বৈজ্ঞনিক যুক্তি ও বিশ্লেষণ মানলে রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করতে হবে

dsc_4336-copyবিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞ মতামত
১৭ অক্টোবর ২০১৬ বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের আয়োজনে সকাল ১০.৩০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুন্দরবনের উপর রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব ‘বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ মতামত’-শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন এর সভাপতিত্বে সভায় আলোচনা করেন বাসদ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবুল বাশার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজ, পানি বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি.ডি রহমতুল্লাহ্, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল মতিন, বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের উপদেষ্টা রাজেকুজ্জামান রতন। আলোচকবৃন্দ প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ ও পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে বাঁচাতে চাইলে এই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন- ‘দখলে ও দুষণে সুন্দরবন ক্রমাগত ধ্বংসের মুখে। রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এ ধ্বংস আরও ত্বারান্বিত করবে। সরকার ক্রমাগত বলছে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না কিন্তু চোখের সামনে বুড়িগঙ্গার দুষণ যারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তাদের আশ্বাসে জনগণ আস্থা অর্জন করতে পারছে না।’
press-copyঅধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন- ‘ উন্নয়নের নামে লুন্ঠণের উম্মাদনা চলছে। সরকার সুন্দরবনের স্বার্থ না দেখে কোম্পানির স্বার্থ দেখছে। রামপাল কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে লাভবান হবে ভারতের এনটিপিসি, ভেল, এক্সিম ব্যাংক কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের সুন্দরবন। সরকার কোন ধরনের যুক্তিই শুনতে চাইছেনা। আজ সুন্দরবন রক্ষায় বিজ্ঞানী প্রকৃতি বিশেষজ্ঞসহ সকলে একমত পোষণ করছেন যে, অর্থনৈতিক-প্রাকৃতিক এবং জনগণের ভবিষ্যতের স্বার্থে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করা উচিত। তিনি আরও বলেন, সরকার এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ কাজে লাগাতে পারে।’
উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড.আব্দুল আজিজ বলেন, ‘সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম খুবই সংবেদনশীল। তাই এর পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র কখনই গ্রহণযোগ্য হবেনা। তিনি বলেন, সুন্দরবন থেকে ১৬০ কিমি দূরত্বে বুড়িছড়া নদীর পাশে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র করলে সুন্দরবন বাঁচবে পরিবহন খরচও কমবে।
প্রাণি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আবুল বাশার বলেন, ‘আমাদের সুন্দরবনে একটি বিশেষ বাস্তুসংস্থান বিদ্যমান, যেটি পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। এই ব্যবস্থা ক্ষতি হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপকুলীয় মানুষ। তিনি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র না করে এই বিশেষ বনকে রক্ষা করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।’
পানি বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মিঠা পানির প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে, আর এই মিঠা পানি ছাড়া সুন্দরবন বেঁচে থাকতে পারেনা। এই পানি প্রবাহ সচল রাখতেই তিনি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের পক্ষে যুক্তি দেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি.ডি রহমতুল্লাহ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীন সব দেশই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে আমাদের দেশে ধ্বংসসাধনকারী এই প্রকল্প চালু করছে। তাই তিনি সবাইকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য আহ্বান জানান।’ তিনি বলেন, সৌর শক্তি ও জৈব বর্জ্য ব্যবহার করলে কমপক্ষে ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আব্দুল মতিন বলেন, ‘পরিবেশ ধ্বংস হলে সুন্দরবন বাঁচবে না। কয়লা দুষণে পানি ও বাতাস যেভাবে দূষিত হবে সুন্দরবন মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে পরাজিত হয়ে সরকার দমন পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। দেশের ভবি‌ষ‌্যৎ স্বার্থে তিনি রামপাল প্রকল্প বাতিলের আহ্বান জানান।
বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ উপদেষ্টা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘রামসার সাইট ঘোষিত এই সুন্দরবন বিরল প্রজাতির মাছ, বৃক্ষ ও প্রাণীর বসবাস। প্রায় ৫ লক্ষ কর্মজীবি মানুষ এই বনের উপর নির্ভরশীল। তাই এ বন রক্ষা করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর আমেরিকান কোম্পানির কাছে ইজারার প্রতিবাদে দেশের মানুষ আন্দোলন করে সেটি ঠেকাতে পেরেছিল। বিবিয়ানার সাঙ্গুর গ্যাসক্ষেত্র রক্ষা করা হয়েছে। ঠিক তেমনি ভাবে সকল পেশার মানুষ এই বন ধ্বংসের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে।’