সকলের অংশগ্রহণে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে বাসদ

নির্বাচন কমিশনের সাথে বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে
১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত

Pic-2নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থা, ভোটাধিকারসহ নানা প্রশ্নে বহুদিন থেকে চলে আসা চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানকল্পে আজ ৫ অক্টোবর ২০১৭ সকাল ১১:০০টায় নির্বাচন কমিশনের সদস্যবৃন্দের সাথে কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাসদ-এর ১৪ সদস্যের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মতবিনিময় সভায় লিখিত বক্তব্যে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা, তার স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা, শুধু নির্বাচন কমিশনের একক কর্মপ্রচেষ্টার উপর নির্ভর করেনা। যদিও নির্বাচনের সফলতা ব্যর্থতার দায়-দায়িত্বের সিংহভাগ নির্বাচন কমিশনকেই বহন করতে হয়। যে কারণে নির্বাচনের জন্য কমিশনকে মুখ্য ভূমিকায় রেখে ক্ষমতাসীন দল-জোট, ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল-জোটসহ অংশগ্রহণকারী ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী দলসমূহ, বিচার ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, সিভিল প্রশাসন, দুর্নীতিদমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের একযোগে সমন্বিত উদ্যোগে ক্রিয়াশীল হয়েই কেবলমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব ও প্রতিষ্ঠানসমূহের দলীয়করণকৃত কিংবা ভঙ্গুর দশা এবং ক্ষমতার মালিক যে জনগণ তাদের আস্থা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ব্যাপক গণউদ্যোগের ঘাটতিতে সব আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাতে শাসন ক্ষমতার অনুমোদন হয়তো প্রদর্শিত হয় কিন্তু জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয়না। ফলে নির্বাচন তখন শাসক শ্রেণি ও দলের স্বেচ্ছাচারের পথ উন্মুক্ত ও প্রসারিত করে। গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য কিন্তু নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র হয় না তার দৃষ্টান্ত হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালিসহ ইতিহাসে ভুরি ভুরি রয়েছে। আমাদের দেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়।
Pic-1প্রথমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বাসদের নেতৃবৃন্দকে শেরে বাংলানগরস্থ কমিশন ভবনে স্বাগত জানিয়ে কমিশনের সচিব ও কমিশনের সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান প্রতিনিধি দলের সদস্য কমরেড বজলুর রশিদ ফিরোজ, জাহেদুল হক মিলু, রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় সংগঠক নিখিল দাস, রওশনা আরা রুশো, ওসমান আলী, অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজ, জয়নাল আবেদীন মুকুল, আব্দুর রাজ্জাক, জুলফিকার আলী, খালেকুজ্জামান লিপন, জনার্দ্দন দত্ত নান্টু ও প্রকৌশলী শম্পা বসুকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে দলের পক্ষ থেকে ১৩ দফা লিখিত বক্তব্য ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবে প্রধানত কালোটাকা, পেশিশক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সকলের অংশগ্রহণে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলা, দুর্নীতিবাজ আমলা-পুলিশদের নির্বাচনী দায়িত্ব না দেয়া, প্রার্থীর জামানত পাঁচ হাজার টাকা ও নির্বাচনী ব্যয় দশ লাখ টাকা, নির্বাচনী অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি করা, প্রার্থীদের প্রচার ও পরিচিতি সভার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেয়ার কথা বলা হয়। বিদেশে টাকা পাচারকারী, আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের মালিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানানো হয়।
নির্বাচন কমিশনের সদস্যবৃন্দ বাসদ এর উত্থাপিত প্রস্তাবনা ও বক্তব্য মনযোগ সহকারে শুনেন এবং কমিশনের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সাধ্যানুযায়ী উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।
মতবিনিময় শেষে কমরেড খালেকুজ্জামান নির্বাচন কমিশন ভবনে বাসদ এর প্রতিনিধি দলকে মতামত ও পরামর্শ প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জনানো ও ধৈয্য সহকারে বক্তব্য শুনার জন্য শ্রদ্ধেয় কমিশনবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।

নির্বাচন কমিশনের সাথে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর মতবিনিময় সভায় বাসদ এর বক্তব্য ও প্রস্তাবনা
৫ অক্টোবর ২০১৭, সকাল ১১:০০টা, নির্বাচন ভবন, শেরে বাংলানগর, ঢাকা।

সম্মানিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারবৃন্দ
আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে আপনাদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থা, ভোটাধিকারসহ নানা প্রশ্নে বহুদিন থেকে চলে আসা চলমান রাজনৈতিক সংকটকালে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর প্রতিনিধি দলের সাথে পরামর্শ ও মতামত আদান-প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানোতে আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি শুরুতেই আমাদের দলের প্রতিনিধিবৃন্দের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। উপস্থিত আছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, জাহেদুল হক মিলু, রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় সংগঠক নিখিল দাস, রওশনা আরা রুশো, ওসমান আলী, অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজ, জয়নাল আবেদীন মুকুল, আব্দুর রাজ্জাক, জুলফিকার আলী, খালেকুজ্জামান লিপন, জনার্দ্দন দত্ত নান্টু ও প্রকৌশলী শম্পা বসু।
শুরুতে আমরা উল্লেখ করতে চাই যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ২০১১ সালের ২৭ জুন এবং ১০১২ সালের ২৬ নভেম্বর আমাদের দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমরা উপস্থিত হয়ে তৎকালীন পরিস্থিতির বিবেচনায় আমাদের লিখিত মতামত পেশ করেছিলাম এবং এর বাইরেও নানা প্রসঙ্গ নিয়ে হৃদ্যতাপূর্ণ খোলামেলা আলোচনা করেছিলাম। আমরা আশা করেছিলাম পরবর্তী সময়ে আমাদের উত্থাপিত ও আলোচ্য বিষয়ের যদি কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকে তা জানতে পারবো কিংবা অগ্রহণযোগ্য বিষয়াবলী সম্পর্কেও কমিশনের যুক্তি ও বিবেচনাবোধে সমৃদ্ধ হতে পারবো। কিন্তু তা হয়নি। একইভাবে ২০১২ সালে শ্রদ্ধেয় সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান ও ৯ জানুয়ারি ২০১৭ শ্রদ্ধেয় বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব মোঃ আব্দুল হামিদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ-পরামর্শ ও মতামতের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমরা উপস্থিত হয়ে লিখিত মতামতসহ বহু বিষয়ের অবতারণা করেছি। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে তাঁরা তাঁদের সীমাবদ্ধতা, বিদ্যমান বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলসমূহের দায়-দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে বেশ কিছু মতামত ব্যক্ত করেন। আমরা আশা করেছিলাম পরবর্তী সময়ে আমাদের উত্থাপিত বিষয়সমূহের উপর ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যুক্তি পরামর্শে আমরা সমৃদ্ধ হবো। তাও হয়নি।
সম্মানিত কমিশন,
আপনারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনপূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে কারিগরি দিকসমূহের উপর বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন এবং ৭টি করণীয় বিষয় নির্ধারণ করে একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। আর তা ১৬ জুলাই ২০১৭ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটা প্রশংসাযোগ্য কাজ। কিন্তু সবার সঙ্গে বিশেষ করে রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে আলাপ-আলোচনা সমাপ্ত হবার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পেলে কতোটা ভালো হতো, পূর্ণতা পেত তার চেয়েও বড় কথা সকলের সন্তুষ্টি মাত্রা বৃদ্ধি পেত। সাথে দশম সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েলও পাঠিয়েছেন, আমরা পেয়েছি আপনাদের ধন্যবাদ।
আপনারা আমাদের সঙ্গে একমত হবেন যে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা, তার স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা, শুধু নির্বাচন কমিশনের একক কর্মপ্রচেষ্টার উপর নির্ভর করেনা। যদিও নির্বাচনের সফলতা ব্যর্থতার দায়-দায়িত্বের সিংহভাগ নির্বাচন কমিশনকেই বহন করতে হয়। যে কারণে নির্বাচনের জন্য কমিশনকে মুখ্য ভূমিকায় রেখে ক্ষমতাসীন দল-জোট, ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল-জোটসহ অংশগ্রহণকারী ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী দলসমূহ, বিচার ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, সিভিল প্রশাসন, দুর্নীতিদমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের একযোগে সমন্বিত উদ্যোগে ক্রিয়াশীল হয়েই কেবলমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব ও প্রতিষ্ঠানসমূহের দলীয়করণকৃত কিংবা ভঙ্গুর দশা এবং ক্ষমতার মালিক যে জনগণ তাদের আস্থা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ব্যাপক গণউদ্যোগের ঘাটতিতে সব আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাতে শাসন ক্ষমতার অনুমোদন হয়তো প্রদর্শিত হয় কিন্তু জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয়না। ফলে নির্বাচন তখন শাসক শ্রেণি ও দলের স্বেচ্ছাচারের পথ উন্মুক্ত ও প্রসারিত করে। গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য কিন্তু নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র হয় না তার দৃষ্টান্ত জার্মানি, ইটালিসহ ইতিহাসে ভুরি ভুরি রয়েছে। আমাদের দেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়।
আমরা রাষ্ট্রপতির সাথে সর্বশেষ বৈঠকে দেশের পরিস্থিতির যে বর্ণনা তুলে ধরেছিলাম, সে পরিস্থিতির মৌলিক কিংবা ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়নি। আমরা বলেছিলাম, নির্বাচন কমিশন আস্থার সংকটে রয়েছে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রধান দুই বুর্জোয়া দল কেউ কাউকে সহ্য কিংবা বিশ্বাস করে না। তারা একের ধ্বংস অপরের টিকে থাকার শর্ত করে নিয়েছে। দেশের জনগণও এই দলসমূহের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে এ বিশ্বাস স্থাপন করে উঠতে পারেনি। কারণ তারা কেউই ক্ষমতা ছাড়া কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকাকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে ফেলেছেন। সে জন্য তত্ত্বাবধায়ক বা তদারকি রেফারী সরকার ব্যবস্থা এসেছিল। তাকেও বিতর্কিত করা হয়েছে এবং তা বিলুপ্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী দায়িত্ব পালনের সীমা ছাড়িয়ে গোপন ও প্রকাশ্য আইন লংঘনের পাল্লা ভারী করে তুলেছে। প্রশাসনের দলীয়করণ ও অব্যবস্থাপনার জট খুলছেনা। বিচার ব্যবস্থায় দ্বৈত শাসন ও বহু অনিয়মের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন প্রধান বিচারপতি। সেগুলো নিরসনের বদলে তা এখন আরো জটিলে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতি এখন সর্বব্যাপকতা লাভ করেছে এবং নির্বাচনও এর করাল গ্রাসে পতিত। এ যাবৎ একটি নির্বাচনও অংশগ্রহণকারী সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয় সংসদ কার্যকর ছিলনা, এখনও কার্যকর নয়, এক দলীয় ও একপক্ষীয় সংসদ চলছে। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, আঞ্চলিক উত্তেজনা ও পেশীশক্তির দাপট অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আপনারা এগোচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আমরাও প্রত্যাশা করি একটা অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সফলতা ও স্বার্থকতা লাভ করুক। নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার সংকট কাটুক।
সম্মানিত কমিশন,
আমরা কিছু দাবি ও প্রস্তাবনা আপনাদের সমীপে রাখছি, যার মধ্যে বেশ কটি আপনাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত হলেও নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করি। যেগুলো নির্বাচন কমিশনের আওতায় রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আপনাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং যেগুলো সরকার কিংবা সংসদের বিষয় সেগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের নিকট জোরালো সুপারিশ পাঠাবেন বলে প্রত্যাশা করি।
১. সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ (১) এর বিধান মতে ‘আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে’ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনের নিয়োগদান ও কর্মের শর্তাবলী নির্ধারণের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত সে আইনটি রচিত হয়নি। এডহক ভিত্তিতে তা চলছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের সদস্য সংখ্যা কত হবে, সদস্যদের যোগ্যতা কি হবে তা সুনির্দিষ্ট করে যথাযথ আইন প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করি। অপসারিত হওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ব্যবস্থার কথা বলা আছে অনুচ্ছেদ ১১৮ (৫) এ। এখন সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল এর মাধ্যমে বিচারপতিদের জবাবদিহিতা ও অপসারন ব্যবস্থা থাকলেও নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও কি তা প্রযোজ্য হবে? ১১৯ অনুচ্ছেদ (১) এ বলা আছে যে নির্বাচন কমিশন (ক) ‘রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন’ (খ) ‘সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন’। তাহলে স্থানীয় সরকারসমূহের নির্বাচনের বিষয়টি কি স্পষ্ট করা হলো? সংসদ নির্বাচনের মতোই সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বের ৯০ দিনের মধ্যে যেভাবে নির্বাচনের ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন করেন একইভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নীতিমালা প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এ ব্যাপারে নির্বাহী বিভাগের সাথে নির্বাচন কমিশনের আলোচনা ও মিমাংসা প্রয়োজন।
২. নির্বাহী বিভাগের সম্পূর্ণ হস্তক্ষেপ মুক্ত আর্থিক সক্ষমতা সম্পন্ন স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্রে স্বতন্ত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থায়ী কাঠামো এবং তার পরিপূরক জনবল রাখতে হবে। জাতীয় বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট (স্থায়ী কাঠামোগত ব্যয় ও নির্বাচনী খরচ) কমিশনের চাহিদা সাপেক্ষে আলোচনার মাধ্যমে অর্থমন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত বরাদ্দ থাকতে হবে।
৩. নির্বাচনী প্রচারনা ব্যয় (জনতহবিল) আইন ২০১১ এর শুরুতে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল ইচ্ছুক প্রার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং অবৈধ অর্থের ব্যবহার প্রতিরোধ করা সমীচিন ও প্রয়োজনীয়’ – কথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচনে প্রার্থীর জামানত পাঁচ হাজার (৫০০০/=) টাকার উর্দ্ধে হওয়া বাঞ্চনীয় নয়। নির্বাচনী ব্যয়ও দশ লক্ষ টাকায় সীমিত রাখা দরকার বলে মনে করি। নির্বাচনী প্রচারের জন্য প্রত্যেক প্রার্থীকে পোস্টার, প্রচারপত্র কমিশনের পক্ষ থেকে সরবরাহ এবং কমিশনের উদ্যোগে সকল প্রার্থীর একত্রে পরিচিতি সভা করা যেতে পারে।
৪. নির্বাচন প্রার্থীর যোগ্যতা : নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে প্রথমে তাঁর সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে। জমা দেয়া তথ্যের সাথে বাস্তবের অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া গেলে এবং অনুপার্জিত আয়ের সন্ধান মিললে তা বাজেয়াপ্ত, শাস্তির বিধান ও নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। প্রার্থী যদি সাম্প্রদায়িক হন, সাম্প্রদায়িক উস্কানী বা সংঘাতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত কিংবা মদদ দেন, আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সংঘাত সংঘর্ষের উস্কানী বা অংশগ্রহণ করেন, মাদকাশক্ত কিংবা মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকেন, ঘরে বাইরে নারী নির্যাতন বা নির্যাতনে প্ররোচনা দেন, কোন ফৌজদারী অপরাধে আদালত কর্তৃক দ-প্রাপ্ত হন, ঋণ খেলাপী হন, তাহলেও শাস্তি বিধান ও নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। একটি নির্বাচিত এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তার প্রতিনিধিত্বের মেয়াদকালে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বাইরে স্বনামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর কোন সম্পত্তি অর্জন করলে তা বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং পরবর্তী যে কোন নির্বাচনের জন্য তাকে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য আজীবন সম্মানী ভাতা চালু করা যেতে পারে। নির্বাচনে কালোটাকা, পেশিশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা ও আঞ্চলিকতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৫. নির্বাচন পদ্ধতি : জাতীয় সংসদে দলীয় প্রতিনিধিত্বমূলক অর্থাৎ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলসমূহের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি চালু করতে হবে। এতে ব্যয় বাহুল্যসহ বহু ধরনের জটিলতা কমাবে। তিন আসনে একজন ভিত্তিক নারী আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ১০০ জন নারী সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার বিধান করতে হবে। পার্বত্য তিন জেলায় সংরক্ষিত নারী আসনে কেবলমাত্র আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মধ্য থেকে প্রার্থী হওয়ার বিধান করতে হবে।
৬. নির্বাচন কমিশনের সকল সদস্যদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ্যে থাকা দরকার বলেও আমরা মনে করি।
৭. সংবিধানের ৩য় অনুচ্ছেদ-এ খড়পধষ মড়াবৎহসবহঃ এর বাংলা অনুবাদ স্থানীয় শাসনের বদলে স্থানীয় সরকার হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্র এই ৬ স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সকল স্তরের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংস্থার আকার-আকৃতি, জনসেবা ও কার্যপরিধি, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্তে উপণীত হয়ে আইন প্রণয়ন দরকার। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের নির্বাহী আদেশে বরখাস্ত করার নিয়ম বাতিল করা প্রয়োজন। আদালত কর্তৃক শাস্তি ব্যতীত শুধুমাত্র ফৌজদারী মামলায় চার্জসিট গৃহীত হলেই স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা যাবে না।
৮. সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, যাতায়াত ব্যবস্থা ও অতীত নির্বাচনী অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভাল হবে বলে আমরা মনে করি।
৯. ইভিএম প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত এমন নিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে বলে আমাদের জানা নেই। আমেরিকার নির্বাচনে অতি আধুনিক পদ্ধতির মধ্যেও কারচুপির বিষয় সারা দুনিয়ার মানুষকে চিন্তিত করেছিল। আসল কথা হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। তারপরও আমরা ইভিএম এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলতে পারে বলে মনে করি।
১০. নির্বাচন আদালত : নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বতন্ত্র ও পৃথক আদালত গঠন করতে হবে। নির্বাচনী বিরোধ ৩ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত ভাবে নিষ্পত্তি করা এবং এই রায় এর প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে ১ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তিমূলক রায় ঘোষণা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
১১. কোন সংসদ সদস্য ৩০ দিনের অধিক কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে অথবা জনস্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিলে তাহার সদস্যপদ জনগণ রিকল (প্রত্যাহার) করতে পারবেন এমন বিধান করতে হবে। অনুপস্থিত সময়কালে তারা কোন আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা প্রয়োজন।
১২. নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে পূর্ববর্তী নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য করতে হবে।
১৩. সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য শুধুমাত্র রুটিন কাজ পরিচালনাকারী সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান এর বিধান করা আবশ্যক। এই ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা কিভাবে দল নিরপেক্ষ করা যায় সে বিষয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় মতামত সৃষ্টি করা জরুরি মনে করি।