বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নয়, কমাতে হবে

Poster-Hartal 30 Nov-17সরকার আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই লক্ষ্যে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ’১৭ থেকে গণশুনানি শুরু হয়। এর মধ্যদিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রস্তাব করেছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দাম ৭২ পয়সা বাড়ানো হোক। গণশুনানিতে বাসদ-সিপিবিসহ বামপন্থি রাজনৈতিক দলসমূহ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন-
ক. বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
খ. বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং সরকার কি লোকসান করছে?
গ. লোকসানের কারণ কী জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, না-সরকারের ভুলনীতি ও প্রশাসনের দুর্নীতি?
ঘ. সরকারের ভুলনীতির খেসারত সাধারণ ভোক্তাগণ কেন দেবে?
ঙ. বর্তমান ব্যবস্থাতেও দাম না-বাড়িয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার উপায় কী খুঁজে দেখা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের কোন যথাযথ উত্তর তারা দিতে পারেনি। কারণ এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বা জনগণের স্বার্থে চিন্তা করার প্রতিষ্ঠান হিসেবে তো বিইআরসিকে গড়ে তোলা হয়নি। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা, দেশি বিদেশি গ্যাস কোম্পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের আইনি বৈধতা দেয়া, সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণশুনানি অনুষ্ঠানসহ বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর তাদের প্রতিবাদ সভায় ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, সরকার বিদ্যুতের দাম যা বাড়াতে চায়, তার চেয়ে বেশি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব; দুর্নীতি, অপচয় বন্ধ করলে, হিসাবের গোঁজামিল সঠিক করলে, পরিকল্পনা ব্যবসায়ীমুখী না করে জনগণমুখী করলে। বিদ্যুৎ এমন একটি পরিষেবা যা জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষত, শহুরে মধ্যবিত্তদের জীবন বিদ্যুৎ ছাড়া কল্পনা করা যায় না। বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতাই বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, যা দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জিম্মি করা যায়।
জনগণের ট্যাক্সে টাকায় গড়ে তোলা হয় বিদ্যুতের অবকাঠামো, দেয়া হয় ভর্তুকি। আবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছ থেকেই বাড়তি টাকা আদায় করা হয়। এবার দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বলা হলো, পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৪.৯০ টাকা থাকায় নাকি প্রতি ইউনিটে ৭২ পয়সা করে ঘাটতি হচ্ছে। হিসাব করে দেখানো হলো, বিভিন্নভাবে সরকার এর চাইতে বেশি টাকা জনগণের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে আদায় করছে, সেটা যদি সমন্বয় করে-তাহলেই দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না, বরং দাম কমানো সম্ভব।
একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে-
১. বিদ্যুৎ রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন তহবিলের জন্য বিদ্যুৎ বিলের সাথে ৫.১৭% অর্থৎ ২৬ পয়সা আদায় করা হয়।
২. ১৩১ কেভি ভোল্টেজ লাইনে বিদ্যুৎ বিতরণে ইউনিট প্রতি ৮ পয়সা উদ্বৃত্ত হয়।
৩. পাওয়ার ফ্যাক্টর জরিমানা আদায় করে ৪ পয়সা।
৪. সরকার বলছে, বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া হয়। ভর্তুকির টাকা আসে জনগণের পকেট থেকে, এখন আবার হিসেব দেখাচ্ছে ভর্তুকির সুদ বাবদ ২১ পয়সা ব্যয় হয়। তাতে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। ভর্তুকির টাকার সুদ! এ এক অবিশ্বাস্য হিসাব।
৫. বিইআরসি নির্ধারিত বাল্ক বিদ্যুতের বিদ্যমান দাম ৪.৯০ টাকা কিন্তু হিসেবে দেখা যায় মূল্যহার ৪.৮৫ টাকা। প্রতি ইউনিটে ৫ পয়সা কম, এ পয়সা কোথায় যায়?
৬. মেঘনা ঘাট আইপিপি’র প্লান্টের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করার কথা কিন্তু দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে ডিজেল ব্যবহারের হিসেব দেখানো হচ্ছে। এতে প্রতি ইউনিটে ১৪ পয়সা বেশি খরচ হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল ব্যবহার না-করে খরচ বাড়ানো হচ্ছে এর দায় জনগণ কেন নেবে? (ডিজেল ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় ২০.২৪ টাকা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার খরচ ৭.৩৮ টাকা)।
তাহলে হিসাব কেমন দাঁড়ালো (২৬+৮+৪+২১+৫+১৪) = ৭৮ পয়সা?
সরকারের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব ৭২ পয়সা। এই ৭৮ পয়সা সমন্বয় করতে ৭২ পয়সা তো বাড়াতে হবেই না, বরং ৬ পয়সা করে উদ্বৃত্ত বা ৩২১ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে।
দেশে প্রধানত, গ্যাস-ফার্নেস অয়েল, ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভুলনীতি ও দুর্নীতির ফলে দাম বাড়ানো হচ্ছে এবং খেসারত দিচ্ছে জনগণ।
কীভাবে বিদ্যুতের দাম কমানো যেত, যেমন :
অধিক ব্যয়বহুল গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসা বিদ্যুতের মূল্যহার ইউনিট প্রতি ৩.৩৭ টাকা। অথচ একই জ্বালানি (গ্যাস) সরকারি উৎপাদন কেন্দ্রে পোড়ালে প্রতি ইউনিট ৮৬ পয়সায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। ফলে, সাশ্রয় হত এক হাজার ৩০১ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
মেঘনাঘাট আইপিপিতে গ্যাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে ব্যয় সাশ্রয় হতো এক হাজার ৩৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম দরপতন সমতাভিত্তিক সমন্বয় করা হলে ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুই হাজার ১১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৬০ কোট ৯৬ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো।
ডিজেলভিত্তিক ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে কম খরচের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখলে সরকারি ও রেন্টাল-কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় সাশ্রয় হতো ৭৫২ কোটি টাকা।
এই বিষয়গুলো মেনে চললে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমপক্ষে সাত হাজার ৮৪৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো। ফলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পেত ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫৬ পয়সা। তখন পাইকারি বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানো তো দরকারই হবে না বরং বর্তমান দাম ৪.৯০ টাকার পরিবর্তে ৩.৩৪ টাকায় বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে ।
কিন্তু এই সব হিসাব বা যুক্তি কি সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? হবে না। কারণ, বিদ্যুৎ নিয়ে দেশি বিদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত সরকার। জনগণের প্রতি দায় পালন করার চাইতে ব্যবসায়ীদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সরকার উদগ্রীব। তাই জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির অশুভ চক্রান্তের বিরুদ্ধে বামপন্থিদের সাথে মিলে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। উল্লেখ্য সিপিবি-বাসদ এর পক্ষ থেকে বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে বিইআরসি’র কাছে গণশুনানির আবেদন করা হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে গত ৫ অক্টোবর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেই গণশুনানিতে কীভাবে দাম কমানো সম্ভব আমরা তার তথ্য, যুক্তি হাজির করি।

ভ‌্যানগার্ড নভেম্বর ২০১৭ সংখ‌্যা থেকে