বাসদ-এর সপ্তদশ মিলন মেলা অনুষ্ঠিত-আত্মকেন্দ্রীক স্বার্থের বিচ্ছিন্নতা নয়, যৌথ মানবিক মিলনক্ষেত্র তৈরি করুন

বাসদ-এর সপ্তদশ মিলন মেলা অনুষ্ঠিত
আত্মকেন্দ্রীক স্বার্থের বিচ্ছিন্নতা নয়, যৌথ মানবিক মিলনক্ষেত্র তৈরি করুন
লুটপাটতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে মুক্তির চেতনায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলুন
Khalequzzmanবাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর উদ্যোগে আজ ১৬ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দিনব্যাপী সমর্থক-শুভনুধ্যায়ীদের সপ্তদশ বার্ষিক মিলন মেলা গুলিস্তানস্থ মহানগর নাট্যমঞ্চের কাজী বশির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামানের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ এর পরিচালনায় মিলন মেলার আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কমরেড সাইফুল হক, অধ্যাপক আবিদুর রেজা, অধ্যাপক অজিত কুমার রায়, মাহমুদুর রহমান মান্না, মেজর (অব:) আব্দুল মান্নান, আব্দুল মালেক রতন, এড. সুব্রত চৌধুরী, সাংবাদিক শফিকুর রহমান, রফিউর রাব্বি, অধ্যাপক জীবন পোদ্দার, প্রকৌ. এনায়েতুল্লাহ কাসেম, নূরুল আরশাদ চৌধুরী আশু, এড. আক্তার কবীর চৌধুরী, নাজির মো. খসরু, নাট্যকার শহিদুজ্জামান সেলিম, অধ্যাপক রেজা ই করিম খন্দকার, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, এড. মোস্তফা আমিন, সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার। আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, দ্রিক গ্যালারীর শহিদুল ইসলাম, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, ডা. মোস্তাক হোসেন, অধ্যাপক এ.এন. রাশেদা, নাঈমুর রহমান জুয়েল, আব্দুল ওয়াহেদ, সুলতান মো. মনসুর আহম্মেদ, বহ্নি শিখা জামালী, অধ্যাপক অদিতি হক, অধ্যাপক ডা. মোসাদ্দেক হোসেন মিনু, সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান মাসুম, হালিম আজাদ, ইমরান এইচ সরকার, ডা. মঈন, জনাব রাশেদুল হাসান, আওলাদ হোসেনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
মিলন মেলার সূচনা বক্তব্যে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতাত্তোর ৪৭ বছরের বাংলাদেশ পুঁজিবাদী শোষণ শাসনে জর্জরিত দুঃস্বপ্নের কবলে পতিত বাংলাদেশ। কবির ভাষায় এক উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ। এখানে উন্নয়নের স্টীম রোলারের নীচে পিষ্ট হচ্ছে মনুষ্যত্ব, মানবতা, সাম্যচেতনাসহ মুক্তিযুদ্ধের বহু বিরল অর্জন। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি, বেপরোয়া আর্থিক লুণ্ঠন, শিক্ষাব্যবস্থার বিকৃতি সাধন ও নিম্নগামিতা, ভেজাল বিষাক্ত খাবারে সয়লাব বাজার, কৃত্রিম সংকটে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উঠানামা, বিরুদ্ধ মত দমনে রাষ্ট্রশক্তির যথেচ্ছব্যবহার, রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রত্যক্ষ পরোপক্ষভাবে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্ত করে ফেলা, রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়িত করে লুটেরা দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা কতৃত্ব তুলে দেয়া, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, যত দরিদ্র তত অধিকার বঞ্চিত দশা, নারী-শিশু নির্যাতনের খবরে-ছবিতে সীমাহীন বেদনা ভারাক্রান্ত দশা, গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়ে যখন শুধু ভোটতন্ত্রে দ-ায়মান, সেই ভোট করার যোগ্যতাও শাককশ্রেণির না থাকা, একথায় সভ্যতার অর্জন মুক্তিযুদ্ধের অর্জন একে একে বিসর্জন দিতে দিতে বর্বরতার রণক্ষেত্রে লুটপাটতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র আর স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি বলয়ের জয় পরাজয়ের উন্মত্ত খেলা চলছে। ক্ষমতার মালিক জনগণকে ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। আপাতত: প্রতিবাদ-প্রতিরোধের দেয়ালগুলো ভাঙা-বিধ্বস্ত মনে হলেও এটাই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই বহন করে। ধ্বংস্তুপের জঞ্জাল সরিয়ে বারা বার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এই জাতি। আছে শুধু সময়ের ব্যবধান।
সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়াজুড়েই আজ সভ্যতার সংকট চরমে। ফরাসী বিপ্লবে উচিয়ে ধরা ঝাণ্ডার শ্লোগান সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার মর্মবাণীকে বুর্জোয়া শ্রেণি বিসর্জন দিয়েছে। আমিরকায় খ্রিস্টানত্ববাদ, ভারতে হিন্দুত্ববাদ, ইসরাইলে ইহুদিত্ববাদ, আরব ভূখ-ে মুসলিম রাজতান্ত্রিক জঙ্গীবাদ-মৌলবাদ, মিয়ানমারে বৌদ্ধত্ববাদ, ইউরোপ-আফ্রিকাসহ নানা প্রান্তে বর্ণবাদ ইত্যাদি ইহজাগতিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের টুটি চিপে ধরেছে। সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র হটিয়ে কায়েম হয়েছে ফ্যসিবাদ। বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের মাঝেও উঁকি দিয়েছে নানা বিচ্যুতি। এগুলোকেও শোষক বুর্জোয়াশ্রেণি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে এবং শান দিয়ে চলেছে শোষিত শ্রেণিকে বিভক্ত-বিভ্রান্ত করে গণআন্দোলনের শক্তিকে স্তিমিত ও দুর্বল করার কাজে। রোগ যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর সংখ্যা যতই ভাড়ুক তাতে চিকিৎসা বিজ্ঞান পরিতাজ্য হতে পারে না, বরং আরও গবেষণা, আরও যথার্থ চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন দাবি করে।
Audience-1আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ, দুজনেই সীমানাজুড়ে কাঁটাতারের বেড়ার খাঁচায় আমাদের বন্দী করে চলেছে। একজন পানির প্রবাহ আটকায় আরেকজন চরম নির্যাতনের শিকার লাখ লাখ উদ্বাস্তু জনসংখ্যা ঠেলে দেয়। আর আমরা যা যতটুকু পেয়েছি তা নাকের বদলা নরুন পাওয়া কিংবা গরু মেরে জুতা দানের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তারপরও শাসকদের কূটনৈতিক সাফল্য, আন্তর্জাতিক খ্যাতিলাভের গুণকীর্তনের থামাথামি নেই। প্রবাসী শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক ও কৃষক এই তিন স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো বাংলার ঘরে রক্ত পানি করে ওরা সম্পদ জড়ো করে আর পরগাছা শাসক দলের আশীর্বাদপুষ্ঠ লুটেরারা চুরি করে তা বিদেশে পাচার করে। তারপরও এদের দেশপ্রেমের ঘাটতি যে হয়না তা স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস আসলে বুঝতে অসুবিধা হয় না।
রাজনৈতিক দলকে সমাজবৃক্ষ বলা যায়। সমাজদেহ থেকে শিকড়ের মাধ্যমে জীবনীশক্তি লাভ করে যেমন মহীরূহে পরিণত হয় আবার ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে তা সমাজকে ফিরিয়ে দেয়। আজ চারিদিকে ভাঙনদশা। ঘর ভাঙছে, পরিবার ভাঙছে, সমাজের জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, মাদক ব্যবসা রমরমা হচ্ছে আর ৮০ লক্ষাধিক কিশোর-তরুণ-যুবকের জীবন যৌবন স্বপ্ন খান খান হয়ে যাচ্ছে। এক ঐশী বাবা-মাকে মেরেছে, লক্ষ লক্ষ ঐশীরা নিত্যদিন মনুষ্যত্ব মূল্যবোধ হত্যা করে চলেছে আত্মঘাতি বিষক্রিয়ায় দেহে মনে ধ্বস প্রাপ্ত হচ্ছে। ভোগবাদী স্বার্থপরতা নীতি আদর্শ বলী দিয়ে চলেছে। ৩ বছরের শিশু যখন ধর্ষিত হয়, পর্ণোগ্রাফী যখন বিনোদনের উপকরণ হয়, দুর্নীতি যখন উপরে উঠার সিড়ি হয়, জ্ঞান যুক্তি যখন পেশী প্রতাপের কাছে পরাস্ত হয়, তখন সংস্কৃতি পায়ে পেশা ফুলের চেহারা লাভ করে। তখন তা যেমন সৌন্দর্য্য বিকিরণ করেনা, সুঘ্রাণও আনেনা আর একে নিয়ে কাব্য করাও চলেনা। শিশুদের আগামী প্রজন্মকে আমরা সেই দশায় নিয়ে গেছি। এই বিচ্ছিন্নতা, এই ভোগবাদী উন্মাদনা, এই নীতিহীন আদর্শবর্জিত রাজনীতি-অর্থনীতি, সংস্কৃতি, এই অনাচার স্বেচ্ছাচার চলতে দেয়া আত্মহত্যার সামিল। এর মোড় ঘুরাতে হবে। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনীতির মাধ্যমেই করতে হবে। যারা সমস্যার ¯্রষ্ঠা এবং সমাধানে ব্যর্থ তাদের দিয়ে হবে না। এর বাইরে সকল বাম-গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দল, শক্তি, ব্যক্তিবর্গ যার যার অবস্থান রক্ষা করেও এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে দাঁড়াতে হবে। বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সোপান তৈরি করতে হবে। এটাই সময়ের দাবি। এর জন্য যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান মনষ্কতা দরকার। চিন্তার ও আদর্শের শক্তিতে পেশী ও টাকার শক্তিকে পরাস্ত করা দরকার। তাহলে বুঝতে হবে দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের চেয়ে মাওলানা শফিদের স্থান উপরে রেখে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান মনষ্কতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। যৌথতার বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে সামাজিক শক্তি নির্মাণ করা যাবেনা। শিশুদের অযত্ন-অবহেলায় রেখে দিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা সম্ভব হবে না। যে শিশুরা বাবা-মা নিকট আত্মীয়দের বাইরে মমতাহীন জগতে শুধু আতঙ্কের মূর্তিছাড়া কিছু দেখেনা তারা এখানে এসে একটি দিনের জন্য হলেও বহু মানুষের মানবিক চেহারা দেখে, স্নেহ মমতার পরশ লাভ করে। ভ্রষ্ঠ পথের নষ্ট মানুষ দিয়ে দেশ ভর্তি নয়, সত্যিকার মানুষেরাও যে আছে বিশেষ করে যে সকল বুদ্ধিজীবী সুশীলরা ব্যক্তি স্বার্থে নতজানু হয়ে শাসকগোষ্ঠীর কাছে সমর্পিত হয় যাদের দেখলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গাধা বলে মনে হয় তার বাইরে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চোখে চোখ রেখে কথা বলার দৃঢ় চেতা মানুষ যে রয়েছে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্বদের আমরা এখানে আমন্ত্রিত করে আনি যাতে নব প্রজন্ম ভরসা পায় যে সব শেষ হয়ে যায়নি, গৌরব করা জাতি নিঃস হয়ে যায়নি। আমরা যেমন আয়োজন করলে মিলনমেলাকে আরো প্রাণবন্ত, শিশুদের বিচরণের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত ও সকলের মতামত পরামর্শ সমালোচনায় আরও সমৃদ্ধ হতে পারতাম তা এখনও করে উঠতে পারিনি। আমাদের নিজস্ব পার্টি অফিস ক্রয়ের চেষ্টাও চলমান। আশা করি সকল দুর্বলতা ও ঘাটতি আপনাদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে আমরা কাটিয়ে উঠবো। প্রচলিত ধারনা ও বিদ্যমান হতাশা কাটিয়ে আলোর সন্ধান পাবো। আপনাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি আমাদের উৎসাহিত ও সমৃদ্ধ করবে। আমরা এগিয়ে যাবো এই প্রত্যাশায় সকলকে আবারও আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করছি।
Audience-2অন্যান্য বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের মিলনমেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করে বলেন, এটা এমন অনুষ্ঠান যেখানে সকল বাম-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, শক্তি, ব্যক্তি একসাথে সমবেত হতে পেরেছে। এই মিলন মেলা থেকে শিক্ষা নিয়ে জোট-মহাজোটের দ্বি-দলীয় বুর্জোয়া অধপতিত রাজনীতির বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়নে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
বক্তাগণ আশা প্রকাশ করেন বাসদ অতীতেও দেশের দুঃসময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আজও দেশের সর্বগ্রাসী সংকটকালে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সবশেষে কমরেড খালেকুজ্জামান সকলের বক্তব্য সারসংকলন করে মিলন মেলার উদ্দেশ্য, অর্জন, শিক্ষা ব্যাখ্যা করে বক্তব্য রাখেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ করে বক্তব্য দেন।
মিলন মেলার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিভিন্ন শাখা বরিশাল, ঢাকা, না.গঞ্জ, দনিয়া শাখা সংগীত পরিবেশন করেন এবং সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী পরিবারের সন্তান সন্ততিরা একক সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন, ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলাও প্রদর্শিত হয়।
শিশু কিশোরদের নানা প্রতিযোগিতা ও পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। শেষে আন্তর্জাতিক সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।