ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে লুটপাট বন্ধ না হলে অর্থমন্ত্রণালয় ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে লুটপাট বন্ধ না হলে অর্থমন্ত্রণালয় ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা ঋণখেলাপি-ব্যাংক ডাকাতদের গ্রেপ্তার-বিচার ও তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচির সমাবেশ নেতৃবৃন্দ

LDA-26022020-5২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে জোটের সমন্বয়ক বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমন্বয়কের বক্তব্যের পরই একটি বিক্ষোভ মিছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমুখে যাত্রা করলে দৈনিক বাংলার মোড়ে পুলিশ কাঁটাতারের বেরিকেড দিয়ে মিছিলে বাধা দিলে সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মো. শাহ আলম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কবাদীর) কেন্দ্রীয় নেতা মানস নন্দী ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা কমরেড হামিদুল হক। সমাবেশ শেষ সমম্বয়ক কমরেড বলজুর রশীদ ফিরোজের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন। LDA-26022020-1বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক, আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও নৈরাজ্য চলছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এত বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই তার পরও জনগণের আমানতের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য সরকার নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিচ্ছে। দেউলিয়া ফার্মার্স ব্যাংকের কলঙ্ক ঢাকতে নতুন নাম করেছে পদ্মা ব্যাংক। তিনি বলেন অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম হিসেব করে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ খেলাপির যে তালিকা দিয়েছে তা চাতুর্যপূর্ণ বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। সরকার ঋণ খেলাপি ব্যাংক ডাকাতদের ভিআইপি, সিআইপি মর্যাদা দিয়ে পুরষ্কৃত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ব্যাংক খোলার অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের চাপে ব্যর্থ হয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষমতার জোরে নামে বেনামে ব্যাংক খুলছে যেমন, আইন মন্ত্রী তার মায়ের নামে ব্যাংক খুলেছে। অর্থমন্ত্রী নিজে স্বীকার করেছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত ভালো না। আথচ এর আগে তিনি আর্থিক খাতের উন্নতির কথা বলে উল্টো বক্তব্য দিতেন। তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের নেতাদের সিন্ধুকে ২৬ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। এ টাকা কোথা থেকে আসলো? পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে অথচ তার পৃষ্ঠপোষক রাঘব বোয়ালদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? এ সরকার জনগণের ভোটে যেহেতু ক্ষমতায় আসেনি সেজন্য জনগণের প্রতি কোন দায় নেই। আজ ভোট ডাকাত ও ব্যাংক ডাকাত এক হয়েছে। ফলে এই সরকারের পক্ষে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা বা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে, ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ করতে হলে বর্তমান ভোট ডাকাতের আওয়ামী সরকারকে উৎখাত করতে হবে। সেই আন্দোলনে তিনি সকল বাম গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানান। কমরেড মো. শাহ আলম বলেন, দেশে লুটপাটের অর্থনীতির বিরুদ্ধে বাম জোট আন্দোলনে নেমেছে। লুটপাটের অর্থনীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি এক মোহনায় এসে মিলেছে। দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে আনার জন্য সরকারের কোন পদক্ষেপ নেই। ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কার্যকর কোন উদ্যোগ দেশবাসী দেখছে না। এর বিরুদ্ধে একটা সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জুনায়েদ সাকী বলেন, পুলিশ আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সরকার প্রতিদিন আমাদের উন্নয়নের গল্প শোনাচ্ছে অথচ প্রতিদিন দেশের ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। রি-সিডিউলের নামে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো হয়। ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নয় এর পরিমাণ হবে ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকরা ২ লাখ কোটি টাকার মতো ঋণ নিয়েছে। চোরে চোরে খালাতো ভাই এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মেরে দিচ্ছে। এই সব লুটপাটকারী সরকারের সহযোগিতায় একাজ করছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে। লুটপাটের টাকা জোগান দেয়ার জন্য জনগণের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। সরকার আর্থিক খাতে হরিলুটের ব্যবস্থা চালু করেছে। সরকার পুলিশ-আমলার সহযোগিতায় দেশ চালাচ্ছে। তাই এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সাইফুল হক বলেন, সরকার মিছিল-সামবেশ, স্মারকলিপি পেশের মতো কর্মসূচিকেও ভয় পাচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো লালবাতি জ¦ালিয়েছে। আব্দুল হাই বাচ্চুকে গ্রেফতার করতে পারছে না। সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছে এদের হাত এত লম্বা যে, এদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ যে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতো তার সুদ কমিয়ে দিয়েছে। চুনোপুটিদের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করা হচ্ছে আর রাঘব-বোয়ালরা টাকা কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে, সরকার এদের পাহারা দিচ্ছে। পাপিয়ার মতো মাফিয়ারা পুরো দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের হাতে দেশ এখন জিম্মি। অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আজ পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হচ্ছে কিন্তু কার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে পাপিয়ারা সৃষ্টি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কি সেটা জানেন না? দেশবাসী সেই আশ্রয়দাতা গডফাদারদেরও বিচার চায়। মানস নন্দী বলেন, সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে সে টাকা লুটপাট হয়ে যায়। সরকার জনগণের আমানত রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে তাই তার ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। সরকার অর্থপাচারকারী, ঋণ খেলাপিদের পাহারাদার। সরকার জনগণের ভোট লুটপাট করেছে আর একদল লুটেরাদের দিয়ে জনগণের অর্থ লুট করাচ্ছে। উভয় লুটেরারা আজ পরস্পরের বন্ধু। এর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মোশরেফা মিশু বলেন, পুলিশ এ সরকারকে বেশিদিন পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে পারবে না। সরকার লুটপাটকারীদের সাজা না দেয়ার কারণে তারা উৎসাহের সাথে লুণ্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক কমিশন করে লুটপাট থামানো যাবে না যদিনা তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয়। শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোতে গণপাহারা বসাতে হবে। হামিদুল হক বলেন, অর্থমন্ত্রী দেশি বিদেশি লুটেরাদের ফায়দা লুটার নানা ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট অর্থমন্ত্রীর সার্টিফিকেট বাগিয়ে নিয়েছে। বাস্তবে সে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অর্থমন্ত্রী। এক পরিবারের ৪ জন পরিচালক ৯ বছর মেয়াদ করার মধ্যদিয়ে লুটপাটের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। বাম জোটের ঘেরাও পূর্ব সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ হেল কাফি রতন, বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা ফখরুদ্দিন কবীর আতিক, গণসংহতি আন্দোলনের মুনীরুদ্দিন পাপ্পু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ; ঋণ খেলাপি, ব্যাংক ডাকাতদের গ্রেপ্তার-বিচার ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আইন করে বাজেয়াপ্ত করা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথাযথ কার্যকর ভূমিকা পালনের দাবিতে গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি পেশ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বরাবর গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক মতিঝিল, ঢাকা।

জনাব, শুভেচ্ছা নিবেন। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণানুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে গত ১২ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৯৩ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে যে সংকট বিরাজ করছে আমাদের বিবেচনায় তার উৎস হচ্ছে দেশের জবাবদিহীতাহীন, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী, লুটপাটের শাসন ব্যবস্থা ও মুক্তবাজারী অর্থনীতি, মন্ত্রী, আমলা, সাংসদ, ব্যাংকারদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও শাসক দলের আশ্রিত ব্যবসায়ী লুটেরা ধনিকদের লুটপাট, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাঙলাদেশ ব্যাংকের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের এসব অনিয়ম আমাদেরকে তথা সমগ্র দেশবাসীকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এ বিষয়ে প্রতিকারের জন্য আমাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ আপনার কাছে তুলে ধরছি। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর সংসদে দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৯১ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুন মাসে ৯ লাখ ৩২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ছিল। বিআইবিএম’র সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম তাঁর এক প্রবন্ধে হিসেব করে দেখিয়ে বলেছেন খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব চাতুরিপূর্ণ। তার মতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১,১২,৪২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের সাথে যুক্ত হবে আদালতের ইনজাংশনের কারণে ঝুলে থাকা ৭৯,২৪২ কোটি টাকা, স্পেশাল মেনশন একাউন্টের ২৭,১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভূত রিসিডিউলিং করা ২১,৩০৮ কোটি টাকা। সর্ব সাকুল্যে ২,৪০,১৬৭ কোটি টাকা। এর সাথে রাইট অফ করা মন্দ ঋণ ৫৪,৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করে হয় ২,৯৪,৬৩০ কোটি টাকা। ৩০ জুন ২০১৯ সালে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৬২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার বিপরীতে অধ্যাপক মইনুল হোসেনের হিসাব অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২,৯৪,৬৩০ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৩০.৬২%। এ বিশাল খেলাপি ঋণের জন্যে দায়ি সরকারের গণবিরোধী আর্থিক নীতি, সরকার ও ব্যাংক প্রশাসনের অদক্ষতা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা পালন না করা, অনিয়ম, দুর্নীতি, জবাবদিহীহীনতা। তার সাথে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা লুটেরা ধনিক গোষ্ঠী যারা ‘আদি পুঁজি সঞ্চয়ের’ নামে সরকারের সহযোগিতায় সকল নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওভার ইনভয়েস, আন্ডার ইনভয়েস, প্রকল্প ব্যয় অতিরিক্ত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। আবার অনেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে হুন্ডি করে দেশ থেকে টাকা পাচার করে দিয়েছে। সরকারের ছত্রছায়ায় এভাবে লুটেরা ধনিকরা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের বিদেশে পাচারকৃত টাকা যখন ফেরত আনা হলো তখন দেশবাসী আশ্বস্ত হয়ে মনে করেছিল দেশ থেকে পাচারকৃত সকল অর্থ ফেরত আনা হবে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রচার করেছে সেই পাচারকারীদের নামের তালিকা কেন সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করছে না? এ নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী পাবলিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পেতে গেলে পরিচালক, ব্যাংকার সিন্ডিকেটকে ঋণের ৭% থেকে ১০% টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে হয়। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সংখ্যায় সম্পাদক নঈম নিজাম এক সাংসদকে উদ্ধৃত করে স্বনামে উপসম্পাদকীয়তে যে কাহিনী লিখেছেন তা উপরের বক্তব্যকেই সমর্থন করে। কিন্তু এ খবর প্রকাশের পরও বাংলাদেশ ব্যাংককে ঐ চেয়ারম্যান ও ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের চরম ব্যর্থতা। এ সরকার আমলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু ৪/৫ হাজার কোটি টাকা দলীয় স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন। যার পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। বেসিক ব্যাংকের শক্তিশালী অবস্থান নষ্ট করে দিয়েছে রাজনৈতিক ও আত্মীয়তার বিবেচনায় নিযুক্ত হওয়া এই ব্যক্তিটি। সোনালী ব্যাংকের সরকার মনোনীত আওয়ামী লীগ নেতা পরিচালকদের সহযোগিতায় হলমার্ক নামক একটা কোম্পানি ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর দায়িত্ব কার? এর দায়িত্ব নিতে হবে সরকার, অর্থমন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের। এছাড়াও এই সরকারের আমলেই বিসমিল্লাহ, ক্রিসেন্ট, এননটেক্স প্রভৃতি আর্থিক কেলেংকারিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে এক বিলিয়ন ডলার চুরি হয়ে যাওয়ার কথা দেশবাসী জানে। অথচ আজও এসব ব্যাংক ডাকাতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের সম্মুক্ষিণ করা হয়নি। তদুপরি গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ এগারশ কোটি টাকা পাচারের চারটি মামলায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম. এ. কাদেরকে জামিন দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং কোম্পানির ৩৫০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছে এন আর বি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক এমডি পি. কে. হালদার। উচ্চ আদালতে দেশের এটর্নি জেনারেল বলেছেন পি. কে. হালদারকে অর্থ পাচারে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর। কিন্তু ঐ ডেপুটি গভর্নরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এ ছাড়া ফার্মাস ব্যাংকের মতো ঘটনা আরো ঘটবে যদি এর বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হয়। দেশের অর্থনীতিবিদ ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনা উচিত। তা সত্ত্বেও আমরা লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও নতুন করে ৩টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে যার মধ্যে পুলিশের একটি ও আইনমন্ত্রীর মায়ের নামে একটি ব্যাংক রয়েছে। এসব ঘটনা কিভাবে ঘটে, বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরই বা ভূমিকা কি তা দেশবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। ওয়ান ইলেভেন সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোক কোম্পানি করেছিল। এখন ঐ সব ব্যাংকের শেয়ার অফলোড করার কথা বলা হচ্ছে। যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহের চরিত্র নষ্ট করে ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিবে।

এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের বর্তমান হালচাল। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত কোনটাই ভাল নেই। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে নীতিসমূহ নিয়েছে সেগুলো দেশের আর্থিক খাত ও ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। তার কয়েকটি হচ্ছে যেমন :-

১) অর্থমন্ত্রী আ. হ. ম. মোস্তফা কামাল সাহেব চেয়ারে বসেই খেলাপি ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান সার্কুলার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। ঋণের শ্রেণিকরণের সংজ্ঞা ও মেয়াদ পরিবর্তন করে দেন। (ক) পূর্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের তিন মাস পর যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হত সেগুলোকে ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণ’ শ্রেণিকরণ করা হতো, নূতন নিয়মে তিন মাসের পরিবর্তে সময়টা ছয় মাস করা হয়েছে; (খ) পূর্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের ছয় মাসের বেশি যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হত সেগুলোকে ‘ডাউটফুল ঋণ’ বলা হত, নূতন নিয়মে নয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে ‘ডাউটফুল’ শ্রেণিকরণ হবে; এবং (গ) আগের নিয়মে নয় মাসের বেশি কোনো ঋণ খেলাপি হলে ‘মন্দঋণ’ শ্রেণিকরণ করা হতো, এখন এক বছর বা তার বেশি সময়ের জন্যে ঋণ অনাদায়ী হলে ‘মন্দঋণ’ বা ‘ব্যাড এন্ড লস’ শ্রেণিকরণ করা হবে। ২) আগে পাঁচ বছরের খেলাপি মন্দ ঋণ রাইট অফ করার যোগ্য বিবেচিত হতো। বর্তমানে ২/৩ বছর হলেই রাইট অফ করার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে। ৩) মাত্র ২% খেলাপি ঋণ প্রথম কিস্তিতে শোধ করলে ঋণ খেলাপিকে ১০ বছর সময় দেয়া হবে। যার মধ্যে তিন মাসের কিস্তিতে মাত্র ৯% সুদে বাকি ঋণ শোধ করা যাবে। ৪) অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, বিকল্প বিরোধ নিস্পত্তি আইন কার্যকর করার মাধ্যমে ঋণ খেলাপিদেরকে মাফ করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ৫) পরিবারতন্ত্রের স্বার্থে ব্যাংকিং আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনী অনুযায়ী ব্যাংক পরিচালনা পরিষদে এক পরিবার থেকে দুই জনের পরিবর্তে চার জনকে নিযুক্ত করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। একজন পরিচালক একাধিক্রমে ৬ বছরের পরিবর্তে একাধিক্রমে ৯ বছর পরিচালক থাকার বিধান রাখা হয়েছে। ৬) বর্তমানে একই পরিবারের মালিকানায় রয়েছে ৮টি বেসরকারি ব্যাংক। ব্যাংকসমূহের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়েছে। ৭) অর্থমন্ত্রী সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদানের বিল সংসদে পাস করেন। বাপেক্স, পেট্রোবাংলা, বিপিসি, ধান গবেষণাসহ ৬১টি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি তহবিলে স্থানান্তর করা হবে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হবে এবং সব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ যা ব্যাংকসমূহে জমা রয়েছে তা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয় তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ তারল্য সংকটে পড়বে।

সরকারের এসব সিদ্ধান্ত ঋণ খেলাপিদেরকে আরো উৎসাহিত করছে এবং যারা সৎভাবে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছেন তাদেরকেও খেলাপি হতে উৎসাহিত করবে।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য আমরা আপনাদের কাছে নি¤œলিখিত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের জন্য তুলে ধরছি :-

১. ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপি, ব্যাংক ডাকাতদের গ্রেপ্তার করে চূড়ান্ত বিচারের সম্মুখীন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ২. ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগসমূহ নিস্পত্তির জন্য ব্যাংক খাতের জন্য স্বতন্ত্র ‘ন্যায়পাল’ (ঙসনঁফংসধহ) নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. মন্দঋণ আদায়ের জন্য ‘ডেট রিকভারী এজেন্সি’ বা ‘এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন করতে হবে। ৪. অর্থ ঋণ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোন ঋণ খেলাপির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হলে সহজামানত নিলাম করার জন্য পুনরায় মামলা করার নিয়ম বাতিল করে সরাসরি নিলাম করার বিধান চালু করতে হবে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞায় বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা ও ঋণ আদায়ের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। ৫. খেলাপিদের কথিত ভিআইপি/ সিআইপি মর্যাদা বাতিল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে তাদেরকে আমন্ত্রণ করা যাবে না। কোন পর্যায়ের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে না। প্রতিমাসে গণমাধ্যমে ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ৬. বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বাতিল করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন এবিবি’র হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ৭. একীভবন (গধৎমবৎ)-এর মাধ্যমে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে এনে, ওভারহেড ব্যয় কমিয়ে এবং কর্মিদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে হবে। ৮. বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবারের ৪ জন সদস্য ৯ বছরের জন্য পরিচালক পদে থাকার বিধান বাতিল করতে হবে। ব্যাংক পরিচালকদের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হবে। ৯. ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহীতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করতে ‘স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন’ গঠন করতে হবে। ১০. বিদেশে পাচারকৃত সকল অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সাংবিধানিক অঙ্গীকার অনুযায়ী আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন সকলের অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ১১. দলীয় বিবেচনায় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ প্রদান বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের পরিচালনা পরিষদের নিয়োগ দিতে হবে। ১২. আমানত রক্ষা আইন সংশোধন করে আমনতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে। ১৩. রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক যেগুলো কোম্পানি করা হয়েছে তার শেয়ার অফলোড করা বন্ধ করতে হবে।

শুভেচ্ছান্তে

বজলুর রশীদ ফিরোজ সমন্বয়ক বাম গণতান্ত্রি জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ

 

Translate »