মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাসদ-এর ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সংলাপ অনুষ্ঠিত

“নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা”
মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে
বাসদ-এর ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সংলাপ অনুষ্ঠিতbb-press-photo-09-01-2017-dialogue-with-bangladesh-samajtantrik-dal-basod৯ জানুয়ারি ২০১৭ বিকেল ৩:০০টায় বঙ্গভবনের দবার হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাসদ-এর ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
নিবন্ধিত সকল দলের একজন করে প্রতিনিধি এবং অনিবন্ধিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দলের ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে সার্চ বা সিলেকট কমিটি গঠন, নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বমুক্ত কেন্দ্র, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা এই ৪ স্তরের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, ১ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ৮ বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত ৮ জনসহ মোট ৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা তবে একদলীয় সংসদে তড়িঘড়ি করে নয়, সর্বস্তরে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে আইন ও বিধানাবলী প্রণয়ন, কমিশন সদস্যদের যোগ্যতা, নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, প্রতিনিধি প্রত্যাহারের জন্য ভোটারদের ‘কলব্যাক’ করার ক্ষমতা, না ভোটের বিধান যুক্ত করা, ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল এবং রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নসহ ৫ দফা প্রস্তাব মহামান্য রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য উত্থাপন করা হয়।
প্রথমে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাসদের নেতৃবৃন্দকে বঙ্গভবনে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, রাষ্ট্রপতির জনসংযোগ সচিব ও সহকারী সচিবগণের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর বাসদ এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান প্রতিনিধি দলের সদস্য কমরেড বজলুর রশিদ ফিরোজ, জাহেদুল হক মিলু, রাজেকুজ্জামান রতন, অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজ, জয়নাল আবেদীন মুকুল, আবদুর রাজ্জাক, রওশন আরা রুশো, নিখিল দাস ও প্রকৌশলী শম্পা বসুকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং দলের পক্ষ থেকে ৫ দফা লিখিত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
bb-press-photo-09-01-2017-dialogue-with-bangladesh-samajtantrik-dal-basod-02রাষ্ট্রপতি মনযোগ সহকারে প্রস্তাবসমূহ শুনেন এবং নিজের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সাধ্যানুযায়ী সকল দলের বক্তব্য-প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।
আলোচনা শেষে কমরেড খালেকুজ্জামান বঙ্গভবনে বাসদ এর প্রতিনিধি দলকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জনানো ও ধৈয্য সহকারে বক্তব্য শুনার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
লিখিত প্রস্তাব প্রেসবিজ্ঞপ্তির সাথে সংযুক্ত করা হলো।

‘নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা’
শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতির কাছে
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের প্রস্তাব ও বক্তব্য
৯ জানুয়ারি ২০১৭, বিকেল ৩:০০টা, বঙ্গভবন, ঢাকা

শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতি মহোদয়,
আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম ও শুভেচ্ছা জানবেন। জাতীয় জীবনের বিশেষ সন্ধিক্ষণে বহু দিনের অমিমাংসিত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতামূলক ঐক্য সাধন ও বিতর্ক নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বার্থে আমাদের দল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর নেতৃবৃন্দকে আপনার কার্যালয়ে মতবিনিময়ে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানানোর জন্য দলের পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আপনার সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনি দশজন প্রতিনিধি নিয়ে উপস্থিতির আহ্বান জানিয়েছেন এবং সেই মোতাবেক আমি উপস্থিত নেতৃবৃন্দের সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। Ñ
এখানে রয়েছেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, জাহেদুল হক মিলু, রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় সংগঠক কমরেড অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজ, জয়নাল আবেদীন মুকুল, আবদুর রাজ্জাক, রওশন আরা রুশো, নিখিল দাস, প্রকৌশলী শম্পা বসু।
আপনার অবগতির জন্য আমরা উল্লেখ করতে চাই যে ২০১১ সালের ২৭ জুন এবং ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে এবং ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে আমরা উপস্থিত হয়ে আমাদের লিখিত মতামত ও মৌখিক বক্তব্য পেশ করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের চিন্তা ও মতামতকে সমৃদ্ধ করা কিংবা সংশোধিত করার লক্ষ্যে শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতি মহোদয়, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে কোন পদক্ষেপ না থাকায় আমরা আমাদের বক্তব্যের সীমাবদ্ধতা কিংবা কার্যকারিতা কোনটারই ভাল বুঝ তৈরি করতে পারিনি। সেই দুর্বলতা নিয়েই বর্তমানের আলোচ্য বিষয় ‘নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা’ এর উপর আমাদের মতামত পেশ করছি। যদিও আমরা জানি আলোচ্যসূচির সাথে সরাসরি অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বিষয় যেমন রয়েছে তেমনি পারিপার্শ্বিক, দূরবর্তী ও পরোক্ষ বহু বিষয়ও সংশ্লিষ্ট রয়েছে যেগুলি বিবেচনায় এনে সুরাহা না করলে, অতীতের মতো আপাত মিমাংসা, পরবর্তীতে জিঘাংসার জন্ম দিতে পারে। সেগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এ পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় দু’চারটি প্রসঙ্গ অতি সংক্ষেপে আমরা উল্লেখ করছি।
১। (ক) ‘নির্বাচন কমিশন: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮ : নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা’ প্রসঙ্গে ‘কোন আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনকে নিয়োগ দান করিবেন’ বলে যা নির্দেশিত হয়েছে, সেই আইনটি স্বাধীনতা পরবর্তী কাল থেকে আজ পর্যন্ত করা হয়নি। ফলে আইনটি ও তার বিধানাবলী প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তবে বর্তমান একপক্ষীয় পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তড়িঘড়ি করে আইনের খসড়া ব্যাপক পরিসরে আলোচনা পর্যালোচনা না করে আইনটি করা সমীচিন হবেনা, বরং তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে এবং বিদ্যমান আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
(খ) আমরা লিঙ্গ বৈষম্য যথাসম্ভব দূর করে নির্বাচন কমিশনকে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্র এই চার স্তরে স্থায়ী জনবল সহ স্বতন্ত্র কাঠামোয় দাঁড় করানোর কথা বলেছি। বর্তমানের ৮ বিভাগের তদারকির দায়িত্ব দিয়ে ৮ জন সদস্যসহ মোট ৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন কাঠামো গঠন করা, যার একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকবেন। অনুরূপ বিভাগে ৫ সদস্য, জেলা, উপজেলায় ৩ সদস্যের কমিশন কাঠামো হতে পারে।
(গ) নির্বাচন কমিশন গঠন : লিঙ্গ বৈষম্য যথাসম্ভব দূর করে ‘সার্চ কমিটি’ বা ‘সিলেক্ট কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি দলের ১ জন মনোনীত প্রতিনিধি, নিবন্ধিত দলসূহের বাইরে ক্রিয়াশীল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারনকারী সেক্যুলার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দল ও শক্তির প্রতিনিধি, বিচার বিভাগ কর্তৃক মনোনীত এপিলেট ডিভিশনের ১ জন বিচারপতি সমন্বয়ে সার্চ বা সিলেক্ট কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটি কর্তৃক মোট উত্থাপিত নামের মধ্য থেকে সর্বসম্মতিতে বা ভোটে দশ জনের প্যানেল তৈরি করবেন। রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে ৯ জন কেন্দ্রীয় কমিশনের কমিশনার নিয়োগ দেবেন। কমিশনারগণ নিজেদের মধ্য থেকে ঐক্যমত্যে অথবা সর্বোচ্চ ভোটে একজনকে নির্বাচিত করবেন, তাঁকে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিয়োগ দান করবেন। অন্যান্য কাঠামোর প্রধানসহ কমিশনারগণ কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে বিধানাবলী সাপেক্ষে (যা প্রণয়ন করতে হবে) নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন।
(ঘ) জাতীয় বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য পৃথক সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে (স্থায়ী কাঠামোগত ব্যয় ও নির্বাচনী খরচ)। যাতে অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বমুক্ত অর্থ ছাড় করার ব্যবস্থা থাকবে।
(ঙ) নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপমুক্ত নির্বাচন কমিশন সচিবালয় পরিচালিত হবে ও জনবল সংগৃহীত হবে। নির্বাচনকে টাকা, পেশী শক্তি, আঞ্চলিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, নির্বাচনমুখী দান-অনুদান, রাজনৈতিক দলীয় এবং কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তিসহ যে কোন প্রতিবন্ধকতা মুক্ত রাখতে সারা বছরের অনুসন্ধান, গবেষণা ও দুদকসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় প্রতিকারমূলক কার্যক্রম কমিশন সচিবালয়কে সতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে নিতে হবে।
২। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ মানদ- :
(ক) নির্বাচন কমিশনের সদস্যগণকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানপ্রনীত রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতিতে বিশ্বাসী হতে হবে। অতীত কিংবা বর্তমানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধ কিংবা অনুরূপ দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকেননি। তাদের নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশের জন্য জমা দিতে হবে।
(খ) এই সদস্যগণ কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য থাকলে, দলের পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে, ফৌজদারী অপরাধে দ-িত হলে, বিদেশি নাগরিক হলে, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, ঋণ খেলাপী হলে, কালো টাকা সাদা করে থাকলে, অনুপার্জিত সম্পদের মালিক হলে, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে থাকলে, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী হলে যোগ্যতা হারাবেন।
bb-press-photo-09-01-2017-dialogue-with-bangladesh-samajtantrik-dal-basod-03৩। নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১৯ বিধান মতে শুধু
(ক) রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বাধীন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি স্থানীয় সরকারসহ সকল নির্বাচনের তারিখ নির্ধারন ও আয়োজন করার পূর্ণ এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের থাকতে হবে। নির্বাহী কতৃত্ব তা অনুসরণ করবেন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন। নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার শুধুমাত্র রুটিন কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবেন।
(খ) অনুচ্ছেদ-৫৯ এ খড়পধষ এড়াবৎহসবহঃ এর বাংলা যথাযথ অনুবাদ স্থানীয় শাসন পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকার করতে হবে। এবং স্ব-শাসিত কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে।
(গ) আমরা সংবিধানের ৩য় পরিচ্ছেদ-এ স্থানীয় শাসন নির্দেশনার অনুচ্ছেদ-৫৯ এর আলোকে গ্রাম (ওয়ার্ড), ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্র এই ৬ স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনভার নিশ্চিত করার কথা বলেছি। সিটি কর্পোরেশন (মেট্রোপলিটন), পৌরসভা ইত্যাদিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ঐ ছয় স্তরের কাঠামোগত বিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্য ও সংগতি রেখে করা যেতে পারে। কারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত তথা গণপ্রনিধিত্বশীল সংস্থা স্তরায়িত না হলে শুধু মাত্র কেন্দ্রে বা মাঝের কোন স্তরে নির্বাচন বাস্তবে গণপ্রতিনিধিত্বের কাঠামোগত পূর্ণ অবয়ব ধারন করতে পারেনা এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত কার্যকারিতা সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেনা।
(ঘ) স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত সদস্যদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রক কর্তৃক বরখাস্ত করার বিধান রদ করতে হবে। ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলে পদ চলে যাবে। যে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে সেই জনগণের হাতে ‘কলব্যাক’ অর্থাৎ প্রতিনিধিত্ব খারিজ করার বিধান করতে হবে।
(ঙ) সাংবিধানিক অধিকার হরণ, লংঘন, বঞ্ছনা নিষ্পত্তির পাশাপাশি নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগ মামলা নিষ্পত্তির জন্য সাংবিধানিক আদালত গঠন করা যেতে পারে। নির্বাচনী বিরোধ মামলা ৩ মাসের মধ্যে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিমূলক রায় ঘোষণা করতে হবে।
(চ) নির্বাচনী জামানত ও ব্যয় : নির্বাচনে প্রার্থীর জামানত ৫০০০ টাকার উর্দ্ধে এবং নির্বাচনী ব্যয় তিন লক্ষ টাকার উর্দ্ধে করা সঙ্গত হবে না।
(ছ) ‘না’ ভোট : যে কোন স্তরের নির্বাচনে প্রার্থী বা দলের কাউকে সমর্থনযোগ্য মনে না হলে সেক্ষেত্রে ভোটারের ‘না’ ভোট প্রদানের বিধান ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৪। (ক) সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন : আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলসমূহের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদ সদস্য সংখ্যা নির্বাচনের কথা বলেছি। অনির্বাচিত সংরক্ষিত নারী আসনের বদলে সরাসরি নির্বাচনে একশত নারী আসনের প্রস্তাব করেছি। পার্বত্য তিন জেলায় নারী আসনে কেবলমাত্র আদিবাসীদের মধ্য থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিশেষ বিধানের কথা বলেছি। সংসদ সদস্যগণ শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ও সরকারি নীতি নির্ধারন, বাস্তবায়ন, তদারকি ও আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবেন।
(খ) সংবিধানের ৭০ ধারা বাতিল করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতি ও নির্বাহী প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার প্রস্তাব করেছি।
(গ) ১৮৬১ সালের উপনিবেশিক পুলিশ অ্যাক্ট এর বদলে স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক শাসনের উপযোগি পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল বাহিনীর জন্য আইন ও বিধান রচনা করতে হবে। পুলিশ, র‌্যাব বা বিজিবি সদস্য যাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকা-ের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে তাদেরকে নির্বাচন ডিউটি পালনে নিয়োগ করা যাবেনা।
৫। নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা :
(ক) নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে তার নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণ সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
(খ) আয়ের সাথে সংগতিহীন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধান পেলে তা বাজেয়াপ্ত করা এবং প্রার্থীতার অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
(গ) ঋণ খেলাপী হলে, বিদেশে নিজ নামে, স্বামী/ স্ত্রী, সন্ত্রান-সন্ততির নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থাকলে, কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা-কর্তৃত্ব হস্তান্তর কার্যকরভাবে না করলে প্রার্থী যোগ্যতা হারাবে।
(ঘ) সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা, ধর্মীয় প্রতারণা কিংবা নির্বাচনী স্বার্থ সিদ্ধিমূলক কর্মকা-, ফৌজদারি অপরাধে দ-িত কিংবা স্থানীয় জনগণের কাছে অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার বহুল আলোচিত কিংবা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে প্রার্থী যোগ্যতা থাকবে না। বিদেশী নাগরিক হলে প্রার্থী যোগ্যতা থাকবে না।
(ঙ) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকাকালীন সময়ে নির্বাচনী এলাকার বাইরে স্থাবর-অবস্থাবর সম্পত্তি করে থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করা যাবে এবং ভবিষ্যত প্রার্থীতার অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে।
(চ) সাংসদসহ জনপ্রতিনিধিদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার বাইরে রাষ্ট্রীয়ভাবে জমি বা সম্পদ বরাদ্দ করা যাবে না। এলাকায় ভাল জীবনযাপন স্বার্থে অনুরূপ বরাদ্দ করা যাবে। এতে সারা জীবন তারা ভোটারদের সান্নিধ্য ও শ্রদ্ধা পাবেন এবং সেবা নিতে বা দিয়ে যেতে পারবেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রের কর্মচারীরা বিদেশে চিকিৎসা নিতে বা সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারবেননা। তাতে দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসা মানের যথেষ্ঠ উন্নতি সাধিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশে চিকিৎসা নেবেননা বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন সে কথাও গুরুত্ব পাবে।
সম্মানিত রাষ্ট্রপতি,
পরিশেষে আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণআকাংখার আপেক্ষিকভাবে যতটুকু প্রতিফলন আমাদের ’৭২ সালের সংবিধানে ঘটেছিল, সে অঙ্গীকার ৪৬ বছরের শাসকশ্রেণি রক্ষা করতে পারেনি, বহু ক্ষেত্রে বিকৃতি সাধন ও পশ্চাদগমনেও দ্বিধা করেনি। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, প্রথা-প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক সরকার দাঁড়ায়নি, নির্বাচিত-অনির্বাচিত স্বৈরশাসন ও তারই উত্তরাধিকার বহনের পথে দেশ পরিচালিত হয়ে এসেছে। এ যাবৎকাল একটি নির্বাচনও অংশগ্রহণকারী সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয় সংসদ কার্যকর ছিলনা, এখনও কার্যকর নয়, এক দলীয় ও একপক্ষীয় সংসদ চলছে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূত প্রধান দুই বুর্জোয়া দল কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা। একের ধ্বংস অপরের টিকে থাকার শর্ত হয়ে উঠেছে। দেশের জনগণও এই দলসমূহের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠ হতে পারে এ বিশ্বাস স্থাপন করে উঠতে পারেনি। তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক বা তদারকি রেফারী সরকার ব্যবস্থা এসেছিল। তাকেও বিতর্কিত করা হয়েছে এবং তা বিলুপ্ত হয়েছে। এখন নির্বাচনকালীন সময়ে রুটিন কাজের সীমানায় সরকারে লাগাম টানার ব্যবস্থাপত্র নিয়ে কথা চলছে যদিও লাগামের রজ্জু শেষ পর্যন্ত অটুট থাকবে কিনা তা নিসন্দেহ নয়। পরমত সহিষ্ণুতা ও যুক্তিবাদী মননশীলতা বিসর্জন দিয়ে দোষারোপের রাজনীতি ও বাচাল বিতর্কের আসর জমিয়ে চলেছে বৃহৎ বুর্জোয়া দলসমূহ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আইন রক্ষার দায়িত্ব পালনের সীমা ছাড়িয়ে গোপন ও প্রকাশ্য আইন লংঘনের পাল্লা ভারী করে তুলেছে। প্রশাসনে অব্যবস্থাপনার জট পাকিয়ে তোলা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থায় দ্বৈতশাসন ও বহু অনিয়মের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন প্রধান বিচারপতি। নির্বাচনের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকা এবং নির্বাচন পরিচালনার প্রধান সংস্থা নির্বাচন কমিশন চরম আস্থাহীনতার সংকটে ভুগছে বিধায় আপনাকে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়েছে। দুর্নীতি এখন সর্বব্যাপকতা লাভ করেছে এবং নির্বাচনও এর করাল গ্রাসে পতিত। আপনি সংসদের স্পীকার থাকাকালীন সময়ে বলেছিলেন, ‘এক বছরের দুর্নীতির টাকায় দুটি পদ্মা ব্রীজ করা সম্ভব’। এখন কি বলবেন জানিনা। ব্যক্তি সন্ত্রাস, জঙ্গি সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। রাজনীতির বাণিজ্য, বাণিজ্যের রাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনীতি হাতধারাধরি করে চলছে। নীতি-আদর্শবাদী রাজনীতিকে কোনঠাসা করে ফেলা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, আঞ্চলিক উত্তেজনা, দখলদারিত্বের বেপরোয়া অভিযান অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে চলেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি মর্যাদা হারাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারে যতটা উচ্চগামী, মানের দিক থেকে ততোধিক নি¤œগামী হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য সেবাসহ সকল সেবা কার্যক্রমে গরীব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নামে যতটা প্রচারিত ততোটাই তারা বঞ্চিত। উচ্ছেদ ও নিপীড়ন আতঙ্কে আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতাবোধ বেড়ে চলেছে। নারী-শিশু নির্যাতন সীমাহীন। তারপরও আমরা আশাবাদী। কারণ যে জনগোষ্ঠী রক্ত ঢেলে দেশকে স্বাধীন করেছে তারাই ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবে। আপনার উদ্যোগে ভরসা রেখে সুস্বাস্থ্যসহ আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করছি।

ধন্যবাদসহ

খালেকুজ্জামান
সাধারণ সম্পাদক
কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ