন হবে, যেদিন সমাজের অধিকাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ এবং অবদান যে মাত্রারই হোক এক বিন্দুতে মিলিত হবে। সমাজ বিকাশের ও প্রকৃতিক নিয়মে আমরা অনেকে বিদায় নিব, যারা নতুন তারা এগিয়ে যাবে অনেক দূরের এই যাত্রাপথে অবিরাম গতিশক্তিতে। এই আহ্বানে আমাদের অনুষ্ঠানের কাজ আমি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর ঘোষণা করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।
অধ্যাপক অজয় রায় : শরীরটা ভেঙ্গে না পড়লে বাসদের এই মিলন মেলায় আমি প্রতিবছর আসার চেষ্টা করি এবং আসি। এটা বাসদের একটা পারিবারিক মিলন মেলা। বাসদ পরিবারের সদস্যরা আমরা প্রতিবছর একবার মিলিত হই। আমি ব্রিটিশ আমল থেকে কমিউনিস্ট বিপ্লব-যার ভিত্তি মার্ক্সবাদ এর স্বপ্ন দেখে আসছি। মাঝে মাঝে স্বপ্নটা হারিয়ে যায়, আবার সোচ্চার কমরেডরা সে স্বপ্নটা ফিরিয়ে আনে। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখছি একদিন বাংলাদেশে মার্কসবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন হবে। সেই বিপ্লবের ফসল যে রাষ্ট্রটি তৈরি হবে, সেটি সাধারণ মানুষের স্বপ্নের রাষ্ট্র হবে। শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না এর সাথে আমাদের কিছু কর্তব্যও আরোপিত হয়। আমাদের সংগঠনগুলোকে পরস্পরের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। যার যেখানে শক্তি আছে, প্রভাব আছে সেখানে একত্রে কাজ করবে। আমাদের পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার প্রয়োজন নেই।
বিপ্লবে যাওয়ার আগে আমাদের একটা পূর্ণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবেশ দরকার। সেটি কি হয়েছে? আমরা কি আমাদের দেশে বুর্জোয়া গণতন্ত্র বলতে যেটা বুঝায়, সে বিপ্লব কি আমরা যথার্থ অর্থেই সাধন করতে পেরেছি? আমরা কি বলতে পারবো, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সে কি উদার বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে? এরশাদের জাতীয় পার্টি কি বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে প্রতিনিধিত্ব করেছিল? অথবা বিএনপি বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে প্রতিনিধিত্ব করেছিল? এরা কেউই বুর্জোয়া অর্থেও গণতন্ত্রকে প্রতিনিধিত্ব করেনি। তা হলে আমাদের প্রথম কর্তব্য- বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বুনিয়াদ তৈরি করতে হবে। এর জন্য সমাজতান্ত্রিক যে পার্টি ও ব্যক্তি আছে তাদের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকার সাধনের কাজটা করতে হবে। শুধু উদারনৈতিক পার্টি দিয়ে আমরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কাজ সাধন করতে পারবো না।
কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব একই সাথে বুর্জোয়া বিপ্লবের অপূরিত কাজ সম্পাদনের কর্মপন্থা নির্ধারণ করা দরকার। এখন দুনিয়াতে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে, কমিউনিস্ট কর্মী যারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন, আপনারা অনুগ্রহ করে আপনাদের কর্মপন্থা ঠিক করুন। আপনাদের পারিবারিক মিলন মেলা সফল হোক।
কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বাসদের সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের বার্ষিক মিলন মেলায় আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়ে একাত্মতা প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাসদের বড় অর্জন হলো আমরা যে ঐক্য করতে পেরেছি এবং সেই ঐক্যের ভিত্তিতে সারা বাংলাদেশে দৃপ্ত পদক্ষেপে নতুন ধারার সূচনা হয়েছে। আজকের অনুষ্ঠানকে আপনারা মিলন মেলা নাম দিয়েছেন, যথার্থ অর্থেই এটা মিলন মেলা। এই মিলন মেলায় যারা এসেছেন তারা হলো শোষণমুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের সাহসী অংশীদার। এটা হলো মুক্তিকামী সমস্ত জনগণের মিলন মেলা, যার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিকটবর্তী হবে।
ব্রিটিশ আমল থেকে সমাজতন্ত্রের অনুসারী কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বামপন্থী প্রগতিশীল শক্তি ও ব্যক্তিরা অনন্য অবদান রেখেছিলেন। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কমিউনিস্টরা; কংগ্রেস করেছে স্বরাজের। কমিউনিস্টদের অনেক অর্জন আছে, আজকে সেটা বলার সময় নয়। আমরা আন্দোলনের, রাজপথের সংগ্রামে অনেক সফল হয়েছি, এখন এর পাশাপাশি নির্বাচনে জেতার সংগ্রামেও মনোযোগ দিতে হবে। তার মানে আমরা নির্বাচনপন্থী হওয়ার কথা বলছি না। সমাজ বিপ্লব করার জন্য আমাদের যে নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়, নির্বাচনও সে রকম একটা কৌশল। এই কৌশলেও আমাদের জিততে হবে। অতীতে সমাবেশে শতরঞ্জি বিছায় বামপন্থীরা আর বক্তৃতা করে বুর্জোয়ারা, আমরা আর এটা হতে দিব না। আমরা সংগ্রাম যেমন করবো তেমনি লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও যেতে হবে। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় না যেতে পারলে জনগণের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হবে না।
প্রদর্শনের জন্য নয়, আমাদের বাণী জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। এই ধারার নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনও আমাদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। টাকার খেলা, পেশিশক্তি, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ, প্রশাসনের কারসাজি, ইত্যাদি বন্ধ করে সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু ইত্যাদি সংস্কারের প্রস্তাব আমারা তুলে ধরেছি। এই প্রস্তাব জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।
আমাদের শত্রু অনেক। সাম্রাজ্যবাদ-সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দুশমন, লুটপাটতন্ত্র-গণতন্ত্রহীনতা আমাদের দুশমন। এগুলো থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। আর এর শক্তি হলো জনগণ। এর জন্য নিবিড় আবাদের মতো জনগণের ভেতরে বিপ্লবের আবাদ করে আমাদের শক্তিকে আমরা জোরদার করতে পারবো। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, প্রতিটি বিপ্লবে: সেটা জাতীয় মুক্তির ক্ষেত্রে হোক, বুর্জোয়া বিপ্লবের ক্ষেত্রে হোক বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বেলায় হোক, একটা প্রজন্মকে আত্মনিবেদিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। আমাদেরও এই রকম একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হবে; যারা আমাদের কথাগুলো নিয়ে চারণের বেশে সারা দেশে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের মাঝে ঘুরে বেড়াবে, জাগিয়ে তুলবে। মানুষের মাঝে থাকতে হবে, তার কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে, তাকে শিক্ষিত করতে হবে, পথ দেখাতে হবে, দিশা দেখাতে হবে। আমাদের দুই দলের ভিতরে সম্পর্ক আরও নিবিড় হওয়া প্রয়োজন। কখনও কখনও বামপন্থীরা একে অন্যের জমিনে গিয়ে চাষ করতে চায়। এটার তো প্রয়োজন নেই কারণ ৬৮ হাজার গ্রামের মধ্যে কয়টা গ্রামে বামপন্থীরা যেতে পেরেছে? সব তো খালি পড়ে আছেÑ সে খালি জায়গায় গিয়ে কমিউনিজমের চাষবাস করেন। বাসদ-সিপিবির ঐক্য শুধুমাত্র নেতাদের ঐক্য হলে হবেনা। আমাদের প্রভাবিত শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আমরা যে সংগ্রাম গড়ে তোলার সামর্থ অর্জন করি, সে সামর্থগুলোকে একত্রিত করেই বামপন্থীদের আসল শক্তির ভিত রচনা করতে হবে। আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের বলি বাসদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। একইভাবে কমিউনিস্ট পার্টি যে সব জায়গায় কিছু শক্তি অর্জন করেছে সেখান থেকে বাসদেরও শিক্ষা গ্রহণ করার আছে। কারণ অভিজ্ঞতার মূল্য আছে। এভাবে আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারি। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই। একদিন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশে যে কর্মকা- পরিচালিত হবে তা বাসদ-সিপিবি অন্যদের সাথে নিয়ে পরিচালিত করবে। সেই সমাজতান্ত্রিক মিলনমেলার প্রত্যাশা রেখে আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি শেষ করছি।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য : পহেলা বৈশাখে বাঙালি জাতি তার আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছিল। পাকিস্তান আমলে সে পহেলা বৈশাখ আক্রান্ত ছিল, এখনও আক্রান্ত হচ্ছে। নারীরা আক্রমণ-নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছে। নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বাল্যবিবাহের পথে হাঁটছে সরকার। এইসব ঘটনায় সাংস্কৃতিক আন্দোলন অনেক বড় অস্ত্র ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে গান গেয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করা হয়েছিল। সাংস্কৃতিক কর্মকা- যদি গ্রামে গ্রামে, থানায় থানায়, জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত হয়, তা হলে ধর্মান্ধতা, হেফাজতিকরণ, জামায়াতিকরণ, সাম্প্রদায়িকিকরণ মোকাবেলা সহজ হবে। বাসদ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে, সে ক্ষেত্রে আমরা তাদের সাথী হতে আগ্রহী। বাসদের এই মিলন মেলার সফলতা কামনা করি, আগামী মিলন মেলায় আংশগ্রহণের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করে সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
মাহমুদুর রহমান মান্না: এর আগে আমি আসতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে এরকম একটা আয়োজনে না আসতে পারলে মিস করতাম। আমি এই পরিবারেই একজন ছিলাম। মনে হচ্ছে খুব উন্নততর সংগ্রামের কথা বলা হচ্ছে। আমার জন্য প্রায় অসম্ভব একটি টার্গেট। এটা পারা যাবে না। যারা এই বিশ্বাস নিয়ে লড়াই করেছে, কাজ করেছেন, তাদের সম্মান করেছি। আমার বিশ্বাসের জায়গায় আমি থেকেছি। আমি আপনাদের সম্মান জানাচ্ছি, এই যে পরিবারসহ অনুষ্ঠানটি করেছেন। সাড়ে চার’শ কোটি বছরের পৃথিবী, কতখানি জানি। আমাদের মতো মানুষের বয়সও এক লক্ষ বছর। শেষ পর্যন্ত মানবজাতি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে জানি না।
বড় নিষ্ঠুর-নির্দয় শাসনের মধ্যে আমরা বাস করছি। দুই বছর জেল খেটে বেরিয়ে দেখলাম পুরো দেশ ভয়ের চাদরে আচ্ছাদিত। আমি যখন জেলে ছিলাম, তখন সমস্ত পরিবারের ওপর একটা চাপ। সকাল বেলায় একটা এজেন্সি ফোন করে, বিকেল বেলায় আরেকটা এজেন্সি হুমকি দেয়। মানুষের মধ্যে যে স্নেহ-ভালবাসা, দরদ-অনুভূতি ভয়ে তা প্রকাশও করতে পারছে না। আপনাদের এই অনুষ্ঠান সেই ভয়ের সাংস্কৃতি ভাঙ্গতে সাহায্য করবে।
আজকে একটা দুঃশাসনে বাস করছি আমরা। এখন কোন আইন নেই, বিচার নেই, কোন কথা পর্যন্ত বলবার সুযোগ নেই। আজকের এই অনুষ্ঠানে আমার অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে। যারা এখানে এসেছেন, কচি-কিশোর, যুবক-যুবতী; আপনারা আপনাদের বাবা-মা, আত্মীয়- স্বজনদের দেখান; যারা এই মঞ্চে বসে আছে তারা এ দেশের সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ। এই যে শিশুরা, এরা বড় হয়ে দেখবে যে, এই ধরনের অনুষ্ঠান বাংলাদেশে অনেক পার্টি করেনি। ওরা যাতে বোঝে এই দল অনেক বড় একটা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছিল। একটা মহান ব্রত তাদের মধ্যে ছিল। সেজন্য এই দল যারা করেছেন তাদের শ্রদ্ধা করা যায়। কোন সন্তান যেন মনে না করেন, তার পিতা, মাতা বা অন্য কেউ যারা এই দল করেছে, সেটা শ্রদ্ধা করার মতো, তারা ভুল করেনি। এই ধরণের অনুষ্ঠান আর কেউ করে কিনা আমি জানি না। তবে এটা ঠিক এই দুঃশাসনে যদি নিজের পরিবার ঠিক করা না যায়, তখন পরিবার বলবে আপনি ভুল করেছেন। যদি পরিবারকে যুক্ত করে সেই সংগ্রাম করতে পারেন, তখন পরিবার বলবে, আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বা সন্তান যাই করেছে, সেটা দেশের জন্যই করেছে, বড় কাজ করেছে।
আমি জেলে থেকে দুই বছরে যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, জেলে থাকবার কারণে যতখানি, তার চাইতে বেশি যারা শাসন করেন, তাদের ইচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধন করবার প্রবণতা থেকে। আমি চাই সকল দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শক্তি যাতে আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকে। আমি বলতে চাই, চেতনা বিক্রি করে ব্যবসা বাংলাদেশে হবে না। সুদ এবং আসলে যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য নেবার চেষ্টা করতে হবে। দেশে সব চাইতে বড় সমস্যা কী? সব চাইতে বড় সমস্যা গণতন্ত্রের সমস্যা। যেখানে গণতন্ত্র নাই, কথা বলবার অধিকার নাই, সেখানে মেহনতি মানুষ তাদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে লড়াই করতে পারে না।
গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোন যুক্তি কেউ দেখাতে পারেনি, তার পরও কেন দাম বাড়ানো? আমি বামের লক্ষ্যে লড়াই করছি না, গণফোরাম করছে না। কিন্তু মনে করি বাম এর লক্ষ্য মহান। মানুষ যখন বলবে আপদ গেল বিপদ আসলো, আমি তখন বলবো আমি মুসকিল অহসান-আপনাদের সামনে এসেছি। সেই মঞ্চ বানাতে হবে। আমার যতখানি শক্তি আছে আমি সবখানি দিয়ে এই উদ্যোগের সাথে থাকতে রাজি আছি। আজকের অনুষ্ঠান প্রমাণ করে, সব চাইতে বেশি যাদের সমালোচনা করা হতো, গালাগালি করা হতোÑ ওরা কি রকম করে সমস্ত পরিবার নিয়ে ঐক্যবদ্ধ একটা সমাজ নির্মাণ করবার চেষ্টা করছে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ : বাসদের এই মিলন মেলায় উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দিত। আমার সৌভাগ্য যে, বেশ কিছু দিন ধরে বাংলাদেশের সকল বাম সংগঠনের সাথে একসাথে কাজ করছি। সেই সুবাদে বাসদ-এর নেতা-কর্মীদের সাথে একসাথে চিন্তা করার, মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ করার সুযোগ আমার হয়েছে। জাতীয় কমিটিতে কাজ করার মধ্য দিয়ে একটা জিনিস প্রমাণ হয়েছে যে, দেশের সকল বামপন্থীরা একসাথে সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে সফলভাবে কাজ করতে পারে।
সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রের জন্য যে লড়াইটা তা সেটা কি কার্ল মার্কস-এর তত্ত্বের কারণে দেখছি, নাকি সাম্যবাদের জন্য লড়াই করছি বলে মার্কসবাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ গড়ে উঠেছে? আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছিলেন, ‘মানুষের সাথে মানুষের বৈষম্য থাকবে না, মানুষের ওপর মানুষের নিপীড়ন থাকবে না, নারী- পুরুষের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না, জাতপাতের জন্য মানুষের সাথে বৈষম্য থাকবে না, ভিন্নতা থাকবে না, ধর্মের ভিন্নতা থাকার কারণে কোন বৈষম্য থাকবে না, এটা- তো কা-জ্ঞানের বিষয়।’ এই কা-জ্ঞানটা মানুষ হারায় কখন, হারায় যখন সে বিভিন্ন স্বার্থের আচ্ছন্নতার মধ্যে পড়ে। যখন ব্যক্তিস্বার্থ সংকীর্ণ হয়ে সমষ্টির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়Ñতখন সে যেকোন কিছু করতে দ্বিধা করে না। ব্যক্তিস্বার্থ যখন সমষ্টির স্বার্থে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সে কা-জ্ঞান হারায় না। সেই চিন্তায়ই হয় সাম্য চিন্তা। একা একা লড়াই চলে না, লড়াই করতে হবে সামষ্টিকভাবে। বাসদ এই রকম একটা লড়াই দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করছে। সে লড়াই করতে গিয়ে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, আমরা একসাথে কাজ করছি।
কার্ল মার্কস-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক কী? সম্পর্কটা হচ্ছে, এ লড়াই করতে গিয়ে, সবচাইতে সুসংবদ্ধ, পরিশীলিত, সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি। এই কারণে, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও সেতুং-কে আমরা শিক্ষক হিসেবে নিয়েছি। তাদের চিন্তা-বিশ্লেষণ পদ্ধতি আমাদের সমৃদ্ধ করে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের সমাজকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন না করি, তা হলে সে তত্ত্ব আমাদের কাজে আসবে না। বাংলাদেশ বিশ্বাসের দেশ; বিশ্বাস উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করা হয়। বিশ্বাসের কোন কাঠামোতে যদি মানুষকে আটকে রাখা যায়, তা হলে মানুষকে শাসন করা যায়। যেমন আমাদের বিশ্বাস করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শেখ মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনাকে দিয়ে দেশের-সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না! নেপোলিয়ানের একটা কথা আছে- ধর্ম আমার প্রয়োজন নেই কিন্তু যে জনগণকে শাসন করা হবে তাদের জন্য প্রয়োজন।
মিডিয়ার প্রচারে সারা পৃথিবীর মানুষকে বুঝানো হয়, যারা ধনী হয় তারা দিনরাত পরিশ্রম করেই ধনী হয়। কিন্তু পুঁজির উদ্ভব কিছু ব্যক্তির সততা এবং পরিশ্রমে হয় না। আমরা বাস্তবে কী দেখি? দেখি, আমাদের দেশের যে ব্যক্তি এখন বিশে^র ধনীদের খাতায় নাম লিখাতে পেরেছে, সে শেয়ার বাজারে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঠকিয়ে, ব্যাংক ডাকাতি করে, মানুষকে প্রতারিত করেই পুঁজির মালিক হয়েছে।
আমাদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যেমন পুলিশকে মোকাবেলা করতে হয়, রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হয়, তেমনি শাসকদের জন্য নির্মিত সুবিধাজনক বিশ্বাসের কাঠামো, সেই কাঠামোকে মোকাবেলা করার জন্য নিজেদের যথেষ্টমাত্রায় সমৃদ্ধ করতে হয়, নিজেদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা সমৃদ্ধ করতে হয়। কোন দেশের মানুষ যদি তাদের দেশের শাসককে স্বীকার না করেন, তা হলে শাসকদের পক্ষে জনগণকে শাসন করা সম্ভব হয় না। তার মানে জনগণ যতদিন সে শাসককে প্রত্যাখ্যান করার শক্তি আর্জন না করেন, ততদিন শাসকদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়। শুধুমাত্র অস্ত্র, সেনাবাহিনী, পুলিশ দিয়ে জনগণকে দমন করা যায় না। সেই জায়গায়ই হচ্ছে বিপ্লবী সংগঠনের আন্দোলন সংগঠিত করার কাজ, তাত্ত্বিক ভিত্তির কাজ, সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কাজ। আমি দেখছি বাসদ সেই কাজটা আন্তরিকতার সাথে করে যাচ্ছে।
ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী: হাইকোর্টের সামনের ভাস্কর্য ‘স্ট্যাচু অব জাস্টিস’ সরানোর জন্য প্রথমে কথা বলেছে আওয়ামী ওলামা লীগ, পরে হেফাজত, এখন বিএনপি ও অন্যান্যরাও কথা বলছেন। দেশের অগ্রগতির জন্য নারীর অগ্রগতি দরকার। বাসদ এর মতো দলকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। তাদেরও চিন্তার প্রসারতা দরকার।
আজকে গার্মেন্টস এর কর্মীটির বেতন ৫-৭ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রামের কৃষক-শহরের শ্রমিকের সন্তান পড়তে পারে না। আজকে কথা বলা যাবে না, মুখ খোলা যাবে না। বাসদকে এগুলো ভাবতে হবে। ৭ মার্চের ভাষণ যেমন আলোচনা হয়, জনগণ যে অধিকারগুলো পায়নি, সেগুলোও আলোচনার সুযোগ দিতে হবে।
কমরেড বিমল বিশ্বাস: কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। আবার অবিচ্ছিন্ন আন্দোলন বলে নির্দিষ্ট দেশের বাস্তবতাকে না বুঝারও সুযোগ নেই। আদর্শগত ক্ষেত্রে বাসদের কোন প্রকার বিচ্যুতি আমার চোখে দেখা যায়নি। মার্ক্সবাদী হিসেবে কেউ নিজেকে দাবি করলে, তাকে সাম্রাজ‌্যবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতেই হবে। জনগণের জীবনের প্রকৃত সংগ্রামকে কমিউনিস্টরা কোনোভাবে এড়িয়ে যেতে পারে না।
ক্ষমতাসীন দলেন বর্তমান কর্মকাণ্ডকে যদি কেউ ফ্যাসিবাদী বলে থাকেন, সেটা ভুল নয়। আমাদের শত্রুশ্রেণির কেউ একজনও যদি ভালো কথা বলে তাও আমরা গ্রহণ করতে পারি।
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী: নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজকের অনুষ্ঠান সত্যিকারের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। আমরা এই পরিবারেরই বর্ধিত সদস্য। আমি বাসদকে ধন্যবাদ জানাই কারণ আমাদের সামনে যে ইস্যুগুলো আসে, সবগুলো নিয়েই তারা আন্দোলন করার চেষ্টা করে। সুন্দরবন, তেল-গ্যাস, তিস্তা ইস্যু এবং সর্বশেষ পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তন, তাদের পত্রিকায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে, আমরা উপকৃত হয়েছি। এটা হচ্ছে আওয়ামী-হেফাজতী সরকার। আওয়ামী লীগ তো দেশটাকে পাকিস্তান করে ফেলছে। প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা-চলাফেরা একটা সামন্তবাদী আচরণ। এখানে গণতন্ত্রের শাসন থাকবে না, আইনের শাসন থাকবে না, এখানে সাংবিধানিক অধিকার, ন্যায় বিচার, থাকবে না। তারা যা বলছে সেটাই আইন- সেভাবেই সব কিছু চলবে। ত্বকী হত্যার চার বছর হয়ে গেল, হাইকোর্টের নির্দেশনা ছিল, ওপরের নির্দেশে চার্জসিট দেওয়া হচ্ছে না। সাত খুনের মামলায় যারা সরাসরি যুক্ত, তাদের সাজা হয়েছে; কিন্তু নেপথ্যে যারা ছিল, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
অভিজিৎ রায়ের হত্যার দুই বছর পার হয়ে গেল- কিছুই হলো না। সরকারের আচরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে হত্যাকারীকে তারা বৈধতা দেয়। বিনা বিচারে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে দুই বছর আটকে রেখেছে। তাঁকে ৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। হাইকোর্ট বার বার বলছে একে ছেড়ে দেন, ওকে ছেড়ে দেন কিন্তু আপনারা তাদের আটকে রাখবেন। মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর ত্যাক্ত-বিরক্ত। মৃণাল হক হাইকোর্টের সামনে বিচার বিভাগের সাথে সম্পর্কিত গ্রিকের ধারনা থেকে একটা ভাস্কর্য ‘স্ট্যাচু অব জাস্টিস’ তৈরি করেছিল; এই রকম ভাস্কর্য ইরানেও আছে। হেফাজত এটাকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে মাঠ-ময়দান গরম করছে। আওয়ামী ওলামা লীগ প্রত্যেক দিন এটা নিয়ে বক্তৃতা দেয়। এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোন বক্তব্য নেই, পাঠ্যপুস্তকে এত বড় পরিবর্তন করেছে সেটা নিয়েও তাদের কোন বক্তব্য নেই। তাই জোট-মহাজোটের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী যারা আছে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের প্রতিহত করতে হবে।
অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহম্মদ : আমি মুগ্ধতার সাথে পূর্ববর্তী বক্তাদের বক্তব্য শুনছিলাম। বাসদ সম্পর্কে তাঁরা যে বক্তব্য রেখেছেন আমি তার সাথে একমত। দলটা কত বড় সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যখনই জাতীয় কোন সংকট এসেছে, তারা সেই সময় জনগণকে আশার আলো দেখিয়েছে। তেল-গ্যাসের আন্দোলনে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, ভোটের রাজনীতির দৈন্যদশায় বাসদের বক্তব্য মানুষের মাঝে কৌতুহল জাগিয়েছে।
মার্ক্স হয়তো নিজেও জানতেন না, তার মতবাদ সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলবে। যে কোন আদর্শবাদী সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আসা স্বাভাবিক। মার্ক্সবাদী রাজনীতির অনুসারীরা আদর্শকে নিয়ে দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ করে, তাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, নিজেরা যে বিভক্ত হয়ে পড়ে, সেটা কিন্তু মার্কসবাদী হওয়ার লক্ষণ নয়। যখন কোন তত্ত্ব দেয়া হয়, তখন তার একটা পটভূমি থাকে। যখন আমরা তাকে প্রয়োগ করবো, চর্চা করবো, তখন তার উন্নতি সাধন করে তাকে প্রয়োগ করবো। কিন্তু আমরা সে জায়গায় ব্যর্থ হচ্ছি। বাংলাদেশে আমরা যারা মার্কসবাদ চর্চা করছি, তারা তত্ত্বের দ্বন্দ্বে পড়ে দল ভেঙ্গে ফেলে কৌশলগত কারণে আর সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারছি না।
এখন পুঁজিবাদের মধ্যে যে ঘোরতর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে; সেখান থেকেই সমাজতন্ত্রের একটা সম্ভাবনার আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শিখাবে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী আমাদেরকে অনুশীলন করতে হবে। যারা বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের মধ্যে আছেন তাদেরকে সারা বিশ্বের অবস্থা বিবেচনা করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। সামনে বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সেখানে বামপন্থীদের অংশগ্রহণ করতে হবে। ’৭০-এর দশকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের যে সফলতায়-স্বাধীনতা আন্দোলন, সে আন্দোলনে বামপন্থীরা পেছনে পড়েছিল। বামপন্থীরা অনেক আন্দোলন করেছে তার ফসল তুলে নিয়েছে বুর্জোয়ারা। এখন মানুষের চাওয়ার সাথে বামপন্থীদের চাওয়ার বেশি পার্থক্য নেই। বুর্জোয়ারা কিছু বিশ্বাসের আবহাওয়া তৈরি করে রেখেছে, এটা ভাঙা দরকার। তারা সমাজে কতগুলো ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে, গোলকধাঁধাঁয় মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। বামপন্থীরাই পারে জনগণকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসতে। এখন এমন করে কথা বলা হচ্ছে যে, মনে হয় ’৭১ ছাড়া আমাদের আর কোন ইতিহাস নেই। আমরা যদি প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে পারি তা হলে আন্দোলনের গতি সঞ্চার হবে।
অধিকারের প্রশ্নে আমরা শুধু কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে বুঝে থাকি; ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এগুলোও রাষ্ট্র, স্থানীয় রাষ্ট্র- এগুলোর ক্ষেত্রেও বামপন্থীদের নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার আছে। ৭০ এর দশক পর্যন্ত বামপন্থীদের মূল্যায়নে স্থানীয় রাষ্ট্র হলো শোষণের অস্ত্র। তারা স্থানীয় রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করেছিল। কিন্তু ইউরোপের বামপন্থীদের আন্দোলনকে দেখলে দেখবেন তারা এগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। বামপন্থীদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে স্থানীয় ইউনিট-কেন্দ্রীক আন্দোলনের বিষয়টাকে গুরুত্ব দিবেন। স্থানীয় ক্ষমতায়নে বামপন্থীদের অংশগ্রহণের প্রয়োজন আছে, সেখানে জনগণের মাঝে কাজ করার সুযোগ আছে। স্থানীয় ইউনিটগুলোকে অধিকারে নিয়ে সমাজতন্ত্রের চর্চা করার সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। বাসদের এই মিলন মেলা আমাদের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সন্ত্রাস বিরোধী ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক, রফিউর রহমান রাব্বি : রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত কর…। আজকে আমাদের সমাজে মানুষের সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতা, পরিবারে বিচ্ছিন্নতা, সর্বত্র একটি বিচ্ছিন্নতা বিরাজ করছে। বুর্জোয়া শাসক-শোষকরা তাদের প্রয়োজনে এই বিচ্ছিন্নতা টিকিয়ে রাখতে, দীর্ঘায়িত করতে চায়। এর বিরুদ্ধে যুথবদ্ধ হওয়ার যে প্রক্রিয়া, সে প্রক্রিয়াই শোষণ-নিপীড়ন থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে। বাসদের আজকের আয়োজন সে মেলবন্ধন।
আমরা নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাস, আধিপত্য, চাঁদাবাজ, খুন-রাহাজানী, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন অপশক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি। এই আন্দোলন করতে গিয়ে, বাম সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো একটা ফোরামে ঐক্যবদ্ধ জায়গায় এসেছে। সারা দেশে এই রকম অপশক্তি আছে। সরকার এই অপশক্তিকে টিকিয়ে রেখে তার ওপর ভর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। এর হাত থেকে মুক্তির জন্য ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে আমরা বিজয় পেয়েছি, এই অভিজ্ঞতা অন্যরা কাজে লাগাতে পারে।
অধ্যাপক সামসুল আলম : আমি এক বছর আগে এই জায়গায় এসেছিলাম এবং হতাশা ব্যক্ত করেছিলাম। এক বছরের ব্যবধানে আমার হতাশা কেটেছে, আমি কিছুটা আশাবাদী হয়েছি। নিত্য দিন যে মানুষের সাথে কাটাই, যাদের সাথে মিশি কাজ করি সেখানে ভালো মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ভালো মানুষ দেখার একটা পিপাসা আমার মধ্যে কাজ করে, এখানে আসলে কিছু ভালো মানুষের সাক্ষাৎ পাই, সেই আগ্রহ আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। এই কারণে আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
আমরা জ্বালানি খাতে জনগণের অধিকার আদায়ে লড়াই করছি। এক সময়ে মানুষ খাদ্যের জন্য লড়াই করেছিল, আজকে জ¦ালানির জন্য লড়াই করছে। এ লড়াইয়ে মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে ফুলবাড়ীতে, ডিজেলের জন্য কৃষকদের প্রাণ দিতে হয়েছে। এই সব কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে আমাদের লড়াইয়ের একটা পরিণতির জায়গা এসেছে। অনেক জায়গায় অনেক ভাবে আমরা সফল হয়েছি।
সব ব্যাপার যোগ করলে দেখা যায়, পরিণতিতে এ খাতের কোন উন্নতি হয়নি, আরও খারাপ হয়েছে। আমরা এক সময়ে আইপিপি’র বিরুদ্ধে ছিলাম, আমরা দাবি তুলেছিলাম, বিদেশিদের দিয়ে কাজ করালে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেশি পড়ে। আমরা আমাদের মালিকানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই, গ্যাস তুলতে চাই। আমরা আমাদের শত ভাগ মালিকানায় কয়লা তুলতে চাই, ব্যবহার করতে চাই। সেখানে আমাদের দক্ষতা-যোগ্যতা, সক্ষমতা সার্বিকভাবে উন্নয়ন করতে চাই। এর মধ্যদিয়ে আমাদের অধিকার এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি আমরা সামনে এনেছিলাম। এখন দায় মুক্তি আইন দিয়ে জ¦ালানি খাতের উন্নয়ন করা হচ্ছে, সেখানে কোন প্রতিযোগিতা নেই। চুক্তিগুলো আমাদের স্বার্থ-বিরোধি হচ্ছে। এই সব করতে গিয়ে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর দরকার হচ্ছে। বেশি দামে জ¦ালানি কিনতে হচ্ছে। সে লড়াইয়ের একটা পর্যায়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি বাসদ-সিপিবিসহ বামপন্থী দলগুলো হরতাল করেছে, জনসভা-পথসভা, মিছিল-অবস্থান ধর্মঘট, ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে। পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন, মিডিয়ায় বাকযুদ্ধ করেছেন। এই ইস্যুতে রাজনৈতিক প্লাটফর্মে আমরা সাড়া জাগিয়ে দৃষ্টান্তমূলক সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। সরকার তার অবস্থান থেকে পিছু হটছে। এটা ধরেই আমরা একটা পরিণতির দিকে যেতে পারবো। হয়তো এক-দুই বছর সময় লাগবে। এটা আমাদের আশার জায়গা। আপনারা যদি রাজপথে লড়াইতে না থাকতেন তা হলে এ অবস্থা তৈরি হতো না। ফুলবাড়ীর আন্দোলন, গ্যাস রপ্তানি বিরোধী আন্দোলন, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বিরোধী আন্দোলন, রূপপুর বিদুৎকেন্দ্র নির্মাণ বিরোধী আন্দোলন, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন যখন ভিতর থেকে অনুভব করি, তখন দেখি এর প্রতিবাদের মিছিলে যত মানুষ আসুক না কেন, আদর্শের জায়গা, দেশপ্রেমের জায়গা যদি শক্ত থাকে, তাদের সংখ্যা যত কমই হোক, তাদের ত্যাগ এবং দৃঢ়তা একটা জয়ের নিশ্চিত জায়গায় নিয়ে যায়। আমরা সে রকম একটা জায়গায় এখন আছি। আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে আমি অভিভূত, পুলকিত এবং আগ্রহী। আপনাদের কাতারে আমাকে এভাবে আসার সুযোগ বাসদ আমাকে দিয়েছে সে জন্য আমি তাদের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাসদ আন্দোলন সংগ্রাম করছে। বাসদের শুভানুধ্যায়ী যারা এখানে পরিবার নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন, তাদের সকলকে অভিনন্দন। বাসদ ৩৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আজকে যে জায়গায় পৌঁছেছে, হয়তো আরও বেশি বিকশিত হতে পারতো। শুধু বাসদ নয় বাংলাদেশের প্রগতিশীল দলগুলো আরও বেশি বিকশিত হতে পারতো এবং দেশের সমাজ পরিবর্তন করতে পারতো যদি এখানে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির চক্রান্ত সক্রিয় না থাকতো। সেই সঙ্গে আমাদের যে সমাজ ব্যবস্থা তা সাধারণ মানুষকে বাম ঘরানার যে কর্মসূচি, তাদের যে নীতি-আদর্শ, তাদের যে দর্শন তা বোঝাতে অনেক বেগ পেতে হয়। সেখানে অনেক কৌশল বড় বড় নেতারা গ্রহণ করেছেন। মওলানা ভাসানী নিজে কমিউনিস্ট না হয়েও বামদের পৃষ্ঠপোষক ও পরম বন্ধু ছিলেন। তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি যে ইসলামি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, এটা কী ধরনের সমাজতন্ত্র। তিনি বললেন, আমাদের সমাজের মানুষ তাবিজ-কবজ, পানি পড়া, বিশ্বাস, ধর্ম-কর্ম এমনভাবে বিশ্বাসী, এছাড়া সাধারণ মানুষের আর কোন অবলম্বনও নাই। আমার কাছে মুসলমানরা যখন আসে তাদের আমি ইসলামি সমাজতন্ত্রের কথা বলি, হিন্দু যারা আসে তাদের হিন্দু সমাজতন্ত্রের কথা বলি, বৌদ্ধদের বলি বৌদ্ধ সমাজতন্ত্রের কথা। এই সমাজতন্ত্র হলো-প্রত্যেক মানুষ ন্যায় বিচার পাবে, সাম্য থাকবে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ কমবে।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, বামপন্থীরাতো ক্ষমতায় যেতে পারে না। দেশে এখন যে ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তাতে আগামী দিনে তারা কোথায় থাকবে? তারা তো সরকার গঠন করতে পারে না? আমি বলি এটা বড় প্রশ্ন নয়। আপনারা গভীরভাবে একবার দেখুন, এই দেশের সরকারগুলো গত ৭০-৭৫ বছরে যতকিছু প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক কর্মকা- গ্রহণ করেছে বা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে তা হয়েছে বামপন্থী দলগুলোর আন্দোলনের চাপে। দৃষ্টান্ত দেখুন, পাকিস্তান শাসকরা এখানে উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। এর বিরুদ্ধে ’৪৮ থেকে ’৫২ পর্যন্ত ধাপে ধাপে যে আন্দোলন হয়েছে, তার প্রধান শক্তি ছিল বাম-প্রগতিশীল শক্তি। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার বাঙালিদের বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ’৫৪ সালে প্রতিক্রিয়াশীল দল মুসলিম লীগকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে গোপনে থেকেও কাজ করেছিল বামপন্থীরা। ’৬২-র ছাত্র আন্দোলনেও বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল প্রধান। পরবর্তীতে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন বিরোধী যে আন্দোলন ও নির্বাচন সেখানেও বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল প্রধান। স্বাধীনতা সংগ্রাম সেখানেও বামপন্থীরা ছিল সংগঠক ও সক্রিয়।
সব আন্দোলনে যে বামপন্থীরা ছিল প্রধান তাদের এখন একত্রিত হওয়া দরকার। আন্দোলনে পুরুষরা সংখ্যায় অধিক থাকে, সেখানে নারী-গৃহবধু, শিশু এবং যারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত নয়, তাদেরও যে আন্দোলনের সাথে যুক্ত করার ব্যাপার আছে, সেটা বাসদ করছে। বাসদের এই কাজকে স্বাগত জানাই।
ক্ষমতাসীনরা আগামী নির্বাচনের জন্য এখনই টেলিভিশনে প্রচার শুরু করেছে। আর বামপন্থীরা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন করছে, গ্যাসের দাম কমানোর আন্দোলন করছে, ফুলবাড়ীতে আন্দোলন করেছে, গ্যাস রপ্তানির চক্রান্ত ঠেকিয়েছে। এর জন্য নির্যাতন-নিপীড়ন, কারাবরণ সহ্য করছে বামরা।
ইতিহাসে লেখা থাকবে ফুলবাড়ীতে মানুষের বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ, ফসলের মাঠ, কবর-শ্মশান, হাট-বাজার সমস্ত কিছু ধ্বংস করে সেখানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি খনন করতে চাইলেও বামপন্থীরা তা করতে দেয়নি।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে যখন সিপিবি-বাসদসহ বামপন্থী দলগুলো আন্দোলনে নেমে জনমত তৈরি করেছে, আরেক ক্ষমতাপ্রতাশী বিএনপি তখন এই ইস্যু নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। তারা তো বড় আন্দোলন করতে পারতো। জ¦ালানি নিয়ে সব শাসকরাই ষড়যন্ত্র করেছে।
এই দেশের মানুষের স্বার্থ-অধিকার, মানবাধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায় বিচার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় সম্পদ-প্রকৃতিক সম্পদ রক্ষার কাজগুলো বামপ্রগতিশীলদেরই করতে হবে। বামদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জরুরি সময় এখন।
ড. মাহবুব উল্লাহ : আমাদের পথ দেখাতে হবে, পথ তৈরি করতে হবে। চোর-বাটপার, পুঁজিপতি, আমলা সবারই একটা আদর্শ আছে। আদর্শহীন মানুষ হয় না; তারা যা করছে সেটাই তাদের আদর্শ, দর্শন। মার্কসবাদ একটা দৃষ্টিভঙ্গী, একটা বিজ্ঞান। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সাথে আলাপ করলে মনে হয়, মার্কসবাদ এখন মৃত, এর কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই, এ নিয়ে পড়াশুনা করাটাও একটা বোকামি। কিন্তু পাশ্চাত্বের বুর্জোয়ারা মার্কসবাদ নিয়ে যে কি করছে সে দিকে তাঁরা মোটেও খেয়াল রাখেন না। ২০০৪ সালে ইকোনমিস্ট পত্রিকা কার্ল মার্কস-এর ওপরে কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল- ‘হ্যাঁ সত্যি কথা, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন হয়েছে, ধস নেমেছে কিন্তু তাই বলে মার্কসবাদকে ত্যাগ করা যাবে না।’ সেখানে বলা হয়েছিল-বাচ্চাকে গোসল করিয়ে তাকে পানিসহ ছুড়ে ফেলবেন না। অর্থাৎ পাশ্চাত্বের পুঁজিপতিরা যা বোঝে আমারা মুক্তিকামী মানুষ তা বুঝতে চাই না। কেন তারা মার্কসবাদকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, চর্চা করতে চায়? বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কেন সেটাকে অঙ্গীভূত করেছে? তার জবাব একটাই-পুঁজিবাদ একটা সংকটপ্রবণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, এই সংকট বুঝার জন্য মার্কসবাদের চাইতে ভালো কোন তত্ত্ব আজ পর্যন্ত বের হয় নাই। পুঁজিবাদের ওঠানামা বুঝার জন্য মার্ক্সবাদ অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার।
বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। এই কারণেই বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের যারা অনুসারী তারা যে চর্চা করছেন, তারা যে সঠিক পথে আছেন, সে কথা আমি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলবো। ব্যক্তিগত সম্পত্তির একটি নিজস্ব ধর্ম আছে, সে ধর্ম হচ্ছে- রক্তবীজের মতো বিকশিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আজকে আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজির কথা বলি, লুটপাটের কথা বলি; সেটা হচ্ছে পুঁজিরই নিজস্ব ধর্ম।
আজকে দেশে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে শেষ করা যাবে না। এখন আপনারা এখানে এই কর্মসূচি পালন করতে পারছেন; ভবিষ্যতে করতে পারবেন কিনা তা বলা যায়না। শ্রেণির জন্য গণতন্ত্র দরকার। কারণ গণতন্ত্র থাকলে মতের আদান-প্রদান, সংহতি তৈরি, সভা-সমাবেশ করা, সংগঠিত হওয়ার কাজটা সহজ হয়।
কমরেড সাইফুল হক : বাসদের এই ধরনের আয়োজনে উপস্থিত সবাইকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। বাসদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ঘরে ঘরে মানুষের চিন্তার মধ্যে সমাজতন্ত্রকে জনপ্রিয় করে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাসদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ নানা বিপর্যয়ের পরও লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে সমাজতন্ত্রের লাল ঝাণ্ডার বার্তা তারা নিয়ে গেছে। স্বৈরশাসন বিরোধী, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সাম্প্রদায়ীকতা-মৌলবাদী তৎপরতা বিরোধী সংগ্রামের কথা বলি, এই জনপদে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে সেই আন্দোলনগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটা উদাহরণ বাসদ তৈরি করেছে।
আমাদের দেশে স্বামী রাজনীতি করেন, পরিবারগুলো জানে না তিনি কী রাজনীতি করেন? হয়তো ঘরের মেয়ে-ছেলেটা স্কুল-কলেজে রাজনীতি করে, তার আদর্শটা কি, কি নিয়ে সে মশগুল ঘরের অন্য লোক জানে না। বাসদের শুরু থেকে নেতাকর্মীরা জীবনের সর্বব্যাপী, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সবার কাছে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতাটা দৃশ্যমান করার চেষ্টায় নিয়োজিত। হয়তো সবাই রাস্তায় মিছিল করে না, শ্লোগান দেয় না, কিন্তু পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেই সংগ্রামটা কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, সেই নতুন তাৎপর্যটা আমাদের রাজনীতিতে যোগ করেছে বাসদ।
আজকে আওয়ামী লীগ আর হেফাজত একাকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছেন, আর বাচ্চাদের বইয়ে যুক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী সাম্প্রদায়িক ভাবমানস। আর এটাই নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা!
নাসিম আক্তার হুসাইন : বাসদ পরিবারের মিলন মেলায় এসে একটি কথা মনে পড়ে গেল। ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পর পার্টি কংগ্রেসে লেনিন বলেছিলেন, এত বড় একটি আয়োজন এত মানুষ, কিন্তু আমি নারীদের যেভাবে এখানে দেখতে চাই সেভাবে তো দেখছি না। সবাই রেগে গেল কী বলতে চান, আমরা এত বড় একটা বিপ্লব করে বিজয়ী হয়েছি, নারীরা কি বিজয়ীনি হয়নি। লেনিন বললেন, আমি তো তাদের এখনও আঁতুর ঘর আর রান্না ঘরে দেখতে পাচ্ছি। সবাই বলেছিলেন, তাহলে আপনি কী বলতে চান? তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত আরেকটি বিপ্লব লাগবে। আমাদের দেশের নারীরা, আমরা কি রান্না ঘর আর আঁতুরঘর থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারি না? নারী যে হাতে প্রদীপ জ্বালান, সে চাল ধোওয়া স্নিগ্ধ হাত, সে হাতেই কী তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেননি? বন্দুক ধরেননি? ধরেছেন। নারীর সেই হাতে ন্যায় বিচারের পাল্লা নিয়ে যখন হাই কোর্টের সামনে ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কী কারণে এত জ্বালা ধরেছে? সেটা যদি পুরুষের হাতে ধরা থাকতো সেটা এতটা যন্ত্রণার কারণ কি হতো? আমরা এরকম একটা সময়ে এসে হাজির হয়েছি, সে জায়গা থেকে আমরা শুরু করতে পারি, সেই ভূমিটিই হতে পারে এই রকম একটা মিলন মেলার পারিবারিক জমিন।
বাচ্চারা ফেইসবুক, মোবাইল আর ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে, আমরা যদি জানালা-দরজা খুলে দেই তাহলেই তাদের জন্য ভিন্ন জগৎ তৈরি করে দিতে পারি। তবেই তাদের এই আসক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। তার জন্য দরকার সাংস্কৃতিক বিপ্লব। লড়াইটা তো শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, চিন্তার ক্ষেত্রেও হয়। শাসকরা তাদের চিন্তা দিয়ে আমাদের শাসন করে। আমাদের শ্রেণিশিক্ষা, ভাবনা, ভাষাগুলো শিশু-নারী, কৃষক-শ্রমিকদের উপযুক্ত করে তুলতে হবে।
আমি নিজ চোখে দেখেছি, মা তার ছেলেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছিল। সে মা তো এখনও আছে, আগামী যুদ্ধেও মা তার সন্তানকে পাঠাবেন, তারা তৈরি হয়েই আছেন। লুটপাটের বিরুদ্ধে আমাদের সেই সংগ্রামে নামতে হবে। আসুন তৈরি হই। ধন্যবাদ।
আবু সাইদ খান : আমি একটা বৈঠকে ছিলাম, এখানে আসার জন্য একটু তাড়াহুড়া করছিলাম দেখে বৈঠকের বন্ধুরা জানতে চাইলো আমি কোথায় যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছি। বললাম বাসদের একটা কর্মসূচিতে যাব। উপস্থিত একজন বললেন, ওখানে যে লোকগুলো আছে তারা সাচ্চা লোক, আর একজন বললেন, তারা লেগে আছে, আর একজন বললেন, তাদের একটা আদর্শ আছে। যারা ভিন্ন ঘরানার লোক তারাও মনে করেন বাসদ একটা আদর্শকে ধারণ করে, লালন করছে এবং সংগ্রামের ময়দানে আছে। এই জন্য আমি বাসদের লড়াকু বন্ধুদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। বাসদ কতদূর যেতে পারবে, তাদের ক্ষমতা কতটুকু, তারা কী সমাজটা বদলাতে পারবেন? আমি মনে করি পারবে। অবে সমমনা, সমচিন্তার অন্যদেরও সাথে নিতে হবে। তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দর নিয়ে যদি তারা এক মঞ্চে আসতে পারে তাহলে অন্য ইস্যু নিয়ে পারবে না কেন?
আমরা যারা বামপন্থী, সমাজতন্ত্র আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সে লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য যে গণতান্ত্রিক ও শ্রেণির দাবি সেগুলো নির্দিষ্ট করা দরকার। রাজনীতিতেও এই রকম ইস্যু নির্দিষ্ট করে এক মঞ্চ থেকে আন্দোলন করা যেতে পারে, এই দাবিটা অনেক দিনের। এখন সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া দরকার। যেমন, ভালো নির্বাচনের জন্য-সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এর জন্য তারা এক হতে পারে। ছাত্র সংগঠনগুলো, শ্রমিক সংগঠনগুলো, নারী সংগঠনগুলো এক হতে পারে। আমাদের অতীতের অর্জনগুলোর ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ’৭১-এর, স্বাধীনতা আন্দোলন ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে আন্দোলন করতে হবে। বিশে^র দেশে দেশে এই লড়াইগুলো হচ্ছে। অক্টোবর বিপ্লব ১৯১৭ সালে যে রকম করে হয়েছে এখন আবার করতে গেলে একই রকম হবে না, চীন বিপ্লবও একইভাবে হবে না, সেখানে ভিন্নতা হবে। আমাদের দেশেও ভিন্নভাবে হবে। এই বাস্তবতা মেনেই আমাদের কর্তব্য সাধন করতে হবে। বাসদ জনগণের সে আশা পুরণ করবে এই প্রত্যাশা রেখে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।
অ্যাডভোকেট মোস্তফা আমিন : এই আয়োজনে আমাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য আমি সম্মানিত বোধ করছি। স্বৈারাচার আইয়ুব খান উন্নয়নের দশক পালন করেছিল কিন্তু আমাদের গণতন্ত্র দেয়নি। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গতকাল সংসদে বক্তৃতা করে বলেছেন, ‘দেশে গণতন্ত্র আছে বলে উন্নয়ন আছে। মানে দেশে এখন উন্নয়নও আছে, গণতন্ত্রও আছে; তাতে অন্যদের গাত্র জ্বালা হচ্ছে কেন?’ কিন্তু তার এই উন্নয়ন ও গণতন্ত্র তো আমরা বুঝতে পারি না?
এক সময়ে মানুষ চায়ের দোকানে, বার এ্যাসোসিয়েশনগুলোতে মাছের বাজারের মতো রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক করতো, এখন এগুলো সব বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা এখন কবরের নিরবতায় বসবাস করছি। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তির রাস্তা কি? মুক্তির রাস্তা হচ্ছে, এই দুর্বৃত্তায়িত সরকারগুলোর হাত থেকে মানুষকে মুক্ত করা। এজন্য আমাদের ঐক্যের প্রয়োজন।
সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন : এই আয়োজনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো এবং কথা বলতে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। এক সময় আমি সমাজান্ত্রিক রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম, এখন সেভাবে যুক্ত নই। কিন্তু আমার কল্পনায় সব সময় সমাজতন্ত্র থাকে। আমার কাছে কখনও মনে হয়নি সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। যখন আমি প্রথম আলোতে কাজ করতাম, আমাদের সম্পাদকের মনে হয়েছে সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে; তিনি সরে আসলেন। তার হেদায়েত হয়েছে, আমার হয়নি। আমি এখনও মনে করি সমাজতন্ত্রই মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা।
আমাদের দেশের মানুষের মননটা একটু জটিল। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমাদের দ্রুত অবনমন ঘটছে, এটা আমরা কি বুঝতে পারছি? এখানে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা-সম্মান নেই, নিজের কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা নেই। শ্রদ্ধা করার মানুষের সংখ্যাও দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। যদি যার যা দায়িত্ব সেটা ঠিকঠাক মতো পালন হতো, তবে দেশের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতো। দেশের জন্য কিছু করতে হলে, অন্যের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, নিজেদের দায়িত্বশীল হতে হবে। সবাইকে ধন্যবাদ।
বরিশাল মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ডাক্তার মইন : বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আগে থেকেই আমার আকর্ষণ ছিল। বাসদ রাজনীতির উত্থান বেশ বিকাশমান। আমি বরিশালে বেড়াতে গেলে ডাক্তার নাবিলা আমাকে বেড়াতে নিয়ে যায় বরিশাল বাসদ অফিসে। জীর্ণশীর্ণ বাসদ অফিসে পরিচয় হয় ডাক্তার মনীষা, ইঞ্জিনিয়ার রুমনের সাথে। রুমন ইঞ্জিনিয়ার; এইভাবে রাজনীতি করছে, সেটা আমাকে কৌতুহলী করে তুললো। ভবিষ্যৎ যার আলোকিত সে প্রায় অন্ধকার একটা ঘরে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বসে আছে! তখন মনে পড়লো, ছাত্র জীবনে আমিও একবার আত্মগোপনে ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের পরিবারগুলো পছন্দ করে না- যারা বাম রাজনীতি করে, পথেঘাটে সাধারণ মানুষের মতো কাষ্টকর জীবন কাটায়, সরকারের রোষাণলে পড়তে হয়। আমার পরিবারও সেই রকম। একদিন রুমন, মনীষা আমার বাসায় আসলো, কিছুক্ষণ থাকলো- ফল হলো, আমার স্ত্রী-মেয়ে ওদের ভক্ত হয়ে গেল। এটা বললাম এই কারণে যে, বাসদের কর্মীরা মানুষের সাথে যত সহজে মিশে যায় এবং একটা গোটা পরিবারকে যেভাবে টেনে নেয়, সেটাই আমাকে বাসদ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। বাসদের অনেক সফলতা আছে তারা আগামী দিনেও সফল হবে সে আশাবাদ ব্যক্ত করে সবাইক ধন্যবাদ জানাই।
এম এ গোফরান : পাকিস্তান রাষ্ট্রটা আমাদের কাছে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তাই আমরা তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। কথা ছিল দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। তা কি হচ্ছে? দেশে এখনও ১৭৭২ সালের দেওয়ানি আইন, ১৭৭৩ সালের যে আইন দ্বারা হাইকোর্ট পরিচালিত হয়েছিল সে আইন এবং ১৮৬১ সালের পুলিশী আইনসহ বেশ কিছু আইন কেন বলবৎ আছে? বাসদ বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামের পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করছে, দলের অভ্যন্তরে সমাজতন্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আন্দোলন করছে এবং দেশের আশু সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আন্দোলন করছে। তাদের অভিনন্দন জানাই।
নাজির মোহাম্মদ খান খসরু : বাঙালি, যারা দেশের বাইরে প্রবাসে বসবাস করেন, তারা সবাই দেশের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত। ইউরোপে পুঁজিবাদী সরকারগুলোও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের মানুষ সে অধিকারগুলো পায় না। সেখানে মানুষের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা আছে। তারা মনে করে পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যেই মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব। তার জন্য একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা লাগবে, বাংলাদেশেও শাসন কাঠামোর মধ্যে সচ্ছতা আনলে বেশ কিছু সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রবাসীরা তো অর্থনৈতিক বিশাল সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে এবং আরও দেয়ার বাস্তবতা আছে। আশা করি বাসদ জনগণের আশার পরিপূরক সরকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম এগিয়ে নেবে। মেহনতি মানুষের জয় অনিবার্য।
মিলন মেলার সমাপনী বক্তব্যে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, সারাদিনে ৮ ঘণ্টায় ২২ জন শুভ্যার্থী বিশিষ্টজন এখানে বক্তব্য রেখেছেন। তাঁরা আমাদের দল না করেও আমাদের আয়োজনের প্রশংসা করেছেন, মতামত রেখেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। দলের সংগ্রামের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন, আমাদের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমাদের কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন; আবার দেশের বামপন্থী আন্দোলনের সার্বিক দুর্বলতার কথাও বলেছেন। ভবিষ্যতে আমারা তাদের আরও কথা শুনবো, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করবো, যতখানি মতপার্থক্য আছে সেটা দূর করার চেষ্টা করবো, যতখানি মতৈক্য আছে তার ভিত্তিতে আমাদের দলের শক্তি এবং আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি করার প্রয়াস আমরা নিব।
অনেকেই বলেছেন, কোথাও কোথাও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লেও সমাজতন্ত্রের কার্যকারিতা সমাজ বিকাশের নিয়মের মধ্যেই অনিবার্য পরিণতি রূপে রয়েছে। সমাজতন্ত্রের নানা ধারণা রয়েছে। কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের কথা টমাস ম্যুর নামে একজন ব্রিটিশ চিন্তাবিদ সাড়ে তিন’শ বছর আগে বলেছেন। আরেক দল সমাজের অনাচার, অবিচার, দুঃখ-দুর্দশা, লাঞ্ছনা দেখে সেখান থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছিলেন, সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, সেটা হলো পের্টিবুর্জোয়া সমাজতন্ত্র। কিন্তু সমাজ বিকাশের ধারায় যে শ্রমিক শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছে, সে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে এঁরা কেউ দেখা দেননি। সমাজতন্ত্রের বা শোষণমুক্তির আকাক্সক্ষা ও ধারনাকে বিজ্ঞানের ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেনি।
মার্ক্স বলেছিলেন, ‘কল্পনা দিয়ে কোন সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না, দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তির সন্ধান পাওয়া যায় না। সত্যের সন্ধান পেতে হলে সমাজাভ্যন্তরের নিয়ম, জগৎসংসারের নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্ক জানতে হবে এবং সে নিয়ম অনুযায়ী যদি ক্রিয়া করতে পারি তা হলে আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো।’ মার্কস যে দৃষ্টিভঙ্গী ও বিচার-বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন, যে শিক্ষাটা রেখেছিলেন সেটাই মার্কসবাদ। শুধুমাত্র নিছক মার্কস-এঙ্গেলসের সিদ্ধান্তগুলো আলাদাভাবে মার্কসবাদ নয়। প্রকৃতি, সমাজ, মানুষের চিন্তা পরিবর্তনের গতি এবং বিকাশের নিয়ম জানাই হচ্ছে মার্কসবাদ। মার্কস-এর বইপত্রে কী লেখা আছে, সে বিষয়গুলো মুখস্ত করে যত্রতত্র মেছাল না দিয়ে, ওই সিদ্ধান্তসমূহ, বক্তব্য যে দৃষ্টিভঙ্গী ও বিচারধারা প্রয়োগ করে মার্কস-এঙ্গেলস রচনা করেছিলেন এবং যাকে রুশ বিপ্লবের নেতা কমরেড লেনিন আরও সম্প্রসারিত করেছিলেন এবং সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ করে, কমরেড স্তালিন, মাও সেতুং, হো চি মিন, কিম ইল সং, ফিদেল ক্যাস্ত্রসহ বিভিন্ন দেশে যারা বিপ্লবকে সফল করেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে জ্ঞান ও বিষয়গুলোকে আমাদের আত্মস্থ করার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারবো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে বিপর্যয়টা হলো, তা কেন হলো? সেখানে মার্কস-এর শিক্ষা আছে, লেনিনের সতর্কবাণী আছে, স্তালিন, মাও সেতুং এর বক্তব্য আছে। সেটা না বুঝতে পারার কারণে, অনুধাবন করতে নাপারার কারণে অনেকে বিভ্রান্ত হন। কারণ শ্রেণিবিভক্ত পুঁজিবাদী সমাজ থেকে শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজে এক ধাপে, এক লাফে চলে যাওয়া যায় না। এর একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময় আছে যার নাম সমাজতন্ত্র। একে ক্রমাগত একটা স্তর থেকে আরেকটা স্তরে বিকশিত করে, উন্নীত করে এগুতে হয়। যথাযথ নিয়ম মেনে একে ক্রমাগতভাবে সাম্যবাদের লক্ষ্যে যদি বিকশিত করা না যায়, তা হলে সেটা ব্যর্থ হয়, পুঁজিবাদে ফিরে আসে। যে চেহারা আমরা বহু দেশে দেখছি।
অনেকে আমাদের কাছে আশা করেন আমরা যাতে মার্কসবাদকে সঠিক ও বৈজ্ঞানিকভাকে আয়ত্ব করি এবং সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আমরা যেন বিপ্লবী কার্মকা-কে সাজাই। আমরা সেই রকম সংগ্রামেই আছি। ভবিষ্যতে সতর্কতার সঙ্গে অধ্যবসায়ের সঙ্গে আমরা সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। আমরা সকলের সহযোগিতা চাই।
পুঁজিবাদ আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে-একথা সত্য। পুঁজিবাদ মানুষকে অধিকার সচেতন করেছে, বিশ্বাসের ভিত্তি থেকে যুক্তির জায়গায় এনেছে, বলেছে সবকিছুর একমাত্র বিচারক হবে যুক্তি। যুক্তির হাতিয়ারে তারা সকল প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদকে মোকাবেলা করেছে। আঞ্চলিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষের বৈষম্যকে মোকাবেলা করেছে। সামন্তবাদ আড়াই হাজার বছরে যা দিতে পারেনি পুঁজিবাদ দুই শ বছরে তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছে, এটা যেমন সত্য-তেমনি সমাজ বিকাশের ধারায় উনবিংশ শতকে এসে পুঁজিবাদ তার প্রগতিশীল ভূমিকা হারিয়ে ফেলে চরম প্রতিক্রিয়ার ভূমিকায় নেমেছে। এখন পুঁজিবাদ যতদিন দুনিয়াতে টিকে থাকবে সে তার অতীতের যা কিছু মহৎ অর্জন ছিল তা একটা একটা করে ধ্বংস সাধন করেই বাঁচবে। সে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করবে, মানুষ মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ, বাসস্থানের নিশ্চয়তা স্বাপেক্ষে একটা গণতান্ত্রিক শোষণহীন সমাজ নির্মাণের পথে বাধার পর বাধা তৈরি করতে থাকবে। ১৮ শতকের শেষে ফরাসি বিপ্লবের কথা ছিল ‘স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব’। মার্কস দেখিয়েছিলেন, অর্থনীতিতে যদি শোষণ থাকে, সমাজে-পরিবারে কোথায়ও সাম্য থাকবে না, অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বাড়বে, সামাজিক ভারসাম্য তত ধ্বংস হবে। আজকে সেই চিত্রই আমরা দেখি। বুর্জোয়ারা একদিন যা কিছুকে পরাস্ত করেছিল ছুঁড়ে ফেলেছিল, আজকে আবার সকল আবর্জনা আঁকড়ে ধরেছে, ফিরিয়ে আনছে।
আমেরিকানরা-ব্রিটিশরা নিজেদের গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে দাবি করে কিন্তু তাদের দিকে তাকালে দেখি-সেখানে বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়ীকতাকে উষ্কানি দিয়ে, টাকার উৎসবে, প্রচারের জোয়ারে জনজীবনের প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করে, উন্মাদনা সৃষ্টি করে ভোটে জিতছে। ভারতে দেখি-একটা সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতা দখল করে আছে। একদিন মানুষের যা কিছু বস্তুগত ও ভাবগত চাহিদা, সে চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে, মুনাফা সত্ত্বেও উৎপাদন ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিল, আজকে সর্বোচ্চ মুনাফার লোভে পড়ে তারা সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মুনাফা এবং একমাত্র মুনাফার সাথে গোটা ব্যবস্থাকে যুক্ত করে ফেলেছে। সেই কারণে আজকে অস্ত্র ব্যবসা এক নম্বর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। মুনাফা বাড়াবার জন্য; সামরিক কর্তৃত্ব বহাল রাখা, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করার জন্য, অস্ত্র উৎপাদন দিনে দিনে বাড়াচ্ছে। আমেরিকায় ট্রাম্প এসে বলছে, সামরিক ব্যয় বাড়াতে হবে, ভারত-চীন সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়াতে আমেরিকা মিসাইল বসাচ্ছে, উত্তর কোরিয়া ক্ষেপনাস্ত্র ছুড়ছে, ইসরাইল ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনছে; ইরানকে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। দুইটা বিশ্বযুদ্ধের পর এখন ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তানের মতো দেশে দেশে যুদ্ধ চলছে, যুদ্ধের জমিন সম্প্রসারিত হচ্ছে।
মার্কস পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর দেখে গেছেন। লেনিন দেখিয়েছেন, সে একচেটিয়া পুঁজি সাম্রাজ্যবাদের স্তরে পৌঁছেছে। আর পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ আছে মানে যুদ্ধ আছে, সে বারে বারে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। একদিকে ৮ জন ধনীর কাছে বিশ্বের ৩৬০ কোটি মানুষের সম্পদের সমপরিমাণ সম্পদ আজ জমা পড়েছে। এদের সম্পদের পরিমাণ ৪২ হাজার ৬২০ কোটি মার্কিন ডলার। (সূত্র : অক্সফাম) অন্যদিকে বিশ্বের অনেক দেশ- কঙ্গো, লাইবেরিয়া, বুরুন্ডি, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদানে দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা যাচ্ছে।
বিশ্বেরর বিভিন্ন দেশে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠছে। সমাজতন্ত্রের কথা আমেরিকায় প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, বার্নি স্যান্ডার্স যখন সমাজতন্ত্রের শ্লোগান নিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আসলেন, যুব সমাজের ঢল নেমে গেল। তাকে সরিয়ে দিয়ে হিলারিকে প্রার্থী করা হলো। ট্রাম্প এসে বললো, সকল বিদেশিকে তাড়াও। সাদাদের কর্তৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা সংখালঘু হয়ে যেতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার পুঁজিপতিরা বলছে, আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে এগুচ্ছি। কালো মানুষরা চলে গেলে কাজ করবে কে? তখন বলছে, আমরা রোবট দিয়ে কাজ করাবো, আমরা হাইটেকের জায়গায় যাব। তথাকথিত শিল্প বিপ্লব হওয়া মানে আরও বেশি সম্পদ পুঞ্জিভূত হওয়া। ধনী-গরিবের বৈষম্য আরও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।
আমাদের স্বাধীনতার চেতনার কথা বলা হয়েছিল। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এই তিনটা ঘোষণা দিয়ে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে বিজয়ের পর, আমাদের সংবিধানে-সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল। এখন বুর্জোয়ারা এর ধারেকাছেও নাই। সাম্য কোথায়? বৈষম্য আকাশ-পাতাল দাঁড়িয়েছে, বিশ্বের ধনীদের তালিকায় আমাদের দেশের এক জনের নাম এসেছে, আস্তে আন্তে আরও নাম আসবে। দরিদ্র-শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা বলে কিছু নাই। মানুষ সম্পদ হারাচ্ছে, মর্যাদা হারাচ্ছে, অধিকার হারাচ্ছে, ন্যায় বিচার বঞ্চিত হচ্ছে। একজন কালা মিয়া বিনা বিচারে ১৪ বছর জেল খাটে, অন্যদিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে সন্ত্রাসীদের শাসক দলের নেতা-কর্মীদের পাশে দেখা যায়, পুলিশ খুঁজে পায়না। সাজার পরও দুই সাংসদ বহাল তবিয়তে জনপ্রতিনিধি থাকলেন। উন্নয়নের ঢাকের আড়ালে রাজনীতি দুর্বৃত্তায়িত হয়ে পড়েছে আর দুর্বৃত্তের হাতে রাজনীতি চলে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করতে গিয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজ দলের প্রায় একশ জনকে খুন করেছে। যেই ছাত্রসমাজ শিক্ষার আন্দোলন করতো, যারা শিক্ষিত হয়ে ওঠার চেষ্টা করতো, এখন শাসক দলের সাথে যুক্ত ছাত্ররা হল দখল করে, সিট-বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য করে, টেন্ডার দখল করে, তোলাবাজি করে, নিজেরা নিজেরা মারামারি-গোলাগুলি করে। শাসক শ্রেণিভুক্ত প্রধান বুর্জোয়া দলগুলির অবস্থা এমন যে, একজনের অস্তিত্ব আরেকজনের ধ্বংস ছাড়া নিরাপদ নয়। ক্ষমতাসীনদের স্বৈরাচারী কায়দায়, ফ্যাসিবাদী কায়দায় ক্ষমতায় থাকতে হচ্ছে। এখন নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও তারা হারিয়ে ফেলেছে।
বাবা-মা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিশোর বয়সের ছেলেরা গ্রুপ বানিয়ে একজন আরেকজনকে খুন করছে, বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। মানুষের জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে; এগুলো সবই হচ্ছে ভোগবাদী, বঞ্চনা সৃষ্টিকারী, লাভ-লোভের নেশাধারী, হতাশা উৎপাদনকারী, পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার ফলাফল। মানুষ একটা প্রাণী, অন্যান্য প্রাণীর সাথে তার পার্থক্য হলো মানুষকে মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠতে হয়। জন্তু-জানোয়ারের জীবন ক্ষুণ্নিবৃত্তি ও বংশ বিস্তারে সীমাবদ্ধ। মানুষ বস্তুগত ও ভাবগত উৎপাদনে জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, নিজেকে সাজিয়েছে বহু বিচিত্র রূপে-রসে-মাধুর্যে।
আদিমকালে মানুষ যখন শিকার ধরে নিয়ে আসতো তখন খাওয়ার আগে নাচানাচি করতো। সেটা নৃত্যকলার শুরু, বিকশিত রূপ নয়। মানুষ তার ভাব প্রকাশের জন্য মুখের ভাষার পাশাপাশি দেহেরও একটা ভাষা তৈরি করেছে। অঙ্গভঙ্গীর নানা মুদ্রায় ইতিহাস-ঐতিহ্য, আবেগ-অনুভূতি, ছন্দময় গতিময়তায় স্থূলভোগের উর্ধ্বে দেহকে ভিন্ন এক নান্দনিক মাত্রায় নিয়ে গেছে। প্রাণী সত্তাকে সাংস্কৃতিক সত্তার স্তরে উন্নীত করেছে। প্রকৃতির অন্তরালে আরেকটা প্রকৃতি থাকে; মানুষ যখন নিজের কল্পনাশক্তিতে মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রকৃতির ও প্রাণ-প্রাণির ছবি আঁকে, তখন প্রকৃতিকে সাজাতে গিয়ে নিজে সাজে। এইভাবে তার ভিতরের প্রকৃতিরও অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটে যায়।
মৃদুমন্দ হাওয়ার দোলায় পত্র-পল্লবের কম্পনে, পাখপাখালির কূজনে, নদীতরঙ্গে, প্রকৃতি-পরিবেশের নানা পরিবর্তনে ব্যক্ত ও অব্যক্ত সুর থাকে, তাকে ছাপিয়ে মানুষ কণ্ঠে ও যন্ত্রে যখন সুর তোলে-সুন্দর কথামালাকে উঁচু সুরে গাঁথে, তখন হৃদয়তন্ত্রীতে ঝঙ্কার ওঠে। প্রশান্তির খোঁজে বর্বর চিত্ত শান্ত ও বিন্যস্ত হয়। এইভাবে অতীতের মানুষ বস্তুগত উৎপাদন ও ভাবগত উৎপাদন সৃষ্টি করেছে। তারা ইতিহাস-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য-সংস্কৃতি সহ¯্রমুখী ধারা জন্ম দিয়ে আমাদের কাছে হাজির করেছে। একদিন মানুষ এবড়ো-থেবড়ো হাল-হাতিয়ারকে যখন মসৃন হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে, তার মধ্য থেকেই মানুষের চিন্তা জগত ও রুচির কাঠামো বিন্যস্ত হয়েছে। সেখান থেকে মানুষের মধ্যে নান্দনিকবোধ, রুচিবোধ, সৌন্দর্যবোধ জন্মেছে এবং পরবর্তী উৎপাদনে তার ছাপ পড়েছে। এভাবে মানুষ অগ্রসর হয়ে আজকের জায়গায় এসেছে। যখন এগুলো আর বিকশিত হবে না, তখন মানুষের মানবিক সত্তা, সাংস্কৃতিক সত্তা, রাজনৈতিক সত্তা নামতে নামতে একইরূপে না হলেও বৈশিষ্টগতভাবে আদিম প্রাণিসত্তার স্তরে নেমে যাবে। তার মধ্যে সমাজচেতনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন মানুষ আর মানুষের মতো আচরণ করতে পারবে না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এগুলো বিকশিত হয়ে আজকের জায়গায় এসেছে। এখন পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী লালসার আগুনে সব পুড়ে ছাই হতে চলেছে। ইমারত যত উঁচুতে উঠছে, মানবতা-মনুষ্যত্ব উন্নত সংস্কৃতিবোধ তত নামছে।
শিশুদেরকে মানবজাতীর বড় অর্জনগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্তমানের আবর্জনার স্তুপে নিক্ষেপ করা হয়েছে। খেলার মাঠ নেই, বেড়াবার জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে বাবা-মা এখন সন্তানদের ড্রয়িং রুমে আটকে রাখে। খেলাধুলা, শরীরচর্চা, প্রকৃত জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ নাই বললেই চলে। ক্লাসরুমে হাজিরা, কোচিং, ডিগ্রি, বিত্তের লোভে দৌড়, মিথ্যা মর্যাদার অহমিকা, ইন্টারনেটমোহ, হতাশা, মাদক-পর্নো, অন্যায়ের সামনে নত থাকা ইত্যাদি সব মিলিয়ে উন্নয়ন ঢাকের বাদ্যে সব চাপা পড়ে যাচ্ছে। খেলাধুলার মাধ্যমে শুধু শরীরই সুস্থ থাকে না, মানুষের মধ্যে শিল্প-সৌন্দর্যবোধেরও জন্ম হয়। একদিকে উল্টো পরিস্থিতিকে মোকাবেলার ও সুস্থ পরিবেশ রচনায় আমরা দলের মধ্যে লড়াইটা করি। আমাদের সাধ্য সে রকম নাই; শিশুদের বিকাশের জন্য আমরা কোন ইনস্টিটিউট এখনও করতে পারিনি। মাও সেতুং বলেছেন, ‘আমরা যখন বন্দুকের মুখোমুখি হই, তখন মনে হয় বুর্জোয়ারা শুধু বন্দুক দিয়ে আক্রমণ করে, এটা ঠিক, শেষ পর্যন্ত জনতার শক্তিকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য, তারা বন্দুকের শক্তি প্রয়োগ করে; কিন্তু শুধু বন্দুকের শক্তি দিয়ে তারা ক্ষমতায় থাকে না। তারা বহুবিধ আক্রমণ পরিচালনা করে, তাই তারা যত দিক থেকে আক্রমণ পরিচালনা করে আমরা যদি তত দিক থেকে মোকাবেলা করতে না পারি, তা হলে শেষ বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে না।’
আজকে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল, ছাত্রশিবির যারা করে, ওই সব কোমলমতি কিশোর-তরুণদের এই সংগঠনগুলো বিপথগামী করতে সক্ষম হয়েছে। ওদের মধ্যে যদি বিজ্ঞানমনষ্কতা থাকতো, জ্ঞান অর্জনের মনোভাব থাকতো, এদের মধ্যে যদি শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা ও কর্মকাণ্ডে অংগ্রহণ থাকতো, ন্যায়-অন্যায় মাপার যুক্তিবাদ কাজ করতো, তা হলে এদের এতটা বিপথগামী করতে পারতো না। সমাজে এক দিকে সভ্যতা ধংস করার একটা প্রক্রিয়া আছে অন্যদিকে আমরা একে রক্ষা করার ও এগিয়ে নেয়ার লড়াই করছি। আমাদের কমরেডদের এইভাবে ভাবতে হবে। যেদিন এই পার্টির যাত্রা শুরু হয়েছে, সে দিনই আমরা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি। এই জন্য আমাদের সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা লাগবে; তাদের চিন্তার সাথে হয়তো সব বিষয়ে আমরা হুবহু একমত হতে না-ও পারি; মতান্ধতা এড়িয়ে মতপার্থক্য নিয়ে চলতে চলতেই মতৈক্যের ক্ষেত্র রচিত হবে। তাদের জ্ঞান-অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের যে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান তাকে আমরা কাজে লাগতে পারবো। এক সঙ্গে মিলে অনেকদূর আমরা চলতে পারবো। চিন্তার যে ভ্রান্তি আছে, যদি তিনি মানুষের উন্নতি, সমাজের প্রগতি চান, যদি তিনি শোষণ-বঞ্চনার অবসান চান, তা হলে বিরাট অংশের মানুষ এই আন্দোলনে শামিল হবে।
এখানে যারা এসেছেন, তারা অনেকে আমাদের দল করেন না, আমাদের আদর্শ ধারণ করেন না কিন্তু তারা মনে করেন, দেশ যেভাবে চলছে এইভাবে চলতে দেয়া উচিত না। তাঁরা মনে করেন, বাসদ একটা আদর্শকে সামনে রেখে, বিভ্রান্ত না হয়ে, আপোষ না করে; লড়াই করতে পারবে। আমাদের ওপর এই আস্থা স্থাপন করতে পারা আমাদের সংগ্রামের একটা অর্জন।
এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী? আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ছাড়া দুঃসাধ্য। কারণ তারা উন্নয়নের নামে দুর্নীতি-লুটপাট করে, রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়ীত করে-দুর্বৃত্তের হাতে রাজনীতিকে নিয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করেছে। এখন ক্ষমতায় থাকতে হবে। কারণ তারা যে জায়গায় আছে-যদি নির্বাচন দেয়, তা হলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই কৌশল হলো-ভুয়া নির্বাচনকে চাতুর্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করে, জনগণের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করবে। তারা ভাবাদর্শের জায়গায় মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আক্রমণ করে, দমন করে, নির্যাতন-নিপীড়ন করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদী রূপ দিনে দিনে আরও প্রকটভাবে হাজির হবে। ক্ষমতা প্রত্যাশী বিএনপি শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে শক্তি হারিয়েছে, রাজনৈতিক কৌশলে মার খেয়েছে। উপায়হীন না হওয়া পর্যন্ত মানুষ এদের ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারছে না। সেখান থেকেই মানুষের বিকল্প চাওয়া তৈরি হয়েছে। মানুষ ভিতরে ভিতরে ক্ষোভে ফুসছে। তার প্রতিক্রিয়ায় সমাজে একটা গৃহযুদ্ধ তৈরি হওয়ার পরিবেশের সম্ভাবনা আছে। তাহলে বুর্জোয়া শ্রেণির এই ব্যবস্থা রক্ষার শেষ হাতিয়ার, সামরিক বাহিনীকে আসতে হবে-সরাসরি কিংবা অপরাপর শক্তি সংযোগে। আতীতে এমন হয়েছে-অসামরিক বুর্জোয়ারা যখন ব্যর্থ হয়, তখন সামরিক শক্তি এসে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনে, তাকে রক্ষা করে আবার নতুন যাত্রা শুরু হয়। এই রকম একটা অবস্থা সামনে আসতে পারে। এই অবস্থায় যদি ভারসাম্য আনতে হয়, পরিবর্তন আনতে হয় তাহলে বাম এবং উদারনৈতিক-গণতান্ত্রিক শক্তির একটা বিকল্প তৈরি করতে হবে। বামদের প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে-এর মধ্যে আমাদের দলকে একটা ভূমিকা নিতে হবে। যে যেখানে আছেন, আমরা যদি এক মানুষের মতো দাঁড়িয়ে যাই, অগ্রসর হতে থাকি তাহলে দিনে দিনে আরও বহু মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়বে। আমরা আবারও চেষ্টা করবো বামপন্থী শক্তিগুলোকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। উদারনৈতিক শক্তি বললে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, তার সাথে সারা দেশে আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ শিক্ষক-সাংবাদিক যারা সরাসরি সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে নেই অথবা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেই, যারা এই দুঃসহ অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেন না, মেনে নিতে পারছেন না; কিন্তু পরিবর্তন চান, সে ধরনের মানুষজনকে এক কাতারবন্দি করতে হবে।
আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কীভাবে বিকৃত করা হচ্ছে? সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র ধর্মের সাথে মিলিয়ে জগাখিচুড়ি পাকানো হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের পরামর্শ অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু এবং সেক্যুলার লেখকদের লেখা বাদ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ‘স্ট্যাচু অব জাস্টিস’ সরানোর দাবি জানাচ্ছে। এরা ভাস্কর্য এবং মূর্তির পার্থক্য বুঝে না। আজকে বলবে ‘স্ট্যাচু অব জাস্টিস’ সরাও কালকে বলবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাধীনতার ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ সরাও-এগুলো একটার পর একটা আসতে থাকবে। এরা ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, গণতান্ত্রিক চেতনাকে আঘাত করছে, ভূ-লুণ্ঠিত করছে। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য মানুষ পথ খুঁজছে। ইতিহাসে এইরূপ ক্ষণে যারা সাড়া দিতে পেরেছে তারা এগিয়ে গেছে, যারা সাড়া দিতে পারেনা, তারা পিছিয়ে পড়ে।
আমাদেরকে দলের অভ্যন্তরে সংগ্রাম করতে হয়েছে-কখনও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে, কখনও ব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে, কখনও গোঁড়ামিবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক দুর্বলতার পরও আমরা এই সংগ্রামে জনগণের, রাজনৈতিক মহলের, প্রগতিশীল চিন্তার মানুষের সমর্থন সহযোগিতা পেয়েছি; দল বিকশিত হয়েছে, সামনে এগুচ্ছে। আজকে এই দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে আমাদের ওপর এসে পড়েছে। অন্যদিকে পারিবারে শিশুরা যাতে মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠতে পারে, সেই সংগ্রাম আমাদের করতে হবে। পরিবারগুলো পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদসৃষ্ট অর্থনৈতিক-ভাবগত অনেক সংকটে পড়ছে; তার বিরুদ্ধে একটা অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে মানুষ হওয়ার রাস্তা করে দিতে হবে। তাদের শোনার কানটা যেন সুরময় হয়, দেখার দৃষ্টিটা নান্দনিক হয়, মনটা সমাজমুখী হয়, ভাবনার জগৎটা সমৃদ্ধ হয়-যাতে তারা প্রাণী মানুষ থেকে সত্যিকার মানুষ হয়ে উঠতে পারে। তারা যাতে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার উন্মাদনায় নয়, জ্ঞানে-প্রজ্ঞায়, ইতিহাস-সাহিত্য-বিজ্ঞান, দর্শন, পরিবেশ, সংস্কৃতি বুঝার মনন নিয়ে বেড়ে উঠে। এখানে শিশুদের আমরা পরিবেশ দিতে পারিনি কিন্তু পরিবারের উদ্যোগে যতটুকু শিক্ষা তারা পেয়েছে এবং এখানে যতটুকু পরিবেশন করেছে, সেটা আমাদের মঝে আশার সঞ্চার করে। দলের সাথে পরিবারগুলোকে যুক্ত করে শ্রেণিপরিবার গড়ে তুলে এক মানুষ হয়ে সংগ্রাম পরিচালনা করে বুর্জোয়া শাসক-শোষক দুর্বৃত্ত লুটেরাদের কবর রচনা করুন। সেই সংগ্রামের আহ্বান জানিয়ে আজকের কর্মসূচি এখানে শেষ করছি। জয় সমাজতন্ত্র।