কমরেড মাও সেতুং লাল সালাম

  •  
  •  
  •  

কমরেড মাও সেতুং লাল সালাম

[৯ সেপ্টেম্বর ’২১ ছিল চীন বিপ্লবের নেতা কমরেড মাও সেতুং-এর ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। অনুশীলন সম্পর্কে (জ্ঞান ও অনুশীলনের মধ্যেকার, জানা ও করার মধ্যেকার সম্পর্ক প্রসঙ্গে জুলাই ১৯৩৭) রচনা প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় অংশবিশেষ মুদ্রণ করা হলো-সম্পাদক।]
Mao-Zedong-3মার্কসের পূর্বে, বস্তুবাদ জ্ঞানের সমস্যাকে বিচার করতো মানুষের সামাজিক প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে এবং তার ঐতিহাসিক বিকাশকে বাদ দিয়ে, আর সে কারণে তা সামাজিক অনুশীলনের উপর জ্ঞানের নির্ভরশীলতা, অর্থাৎ উৎপাদন ও শ্রেণি সংগ্রামের উপর জ্ঞানের নির্ভরশীলতাকে হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ ছিল না।
সর্বোপরি, মার্কসবাদীরা মানুষের উৎপাদনমূলক কার্যকলাপকেই সবচেয়ে মৌলিক বাস্তব কার্যকলাপ ও অন্যান্য সকল কার্যকলাপের নির্ণয়ক বলেই মনে করে। মানুষের জ্ঞান নির্ভর করে তার বস্তুগত উৎপাদনমূলক কার্যকলাপের উপর, যার মধ্য দিয়ে সে পর্যায়ক্রমে প্রকৃতির বিষয়-ব্যাপারগুলি, বৈশিষ্ট্যগুলি ও নিয়ম-বিধিগুলি এবং তার নিজের ও প্রকৃতির মধ্যেকার সম্পর্কগুলিকে বুঝতে সক্ষম হয়; আর তার এই উৎপাদনমূলক কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে মানুষের সাথে মানুষের যে নির্দিষ্ট সম্পর্কসমূহ রয়েছে তা-ও সে বিভিন্ন মাত্রায় বুঝতে সক্ষম হয়। উৎপাদনমূলক কার্যকলাপকে বাদ দিয়ে এই জ্ঞানের কোন কিছুই অর্জন করা যেতে পারে না। শ্রেণিহীন সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তিই, সমাজের এক সদস্য হিসেবে, অন্যান্য সদস্যদের সাথে সাধারণ প্রচেষ্টায় যোগ দেয়, তাদের সাথে নির্দিষ্ট উৎপাদন-সম্পর্কে আবদ্ধ হয় এবং মানুষের বস্তুগত চাহিদা পূরণের জন্যে উৎপাদন-কাজে লিপ্ত হয়। শ্রেণিবিভক্ত সকল সমাজেই, বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির সদস্যরাও, বিভিন্নভাবে, নির্দিষ্ট উৎপাদন সম্পর্কগুলিতে আবদ্ধ হয় এবং বস্তুগত চাহিদা পূরনের জন্য উৎপাদন কাজে লিপ্ত হয়। এটাই হলো প্রাথমিক উৎস যা থেকে মানুষের জ্ঞান বিকাশ লাভ করে।
মানুষের সামাজিক অনুশীলন কেবলমাত্র উৎপাদনমূলক কার্যকলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পরন্তু তা পরিগ্রহ করে অন্যান্য বহু রূপÑশ্রেণি-সংগ্রাম, রাজনৈতিক জীবন, বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক বৃদ্ধি; সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাস্তব সমাজ-জীবনের সকল ক্ষেত্রেই মানুষ অংশ গ্রহণ করে। তাই, মানুষ কেবল তার বৈষয়িক জীবনের মধ্য দিয়েই নয়, বরং তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের (যেগুলোর উভয়টিই বৈষয়িক জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত) মধ্য দিয়েও, বিভিন্ন মাত্রায়, মানুষের সাথে মানুষের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক সম্বন্ধে অবহিত হয়। এসব অন্যান্য ধরণের সামাজিক অনুশীলন, বিশেষ করে শ্রেণিসংগ্রাম, তার সকল বিভিন্নমুখী রূপেই, মানুষের জ্ঞানের বিকাশের উপর সুগভীর প্রভাব বিস্তার করে। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির সদস্য হিসেবে বাস করে এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে সব ধরণের চিন্তাধারার উপরই অঙ্কিত থাকে শ্রেণির ছাপ।
মার্কসবাদীরা মনে করে যে, মানব সমাজে উৎপাদনগত কার্যকলাপ বিকাশ লাভ করে নি¤œতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে ধাপে ধাপেই, এবং ফলশ্রুতিতে, প্রকৃতি সম্পর্কিতই হোক কিংবা সমাজ সম্পর্কিতই হোক, মানুষের জ্ঞানও ধাপে ধাপে বিকাশ লাভ করে নিম্নতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে, অর্থাৎ, অগভীর জ্ঞান থেকে গভীর জ্ঞানে, একদিকদর্শী জ্ঞান থেকে বহুদিকদর্শী জ্ঞানে। ইতিহাসের একটা অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে, সমাজের ইতিহাস সম্পর্কে এক একপেশে উপলব্ধির মধ্যেই মানুষকে অপরিহার্যরূপে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছিল, কারণ একদিকে যেমন, শোষক শ্রেণিসমূহের পক্ষপাতদুষ্টতা সবসময়ই ইতিহাসকে বিকৃত করতো, আর অন্যদিকে, ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনব্যবস্থা মানুষের দৃষ্টিকে সীমিত করে রাখতো। সুবিশাল উৎপাদিকা-শক্তির (বৃহদায়তন শিল্পের) সাথে সাথে আধুনিক সর্বহারাশ্রেণির আবির্ভাব ঘটার পরই কেবল সমাজবিকাশ সম্পর্কে মানুষ এক সার্বিক, ঐতিহাসিক উপলব্ধি অর্জন করে এবং এই জ্ঞানকে এক বিজ্ঞানে, মার্কসবাদের বিজ্ঞানে পরিণত করে। মার্কসবাদীরা মনে করে যে, মানুষের সামাজিক অনুশীলনই বহিঃস্থ জগৎ সম্পর্কে তার জ্ঞানের সত্যতার মাপকাঠি। প্রকৃতপক্ষে যা ঘটে তা হলো এই যে, সামাজিক অনুশীলনের (বৈষয়িক উৎপাদন, শ্রেণিসংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার) প্রক্রিয়ায় মানুষ যখন প্রত্যাশিত ফলাফল লাভ করে তখনই কেবল মানুষের জ্ঞানের সত্যতা প্রমাণিত হয়। যদি কোন মানুষ তার কাজে সাফল্য লাভ করতে চায়, অর্থাৎ, প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে চায় তাহলে তার নিজের চিন্তাকে অবশ্যই বস্তুগত বহির্জগতের নিয়মাবলির সাথে সঙ্গতিশীল করতে হবে; যদি তা সঙ্গতিশীল না হয় তাহলে তার অনুশীলনে ব্যর্থ হবে। ব্যর্থ হওয়ার পর, সে তা থেকে শিক্ষা নেয়, তার চিন্তাকে এমনভাবে সংশোধন করে যাতে তা বহির্জগতের নিয়মাবলির সাথে সঙ্গতিশীল হয়, আর এভাবে ব্যর্থতাকে সাফল্যে পরিণত করতে পারে; ‘ব্যর্থতাই সাফল্যের প্রসূতি’ এবং ‘ঢুস খেলে হুঁশ হয়’ বলতে এটাই বুঝায়। দ্বান্দ্বিকবস্তুবাদী জ্ঞান তত্ত্ব অনুশীলনকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়, এবং মনে করে যে, মানবিক জ্ঞানকে কোন ক্রমেই অনুশীলন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না আর যেসব ভ্রান্ত তত্ত্ব অনুশীলনের গুরুত্বকে অস্বীকার করে কিংবা জ্ঞানকে অনুশীলন থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেরূপ সকল তত্ত্বকেই প্রত্যাখান করে। যেমন, লেনিন বলেছেন, ‘(তাত্ত্বিক) জ্ঞানের চেয়ে অনুশীলন উচ্চতর, কারণ তার যে কেবল সর্বজনীনতার গুণবৈশিষ্ট্যই রয়েছে তাই নয়, বরং রয়েছে আশু বাস্তবিকতার গুণবৈশিষ্ট্যও’।
মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনের দুটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একটা হলো তার শ্রেণিপ্রকৃতি (Class nature) এটা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করে যে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সর্বহারাশ্রেণির সেবায় নিয়োজিত। অন্যটি হলো তার ব্যবহারিক প্রকৃতি (Practicality) তা গুরুত্ব আরোপ করে যে, অনুশীলনের উপরই তত্ত্ব নির্ভরশীল, তত্ত্বের ভিত্তি হচ্ছে অনুশীলন আবার তত্ত্ব অনুশীলনেরই সেবা করে। কোন জ্ঞান বা তত্ত্বেরই সত্যতা বিষয়বাদী আবেগ-অনুভূতি দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় সামাজিক অনুশীলনের ক্ষেত্রে তার বাস্তব ফলাফলের দ্বারা। একমাত্র সামাজিক অনুশীলনই সত্যের মাপকাঠি হতে পারে। দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদী জ্ঞান-তত্ত্বে অনুশীলনের দৃষ্টিভঙ্গীই হলো প্রাথমিক ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গী।
কিন্তু মানুষের জ্ঞান কীভাবে অনুশীলন থেকে উদ্ভূত হয় এবং কীভাবে আবার অনুশীলনেরই সেবা করে? জ্ঞানের বিকাশের প্রক্রিয়ার দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
অনুশীলনের প্রক্রিয়ায়, মানুষ প্রথমত, বস্তুর বাহ্যিক দিক, পৃথক পৃথক দিক, বহিঃস্থ সম্পর্কগুলোকেই দেখতে পায়। উদাহরণ স্বরূপ, বাইরে থেকে উয়েনান পরিদর্শনে কিছু লোক আসলো। প্রথম এক দু দিনে, তারা দেখে এর ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, রাস্তা-ঘাট ও বাড়িঘর; বহু লোকজনের সাথে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়, ভোজসভা, সান্ধ্য অনুষ্ঠান ও জনসভায় তারা যোগ দেয়, বিভিন্ন ধরণের আলাপ-আলোচনা শুনে এবং বিভিন্ন ধরণের দলিলপত্র পড়ে। এ সব কিছুই হলো বস্তুর বাহ্যিক দিক, পৃথক পৃথক দিক এবং বহিঃস্থ সম্পর্কসমূহ। এটাকে বলা হয় জ্ঞানের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যায় [Perceptual stage of knowledge], অর্থাৎ ইন্দ্রিয় অনুভূতি ও মনের উপর ছাপ পড়ার পর্যায়। অর্থাৎ, উয়েনানের এসব বিশেষ বস্তুগুলো পরিদর্শক দলের সদস্যদের ইন্দ্রিয়গুলোর উপর ক্রিয়া করে, ইন্দ্রিয় অনুভূতি [Sense perceptions] জাগ্রত করে এবং তাদের মস্তিষ্কে এমন বহু ছাপ ফেলে যেগুলোর সাথে থাকে এসব ছাপের মধ্যেকার বহিঃস্থ সম্পর্কগুলোর একটা ভাসাবাসা ছবি : এটাই হলো জ্ঞানের প্রথম পর্যায়। এ পর্যায়ে, মানুষ তখনও গভীরতর উপলব্ধি গঠন করতে পারে না, পারে না যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত টানতে।
সামাজিক অনুশীলন যতই এগিয়ে যেতে থাকে, ততই যে বিষয়গুলি অনুশীলনের গতিধারায় মানুষের ইন্দ্রিয় অনুভূতি ও ছাপগুলোর জন্ম দেয়, সেগুলির বহুবার পুনরাবৃত্তি ঘটে; তখন জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কজগতে একটা আকস্মিক পরিবর্তন (উল্লম্ফন) ঘটে, এবং উপলব্ধি (Concepts) রূপ লাভ করে। এই উপলব্ধিগুলো তখন তার বস্তুগুলোর বাহ্যিক রূপ [Phenomenon], পৃথক পৃথক দিক ও বহিঃস্থ সম্পর্ক নয়; সেগুলো তখন বস্তুর সারাংশকে, সামগ্রিকতাকে ও অভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে আয়ত্ত করে। উপলব্ধি ও ইন্দ্রিয় অনুভূতির মধ্যে কেবলমাত্র পরিমাণগত পার্থক্যই নয়, গুণগত পার্থক্যও রয়েছে। এভাবে আরও এগিয়ে গিয়ে, বিচার ও অনুমিতির [Judgement and inference] সাহয্যে একজন যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত টানতে সমর্থ হয়। ‘সান কুও ইয়ান ই’-তে (তিন রাজ্যের কাহিনি) উল্লিখিত ‘ভ্রু কোঁচকালেই ফন্দি মাথায় আসে’ বলতে অথবা চলতি কথায় ‘ব্যাপারটা ভেবে দেখি’ বলতে বিচার ও অনুমিতি গঠনের জন্যে মানুষের মস্তিষ্ক জগতের উপলব্ধিগুলোর ব্যবহারকেই বোঝায়। এটা হলো জ্ঞানের দ্বিতীয় পর্যায়। যখন পরিদর্শক দলের সদস্যরা বিভিন্ন ধারণের তথ্যাদি সংগ্রহ করার এবং অধিকন্তু, ‘এগুলো নিয়ে ভেবে দেখার’ কাজটি শেষ করেন, তখনই তারা এই বিচারে এস পৌঁছাতে পারেন যে, ‘কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় যুক্তফ্রন্টের নীতি হলো সম্পূর্ণাঙ্গ, ঐকান্তিক ও সাচ্চা’। এই বিচারে পৌঁছার পর, জাতিকে রক্ষা করার ব্যাপারে তারা যদি আন্তরিকই হোন তাহলে তারা আরও এগিয়ে যেতে এবং নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত টানতে পারেন যে, ‘জাপ বিরোধী জাতীয় যুক্তফ্রন্ট সাফল্য লাভ করতে পারে’। কোন বস্তুকে জানার গোটা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে উপলব্ধি, বিচার ও অনুমিতির এই পর্যায়টিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; এটা হলো যৌক্তিক জ্ঞানের [rational knowledge] পর্যায়। জানার আসল কাজটি হলো, ইন্দ্রিয়অনুভূতির মধ্য দিয়ে চিন্তায় পৌঁছানো, ধাপে ধাপে বাস্তব বস্তুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসমূহের ব্যাপারে, তাদের নিয়ম-বিধির ব্যাপারে এবং একটি প্রক্রিয়া ও আরেকটি প্রক্রিয়ার মধ্যেকার অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ব্যাপারে উপলব্ধিতে পৌঁছানো, অর্থাৎ যৌক্তিক জ্ঞানে পৌঁছানো। পুনরায় বলতে গেলে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান থেকে যৌক্তিক জ্ঞানের পার্থক্য হলো এখানেই যে, ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য জ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত হলো বস্তুর পৃথক পৃথক দিক, বাহ্যিক রূপ এবং বহিঃস্থ সম্পর্কসমূহ, অন্যদিকে যৌক্তিক জ্ঞান বস্তুর সামগ্রিকতা, সারাংশ ও অভ্যন্তরীন সম্পর্কসমূহে পৌঁছার জন্যে সামনের দিকে এক বড় পদক্ষেপ এগিয়ে যায় এবং পারিপাশির্^ক জগতের অন্তঃস্থিত দ্বন্দ্বগুলিকে উদ্ঘাটন করে দেয়। সুতরাং যৌক্তিক জ্ঞান পারিপার্শ্বিক জগতের বিকাশকে তার সামগ্রিকতায়, তার সকল দিকের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের দিক থেকে আয়ত্ত করতে সক্ষম।
জ্ঞানের বিকাশের প্রক্রিয়ার এই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তত্ত্ব খোদ অনুশীলনের উপরই প্রতিষ্ঠিত এবং অগভীর থেকে গভীরতার দিকেই অগ্রসর হয়, আর মার্কসবাদের আবির্ভাবের পূর্বে কেউ কখনো তা সূত্রায়িত করতে পারেননি। মার্কসীয় বস্তুবাদই সর্বপ্রথম এই সমস্যাকে সঠিকভাবে সমাধান করে, বস্তুবাদী ও দ্বান্দ্বিক উভয় দিক থেকে জ্ঞানের ক্রমগভীরমুখী গতিকে দেখিয়ে দেয়, যে গতির সাহায্যে সমাজে মানুষ তার উৎপাদন ও শ্রেণি সংগ্রামের জটিল, নিয়মিতভাবে আবর্তনশীল অনুশীলনের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান থেকে যৌক্তিক জ্ঞানের দিকে এগিয়ে যাবে। লেনিন বলেছিলেন, ‘পদার্থের বিমূর্তকরণ, প্রকৃতির নিয়মবিধির বিমূর্তকরণ, মূল্য প্রভৃতির বিমূর্তকরণ সংক্ষেপে, সকল বিজ্ঞানসম্মত (সঠিক, গুরুত্বপূর্ণ, যৌক্তিক) বিমূর্তকরণ প্রকৃতিকে আরও গভীরভাবে, সত্যিকারভাবে ও পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত করে’। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ মনে করে, জ্ঞানের প্রক্রিয়ার দুটি পর্যায়ের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, নিম্নতর পর্যায়ে জ্ঞান নিজেকে অভিব্যক্ত করে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপে আর উচ্চতর পর্যায়ে যৌক্তিক জ্ঞান রূপে কিন্তু উভয়টিই হলো জ্ঞান লাভের অখণ্ড প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পর্যায় বিশেষ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান আর যৌক্তিক জ্ঞান হলো গুণগতভাবেই পার্থক্যপূর্ণ কিন্তু পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; অনুশীলনের ভিতিতে তারা ঐক্যবদ্ধ। আমাদের অনুশীলন প্রমাণ করে যে, যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায় তা তৎক্ষণাৎই হৃদয়ঙ্গম করা যায় না, আর যা হৃদয়ঙ্গম করা যায় তা আরও গভীরভাবে অনুভব করা যায়। ইন্দ্রিয় অনুভূতি কেবলমাত্র বস্তুর বাহ্যিক রূপের সমস্যাটুকুই সমাধান করে; আর তত্ত্বই এককভাবে অন্তর্বস্তুর সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই উভয় সমস্যার সমাধান অনুশীলন থেকে বিন্দুমাত্রও আলাদা করা যায় না। কেউ কোন বস্তু সম্বন্ধে জানতে চাইলে সে বস্তুর সংস্পর্শে আসা ছাড়া, অর্থাৎ তার পরিবেশের মধ্যে বাস করা (অনুশীলন করা) ছাড়া সে ব্যক্তির আর কোন উপায় নাই। সামন্তান্ত্রিক সমাজে পুঁজিবাদী সমাজের নিয়ম-বিধিগুলো আগে থেকে জানা ছিল অসম্ভব, কারণ পুঁজিবাদ তখনও আবির্ভূত হয়নি, আনুষঙ্গিক অনুশীলনও ছিল অনুপস্থিত। কেবলমাত্র পুঁজিবাদী সমাজ থেকেই মার্কসবাদের জন্ম সম্ভব ছিল। অবাধ পুঁজিবাদের যুগে, মার্কসের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদের যুগের বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কতগুলি নিয়ম-বিধি পূর্বাহ্নেই মূর্তভাবে জানা ছিল অসম্ভব, কারণ পুঁজিবাদের সর্বশেষ পর্যায় সাম্রাজ্যবাদের তখনও আবির্ভাব ঘটেনি এবং আনুষঙ্গিক অনুশীলনও ছিল অনুপস্থিত; একমাত্র লেনিন ও স্তালিনই এই দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারতেন। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্তালিনের প্রতিভার কথা ও বাদ দিলেও, তাঁরা যে তাঁদের তত্ত্বগুলি সূত্রবদ্ধ করতে পেরেছিলেন তার কারণ প্রধানত, ছিল এই যে, তাঁরা তাঁদেরকালের শ্রেণি সংগ্রামের ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার অনুশীলনে ব্যক্তিগতভাবেই অংশ গ্রহণ করেছিলেন; এই শর্ত অনুপস্থিত থাকলে, কোন প্রতিভাবানের পক্ষেই সাফল্য লাভ করা সম্ভব হতো না। প্রাচীন কালে যখন প্রযুক্তিবিদ্যা ছিল অনুন্নত, তখন ‘পণ্ডিতরা ঘরে বসেই দুনিয়ার তাবৎ কিছু জানতে পারেন’-এসব প্রবাদ বাক্য ছিল একেবারেই ফাঁকা বুলি।


  •  
  •  
  •  

Translate »