চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন; শত বছরের শোষণ-বঞ্চনার উন্মোচন

চা-শ্রমিদের ৭ দফা দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ১৯ আগস্ট বাসদ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংহতি সমাবেশ ও মিছিল করে।

চা-শ্রমিদের ৭ দফা দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ১৯ আগস্ট বাসদ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংহতি সমাবেশ ও মিছিল করে।

মালিকদের সময়ক্ষেপণের কৌশলী পদক্ষেপ আর শ্রমিকদের অনড় অবস্থানের কারণে ১৩ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চা-শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘট চলার পর প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আন্দোলনের আপাত সমাপ্তি ঘটলো। চা-বাগান মালিকদের সাথে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং চা-শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করার আহবান জানিয়েছেন। ইতিপূর্বে চা-শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রীকে মায়েরমতো মনে করে তাদের আকুতি জানিয়ে বলেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী তাদের জন্য যে মজুরি ঠিক করে দেবেন তারা তাতেই সম্মত হবেন। মাতৃসমা প্রধানমন্ত্রী মালিকদের সাথে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন এবং বলেছিলেন চা-শ্রমিকদের সাথে তিনি ভিডিও কনফারেন্স করবেন। চা-শ্রমিকদের দাবি তিনি সম্ভবত গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেই জেনে নিয়েছেন। মালিকরা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন তারা চা-শ্রমিকদের জন্য কত কিছু করেন। সে সব জেনে নাকি প্রধানমন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, মালিকরা চা-শ্রমিকদের জন্য এত কিছু দেন কিন্তু তা প্রচার মাধ্যমে আসে না কেন? অবশ্য প্রচার মাধ্যমে যে সমস্ত ছবি প্রকাশিত হয় তাতে চা বাগানের সৌন্দর্য, সারি সারি ছেঁটে রাখা সবুজ চা গাছ দেখে অনুমান করা কঠিন বাগানের শ্রমিকদের জীবন কতটা কঠিন ও কষ্টকর। মাঝে মাঝে কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবিতে শ্রমিকের (নারী-পুরুষ উভয়েরই) স্বাস্থ্য দেখে কিছুটা ধারণা করা যায় তার কতটা আরামে আছেন।
চা বাগান নামটা শুনলেই কেমন যেন বাগান বাগান অনুভ‚তি তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে এটা ফুলের বাগানেরমতো বাগান নয় চা উৎপাদন খামার। প্রতিটি খামারে আছে শত শত একর জুড়ে বিস্তৃত চা গাছের সারি, চা প্রক্রিয়াজাত করার কারখানা, চা পাতা ওজন করার স্থান, একটু ছোট্ট বাজার যেখানে দরদাম করে শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা তরিতরকারি কেনেন, বাগানের তুলনায় পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর মন্দির, ছোট খাট মদের দোকান যার ক্রেতা প্রধানত পুরুষ শ্রমিকরা, শত শত জীর্ণশীর্ণ বাড়িরমতো মৃত্তিঙ্গা ধরণের ঘর যেখানে বংশ পরম্পরায় চা-শ্রমিকরা বসবাস করে, যেখানে তাদের সাথে তাদের পরিবারের সদস্যেরমতো ছাগল-মুরগি এমন কি গরুও থাকে। এক চিলতে জমি যেখানে একটু সবজি বা কোন গাছ লাগানোর চেষ্টা চলে থাকে। বিশাল বাংলো যা ম্যানেজার, এসিস্টেন্ট ম্যানেজার বাসভবন, থাকে অফিস ভবন, যন্ত্রপাতি রাখার শেড আর প্রবেশ মুখে থাকে বিশাল এক গেট। সব মিলিয়ে এক বিশাল কারবার! বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চির সবুজ চা গাছ আর ছায়া বৃক্ষ মিলে এক দারুণ স্নিগ্ধ পরিবেশ। এই স্নিগ্ধতার কারিগরদের রুক্ষ-নিরস জীবন যেন কারো চোখেই পড়ে না।
বাংলাদেশ অঞ্চলে প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান মালিনি ছড়া চা বাগান ১৮৫৪ সালে। যদিও চায়ের আদি উৎস চীনে এবং বিশ^বাণিজ্য শুরু চীনের মাধ্যমে কিন্তু ব্রিটিশরা চায়ে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর এবং এর বাণিজ্য সম্ভাবনা দেখে আসাম এবং বাংলায় চা চাষের উদ্যোগ নেয়। চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিরসন এবং চায়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে চা চাষের উদ্দেশ্যে আসাম এবং বাংলার ব্রহ্মপুত্র এবং সুরমা উপত্যকার লাখ লাখ একর ভ‚মি নামমাত্র মূল্যে বন্দোবস্ত নেয় তাঁরা। ফলে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে খুব অল্প সময়েই ব্রিটিশ মালিকানায় শত শত চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষিভিত্তিক চা শিল্পের জন্য প্রয়োজন প্রচুর শ্রমিক। লাখ লাখ শ্রমিক সংগ্রহ করতে উড়িষ্যা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, যুক্ত প্রদেশ, মাদ্রাজ, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে টার্গেট করে দালাল বা আড়কাঠি নিয়োগ করা হয়। প্রচুর আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বলা হলো, চলো এমন দেশে যাই যেখানেÑগাছ হিলানেসে প্যায়সা মিলেগা” অর্থাৎ গাছ হিলালে পয়সা মিলে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে শিকড় ছিন্ন করে লক্ষ লক্ষ মানুষ আশায় বুক বেঁধে পাড়ি জমান চা বাগানগুলোতে।
ব্রিটিশ বেনিয়া বা ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি, জাতিসত্তার লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্থায়ীভাবে বাগানে আটকে রাখার জন্য ১৮৬৯ সালে ওহষধহফ ঊসরমৎধঃরড়হ অপঃ এবং ডড়ৎশসধহ’ং ইৎবধপয ড়ভ ঈড়হঃৎধপঃ প্রণয়ন করে পুরুষ ৫ টাকা, মহিলা ৪ টাকা, অনুর্ধ্ব ১২ বছর অর্থাৎ শিশু শ্রমিক ৩ টাকা মাসিক মজুরি এবং ৩ টাকা মন রেশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিয়ে ৫ বছর মেয়াদের চুক্তিতে এই শ্রমিকদের নিয়োগ করে। ফলে চা বাগানগুলোতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের অধীনে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের নামে নতুনরূপের দাস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তান পার হয়ে বাংলাদেশের ৫০ বছর পরও চা-শ্রমিকদের জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া তেমন লাগেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে ও জীবন দিয়েও তারা এখনো তাদের অধিকার থেকে যোজন যোজন দূরে। এ বারের চা-শ্রমিকদের আন্দোলন সেই বাস্তবতাকে চোখের সামনে তুলে ধরেছে।
দুই বছর পর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণের নিয়ম থাকলেও প্রায় ২০ মাস ধরে ঝুলিয়ে রাখা মজুরি আলোচনার সমাপ্তি টানতে চা-শ্রমিকরা বিক্ষোভে নেমে এসেছিলেন রাস্তায়। এ রকম আন্দোলন বাংলাদেশ দেখেনি অনেক দিন। ১৬৮টি বানিজ্যিক চা বাগানের দেড় লাখ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের ৬ লাখের বেশি সদস্য ১৭ দিন ধরে আন্দোলন করেছেন। দেশের প্রান্তে পড়ে থাকা একদল শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে আজ আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিল। দিনে ১২০ টাকা নগদ মজুরি আর সপ্তাহে রেশন, জীর্ণ ঘরে বংশ পরম্পরায় গাদাগাদি করে বসবাস করা চা-শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল ৭ আগস্ট থেকে। প্রথমে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি তারপর ১৩ আগস্ট থেকে একটানা চলেছে এই পূর্ণ ধর্মঘট। দেশের মানুষ অনেকেই হতবাক হয়েছেন উন্নয়ন আর অগ্রগতির এই দেশে এত কম মজুরিতে কাজ করা এত হতভাগ্য মানুষ আছেন একথা জেনে আর আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ দেখে। কিন্তু তাদের কষ্টের কথা জানলেও তাদের সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। চা-শ্রমিকদের দাবি ছিল তাদের ন্যূনতম মজুরি দৈনিক ৩০০ টাকা দিতে হবে। আন্দোলনের চাপে মালিকরা দুই দফায় ১৪০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছিল। তারপর বলা হলো প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা দিতে রাজি হয়েছেন তারা। কিন্তু শ্রমিকেরা ১৪৫ টাকা মজুরির প্রস্তাব মানেনি।
মরিয়া আন্দোলন, মরণের ভয় উপেক্ষা করে
কতখানি মরিয়া হয়ে আন্দোলনে নামলে না খেয়ে, চাকরি হারানোর ভয় সত্তে¡ও শ্রমিকরা দিনের পর দিন আন্দোলনে থাকতে পারে তা চা-শ্রমিকদের জীবন না দেখলে বুঝা যাবে না। হাজার হাজার নারী শ্রমিক যারা সন্তানের মতো যতেœ চা গাছ বড় করে, হাড় সর্বস্ব হাতে যতখানি কোমল হওয়া যায় ততখানি কোমল স্পর্শে চায়ের পাতা তোলে যেন গাছ আঘাত না পায়। দুপুরে যাদের খাবার চা পাতা মরিচ ডলে শুকনো রুটি আর বোতলে করে আনা লবণ মেশানো চা বা পানি। কমপক্ষে ২৩ কেজি পাতা তুলে বড় পোটলা বানিয়ে মাথায় করে নিয়ে যাওয়া পাতা ওজন করার স্থানে, ছায়া বৃক্ষের ছায়া যাদেরকে রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচাতে পারে না বলে রোদে পোড়া গায়ের রঙ যাদের, সারাদিন প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য যাদের কোনো শৌচাগার নেই, মুখ বুঝে সব সহ্য করা এই নারীরা কেন বাগানের কাজ আর ঘরের দায়িত্ব ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে এটা নাকি বুঝতে পারছিলেন না মালিক এবং সরকারের কর্তৃপক্ষ। পুলিশ যখন লাঠি তুলেছে বা বন্দুক তাক করেছে তখন তারা পুলিশের সামনে চিৎকার করে বলেছে গুলি করবেন? করুন! আমরা কি বেঁচে আছি যে আমাদেরকে মারবেন? তাদের কথা শুনে কি বুঝতে অসুবিধা হয় যে কতখানি যন্ত্রণা তাদের বুকে? একজন কর্মকর্তা কৌশল করে জানতে চেয়েছিল কারা তাদেরকে রাস্তায় নামিয়েছে? প্রশ্ন শুনে একসাথে শ্রমিকরা বলে উঠেছে কে আবার তাদেরকে রাস্তায় নামাবে? অভাব আর মজুরির দাবিতে তারা রাস্তায় নেমেছে।
চা-বাগান মালিকদের দেয়া হিসেব শুভঙ্করের ফাঁকি
২৩ আগস্ট সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ টি এ্যাসোসিয়েশনের এক সংবাদ সম্মেলনে চা বাগান মালিকরা জানান, বস্তুত চা-শ্রমিকরা ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করলেও তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দৈনিক প্রায় ৪২২ টাকা পেয়ে থাকেন। মালিকদের হিসেবে শ্রমিকরা মাসে প্রায় ১১ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। দৈনিক নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি চা পাতা তুলে তারা দৈনিক ৬৫ টাকা প্ল­াকিং বোনাস পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া ছুটির দিনে কাজ করে এবং ভোর বেলা মর্নিং ক্যাশ প্ল­াকিং করে তারা অতিরিক্ত আয় করে থাকেন।
তাদের হিসেবে একজন শ্রমিক দৈনিক গড়ে প্রায় ১৮০-১৮৫ টাকা পর্যন্ত নগদ মজুরি পেয়ে থাকেন। তাছাড়া আরও বিবিধ প্রত্যক্ষ সুবিধা যেমন, ১৪ দিনের বার্ষিক ছুটি ভাতা, বেতনসহ ১৪ দিনের উৎসব ছুটি ভাতা, ২০ দিনের অসুস্থজনিত ছুটি ভাতা, ভবিষ্যৎ তহবিল ভাতা, কাজে উপস্থিতি ভাতা (৪০-৫০ দিনের মজুরির সমান উৎসব ভাতা), ভবিষ্যৎ তহবিলের উপর প্রশাসনিক ভাতার মাধ্যমে সর্বমোট দৈনিক গড়ে ২৪৬ টাকা নগদে পেয়ে থাকেন।
টি এসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চা শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের পরোক্ষ যে সকল সুবিধাসমূহ প্রদান করা হয়ে থাকে তা বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পের তুলনায় নজিরবিহীন। এই শিল্পে প্রতি শ্রমিককে ২ টাকা কেজি দরে মাসে প্রায় ৪২ কেজি চাল/আটা রেশন হিসেবে প্রদান করা হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ২,৩১০ টাকা। তাছাড়া শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে চা শিল্পে প্রায় ৯৪ হাজার ২০০ বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য বিনামূল্যে চা-শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।
চা-শ্রমিকদের বসত বাড়ির জন্য বিনামূল্যে পরিবার প্রতি ১,৫৫১ স্কয়ার ফিট জায়গার মধ্যে ৩৭০ বর্গফুট বিশিষ্ট সর্বমোট ৬৮,৮০৬ বসতবাড়ি কোম্পানি নির্মাণ করেছে এবং এর বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন।
তাছাড়া, শ্রমিকগণ হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু পালন করে থাকেন এবং গবাদিপশু পালনের জন্য চারণভ‚মি ও রাখালের খরচও কোম্পানি বহন করে থাকে।
মালিকরা বলেন, এছাড়াও একজন চা-শ্রমিক অবসর গ্রহণ করলে তার পরিবর্তে তার পছন্দ অনুযায়ী পরিবারের একজনকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা পেনশনের আদলে সাপ্তাহিক ১৫০ টাকা অবসর ভাতা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা এবং ২ টাকা প্রতি কেজি মূল্যে চাল বা আটাও পেয়ে থাকেন।
১৯০ বছরের পুরোনো শিল্প হিসেবে বাংলাদেশের অন্যান্য যেকোনো শিল্পের তুলনায় অনেক আগে থেকেই শ্রম আইন অনুসরণপূর্বক ৭০ দশকে লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সমকাজ এবং সম-মজুরি নিশ্চিত করেছে। তারা আরও বলেছেন, চা শিল্পে ১৯৩৯ সাল থেকে শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রচলন করে, যা বর্তমানে ১৬ সপ্তাহ মাতৃকালীন ছুটি ও আইন নির্ধারিত মাতৃকালীন ভাতা দিয়ে থাকে। চা বাগানগুলো, গর্ভ ও প্রসবকালীন জটিলতাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করছে যা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য শিল্পে বিরল। সর্বোপরি সবদিক থেকেই চা শিল্প অনেক আগে থেকেই সুসংগঠিত একটি শিল্প।
শ্রমিকের ভাতা, বিভিন্ন রকম শ্রমিক কল্যাণমূলক যেমন, বিশুদ্ধ খাবার পানি, ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক, স্বাস্থসম্মত টয়লেট, পূজা, বিনোদন প্রভৃতি কর্মকাÐে সামগ্রিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। উপরোক্ত এ সকল সুবিধা টাকার অঙ্ক হিসাবে প্রায় ৪৩ টাকা দাঁড়ায়।
উল্লেখ্য যে, প্রতিটি চা-বাগান ওয়েলফেয়ার এস্টেট হিসেবে পরিচালিত হয় এবং ইংরেজি প্রবাদ বাক্যের আদলে বলতে গেলে বলতে হয় চা বাগান কোম্পানিগুলো তাদের প্রতিটি শ্রমিক পরিবারের সদস্যের ‘জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত’ এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি চাহিদার সাথে চা কোম্পানির অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মজুরি হিসেবে নগদ অর্থ ছাড়াও একজন শ্রমিককে দৈনিক ঘর ভাড়া বাবদ ৭৬ টাকা ৯২ পয়সা, চিকিৎসা বাবদ সাড়ে ৭ টাকা, ভ‚মি উন্নয়ন কর বাবদ শূন্য দশমিক ০২ টাকা, বাসাবাড়িতে উৎপাদিত ফলমূল বাবদ ১৪ টাকা, অবসরভাতা ২ টাকা, গরু চরানো বাবদ ১ টাকা, চা-শ্রমিক পোষ্যদের শিক্ষা ব্যয় বাবদ দেড় টাকা দেওয়া হয়।
চা-শ্রমিকদের বাস্তবে প্রাপ্তি কত?
মালিকদের প্রদত্ত হিসেব তো পাওয়া গেল এখন এক এক করে হিসেব মিলিয়ে দেখা যাক ঘোষণা, প্রচারণা আর প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক কত?
প্লাকিং বোনাস
প্রতিদিন নাকি শ্রমিকরা প্লাকিং বোনাস পায় ৬৫ টাকা। এর অর্থ কী আর প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ কত? কোন শ্রমিক যদি তার প্রাপ্ত মজুরিতে সংসার চালাতে না পেরে অতিরিক্ত কাজ করেন তাহলে তা কী মজুরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়? এর মাধ্যমে তো এটাই প্রমাণিত হয় যে মজুরি এত কম যে শ্রমিকদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। সাধারণত প্ল­াকিং মৌসুমে এবং তরুণ, যুবকরা কিছুটা অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে পারে। বাকি সারাবছর নিরিখ চা-শ্রমিকদের জন্য পুরন করাই কঠিন। অভাবের তাড়নায় কয়েকটা বাড়তি টাকার জন্য শ্রমিকরা জীবনীশক্তি নিঃশেষ করতে থাকে। ৩৫-৪০ বছর বয়সী শ্রমিকরা কি এই বাড়তি কাজ করতে পারে? চা-শ্রমিকদের চেহারা দেখলে আর কোন প্রমাণ দরকার হয় না। তারপরও এটা তো মজুরির আইন না।
রেশনের হিসেব কি ঠিক আছে?
চা-শ্রমিকদের রেশনের যে হিসেব দেয়া হয়েছে তা যাচাই করে দেখা যাক!
একজন স্থায়ী পুরুষ শ্রমিক সপ্তাহে রেশন পান ৩.২৭ কেজি, তার নির্ভরশীল স্ত্রী পান ২.৪৪ কেজি, সন্তান (৮ বছর পর্যন্ত) ১.২২ কেজি, সন্তান (১২ বছরের নিচে) ২.৪৪ কেজি চাল অথবা আটা পেয়ে থাকেন। সন্তানের বয়স ১২ বছরের বেশি হলে মা-বাবা তাদের জন্য কোন রেশন পাবেন না। চা বাগানের বেশিরভাগ শ্রমিক নারী কিন্তু নারী শ্রমিকরা তাদের নির্ভরশীলদের জন্য কোন রেশন পান না। তিনি অনুপস্থিত থাকলে রেশন কাটা হয়। ধানি জমি থাকলে রেশন দেওয়া হয় না।
তাহলে দেখা গেল রেশনের হিসাব বড় জটিল। সপ্তাহে রেশন পান ৬ কেজি থেকে ৯.৩৭ কেজি আর মাসে সর্বমোট রেশন পেয়ে থাকেন ২৪ থেকে ৩৭.৪৮ কেজি। কেজি প্রতি দাম শ্রমিকদের কাছ থেকে নেয়া হয় ২ টাকা। কেজি প্রতি ৪৫ টাকা ভর্তুকি দিলে মাসে রেশন বাবদ শ্রমিকরা পান ১০৮০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৬৮৬ টাকা। তাহলে দিনে দাঁড়ায় ৩৬ টাকা থেকে ৫৬ টাকা। অথচ মালিকেরা হিসাব করে প্রচার আর প্রাপ্তির মধ্যে কি বিশাল ঘাটতি।
ধান চাষের জমি ও খাদ্য নিরাপত্তা
ছোট বড় টিলা নিয়ে চা বাগান। চা বাগানের পুরো জমিতেই চা গাছ লাগানো হয় না। পতিত বা অব্যবহৃত এসব জমিকে চাষযোগ্য করে শ্রমিকরা কিছু চাষবাস করেন এ জন্য মজুরিতে তা হিসাব করে দেখানো হয়েছে। সাধারণত চা বাগানের যে অংশে চা গাছ লাগানো যায় না অর্থাৎ নিচু জলাভ‚মিরমতো সেই অংশ ধান চাষের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার যারা বাগানের জমি আবাদ করেন তাদের রেশন কেটে রাখা হয়। একটু বাড়তি আয়ের জন্য রেশন পাওয়ার আশা বাদ দিয়ে তাদের পরিবারের সবাই মিলে অতিরিক্ত সময়ে কাজ করে জমিতে। এই জমিতে চাষের জন্য ধান খেতের ভ‚মি উন্নয়ন কর প্রতিদিন ১০ পয়সা অর্থাৎ মাসে তিন টাকা ধরা হয়েছে। চা-শ্রমিকরা যে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করে তার রাখালের খরচ নাকি মালিক দিয়ে থাকে। ভাবুন একবার! রাখালের বেতন দেবার জন্য প্রতিদিন মজুরিতে ধরা হয়েছে ১ টাকা। সংসারের অভাব মেটানোর জন্য পতিত জমিতে আবাদ করে তাকে উন্নত করে যে শ্রমিকরা এটাকেও মজুরির অংশ বানানোর কথা বলা হয়েছে। বাসাবাড়ির আশেপাশে শ্রমিকরা দুই একটা ফলের গাছ লাগিয়ে থাকে। সাধারণত নারী শ্রমিকরাই এসব গাছের যতœ করে। সেখানে উৎপাদিত ফলমূল বাবদ ১৪ টাকা শ্রমিকদের মজুরির সাথে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে। এক চিলতে জমিতে একটা লাউ, পেপে কিংবা পেয়ারা গাছের ফলের দামও হিসেবের বাইরে নেই!
চা-শ্রমিকদের ঘর : মানুষ ও প্রাণীর একসাথে বসবাস
চা-শ্রমিকদের গৃহের জন্য ভ‚মি উন্নয়ন কর/ ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে প্রতিদিন ২ পয়সা। প্রতিদিন ২ পয়সাও হিসেব থেকে বাদ দেননি দয়ালু মালিকেরা। প্রতিদিন ২ পয়সা মানে মাসে ৬০ পয়সা আর বছরে ৭ টাকা ২০ পয়সা তারা ধার্য করেছেন শ্রমিকের উপর। এক শতাংশ জায়গার জন্য ৩ টাকা মালিকরা সরকারকে দিয়ে থাকেন চা বাগানের জমি ইজারা নেয়ার জন্য। এক শতাংশ সমান ৪৩৫ বর্গফুট। মালিকরা বলছেন ৩৭০ বর্গফুট ঘর তারা দিয়ে থাকেন। বাস্তবে মৃতিঙ্গা টাইপের ঘর হয় ২১ ফুট বাই ১০ ফুট অর্থাৎ ২১০ বর্গফুট। আয়তনে মাত্র অর্ধেক শতাংশ যার খাজনা ১.৫০ টাকা আর মালিকরা আদায় করেন ৭.২০ টাকা। টিন, বাঁশ, মাটি দিয়ে ঘর বানানোর খরচ যদি ২৫ হাজার টাকা দেয়া হয় আর ১৫ বছর তা টিকে থাকে তাহলে প্রতি বছর, প্রতি মাস, প্রতি দিন হিসেব করলে আসে ৪ টাকা ৬২ পয়সা। কিন্তু ঘর বাবদ ধরা হয়েছে প্রতিদিন ৭৬ টাকা ৯২ পয়সা। যা দেন তার চেয়েও অনেক বেশি হিসাব দেখানো হচ্ছে এরপরও তারা বিনামূল্যে বাড়ি দেয়ার কৃতিত্ব দাবি করছেন।
কী আছে চা-বাগানের জমি ইজারার শর্তের মধ্যে?
সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রামের চা বাগানের জমির মালিক রাষ্ট্র। মেয়াদি লিজে মালিকরা এইসব বাগানের জমি ইজারা নিয়েছে। ২ লাখ ৮০ হাজার একর জমিতে নিবন্ধিত চা বাগানগুলো অবস্থিত। প্রতি একর জমির ভ‚মি উন্নয়ন কর বা খাজনা ৩০০ টাকা। অন্যদিকে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের জমি ১২৫ টাকা শতাংশ হিসাবে খাজনা দেওয়া হয়। সে হিসাবে শিল্পের ক্ষেত্রে এক একর (১০০ শতাংশে এক একর) জমির খাজনা দাঁড়ায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। অথচ চা বাগানকে শিল্প দাবি করে তারা খাজনা দেন ৪০ ভাগের এক ভাগেরও কম। এই স্বল্প মূল্যে ইজারা নেয়ার শর্তের মধ্যেই আছেÑ
অনুচ্ছেদ-১২ : চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের সুবিধাবলি-
১২.১ চা বাগান শ্রমিকদের বসবাসের জন্য সুপরিসর বাসগৃহ প্রদানের ব্যবস্থা করিতে হইবে।
১২.২ শ্রমিকদের পয়নিষ্কাশনের জন্য যথাযথ স্যানিটেশন সুবিধা প্রদান, গভীর নলক‚প স্থাপনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানিয় জল সরবরাহের ব্যবস্থা করিতে হইবে।
১২.৩ চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করিতে হইবে।
তাহলে পয়নিষ্কাশনের, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের যে কথা মালিকরা বলছেন, তা তো জমি ইজারার শর্তের মধ্যেই আছে। এটা কোন মালিকদের পক্ষ থেকে বদান্যতা বা সুবিধা দেয়া নয়। শ্রমিকদের জন্য এই ব্যবস্থা করবেন বলেই তো এত স্বল্প মূল্যে জমি ইজারা দেয়া হয়েছে। অথচ এ সবের জন্য দৈনিক ৪৩ টাকা করে হিসেবে ধরেছেন তারা। শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী মালিকপক্ষ প্রত্যেক শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জন্য বিনা মূল্যে বাসস্থান নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাংলাদেশ টি বোর্ডের তৎকালীন হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ৩২ হাজার ৯৯৯ স্থায়ী শ্রমিকের জন্য আবাসন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। যাঁরা বরাদ্দ পেয়েছেন, তাঁদের একটিমাত্র ঘরে কোনো বিভাজকের ব্যবস্থা না থাকায় মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ছেলের স্ত্রী এবং গরু-
ছাগল নিয়ে পুরো পরিবারকে একসঙ্গে বসবাস করতে হয়।
চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কী বলা হচ্ছে আর বাস্তবতা কী?
মালিকদের দাবি, চা-শ্রমিক ও তার পুরো পরিবারের সকলেই বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে থাকেন অথচ অন্যান্য শিল্পে শুধু মাত্র শ্রমিক নিজেই এই সুবিধা পান। শ্রমিকদের মৃত্যুর পরেও তার পরিবারের জন্য এই সুবিধা বহাল থাকে। উল্লেখ্য যে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চা শিল্পে ২টি বড় আকারের আধুনিক গ্রæপ হাসপাতাল ও ৮৪টি গার্ডেন হাসপাতালে ৭২১ শয্যার ব্যবস্থা, ১৫৫টি ডিসপেনসারিসহ সর্বমোট ৮৯১ জন মেডিকেল স্টাফ নিয়োজিত আছেন।
টিআইবি’র এক জরিপে দেখা যায় যে মালিকদের এই দাবির সাথে বাস্তব চিত্রের মিল নেই। প্রতিটি বাগানে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার নিয়ম থাকলেও জরিপের আওতাভুক্ত ৬৪টি বাগানের মধ্যে ১১টিতেই তা ছিল না। বেশির ভাগ চা বাগানের চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রসবকালীন স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই। নিয়ম অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকার কথা থাকলেও বেশির ভাগ বাগানমালিক তা মানেন না। আর শ্রম আইনের ৮৯(৫) অনুযায়ী প্রতি ৩০০ শ্রমিকের জন্য চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ আর যন্ত্রপাতিসহ ডিসপেনসারি থাকতে হবে। সে অনুযায়ী ডিসপেনসারি থাকার কথা কমপক্ষে ৫০০টি। কিন্তু মালিকরাই বলছেন ডিসপেনসারি আছে ১৫৫টি যদিও সেসব ডিসপেনসারিতে ডাক্তার কতজন নিয়োজিত আছেন তা বলা হয়নি। আর চা-শ্রমিকরা চিকিৎসা কী ধরনের পায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে কেউ বাগানে গেলেই দেখতে পাবেন, চা-বাগানের চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই খারাপ। কোনো রোগী অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। চা-বাগানে নারী শ্রমিকদের শৌচাগার নেই। এ জন্য চা-বাগানের ভেতরেই শৌচকর্ম সারতে হয়। চা-বাগানের নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি কম পান, গর্ভবতী নারীরা পেটে সন্তান নিয়েও কাজ করেন। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা যায় অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়, স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭.৫ শতাংশ। ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়ে যায় ৪৬ শতাংশ কিশোরীর, ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই চা বাগানের ৬৭ শতাংশ মানুষের। স্বাস্থ্য সুরক্ষার দাবির সাথে বাস্তবতার দূরত্ব অনেক।
চা-শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা সুবিধাÑঘোষণা ও বাস্তবতা
টি এসোসিয়েশনের কর্মকর্তাগণ বলেছেন, চা-শ্রমিক সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রাথমিক, জুনিয়র ও উচ্চ বিদ্যালয়সহ সর্বমোট ৭৬৮টি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে যেখানে ১,২৩২ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন, যেখানে বর্তমানে ৪৪,১৭১ জন শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। কি দারুণ তথ্য! একটু হিসেব মিলিয়ে দেখা যাক! ১৬৮টি বাগানে ৭৬৮টি বিদ্যালয় হলে গড়ে প্রতি বাগানে সাড়ে ৪টি বিদ্যালয় থাকার কথা। অথচ বেশিরভাগ বাগানেই কোন বিদ্যালয় নেই। আবার বিদ্যালয়ের হিসেবের সাথে শিক্ষক সংখ্যার হিসাব সব গোলমাল করে দিল। তাদের দাবি অনুযায়ী শিক্ষক আছে নাকি ১২৩২ জন। মানে স্কুল প্রতি দেড়জন শিক্ষক। একটা স্কুলে ১ জন থেকে ২ জন শিক্ষক, কী শিক্ষা দেবেন বা দিতে পারেন তারা? শ্রম আইনের বিধিমালা অনুযায়ী বাগানমালিকের নিজ উদ্যোগে বাগান প্রতি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু জরিপে দেখা যাচ্ছে ৬২ শতাংশ বাগানমালিক তাদের বাগানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেননি। আশেপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে উঠার পর স্কুলে যেতে হলে মেয়েদের কতদূরে যেতে হয়, চা বাগানে কোন কলেজ আছে কি? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া যাবে না।
চা-শ্রমিকদের ছুটি আর মালিকদের বক্তব্য
মালিকরা বলছে, চা শ্রমিকদের প্রতি বছরে অর্জিত ছুটি ১৪ দিন, দৈনিক ৪ টাকা ৬০ পয়সা হারে দেয়। ছুটি শ্রমিকের আইনগত অধিকার এর আর্থিক মূল্য হিসাব করে মজুরির সাথে যুক্ত করা কি কোন আইনের মধ্যে পড়ে? অনেকটা প্রতারণারমতো নয় কি? চা-শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে আবার আইনে যৎসামান্য যে অধিকার আছে তাও নির্মম লঙ্ঘনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রম আইন অনুযায়ী প্রত্যেক শ্রমিক প্রতি পঞ্জিকা বর্ষে পূর্ণ বেতনে ১০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি পেয়ে থাকেন, চা-শ্রমিকের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। অন্য সকল খাতে প্রতি ১৮ কর্মদিবসের জন্য শ্রমিকেরা ১ দিন অর্জিত ছুটি পেয়ে থাকেন, যা চা-বাগানে ২২ কর্মদিবসের জন্য ১ দিন। অন্য সকল খাতে দুই বছর চাকরি পূর্ণ হলে ভবিষ্য তহবিলে মালিকপক্ষের প্রদেয় অংশ সম্পূর্ণ পাবেন, চা-শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ হবার পর প্রাপ্য হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফার ৫ শতাংশের ৮০ শতাংশ শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলে ও বাকি ২০ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে প্রদেয় হবে। কোনো চা-বাগানে এই নিয়ম মানা হয়, মালিকদের মুনাফার অংশ শ্রমিকরা পায় এমন কোনো তথ্য নেই। শ্রম আইন অনুযায়ী যে গ্রæপ বিমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা চা-বাগানে মানা হয় না। আইনানুযায়ী কোনো শ্রমিক তিন মাস সন্তোষজনক শিক্ষানবিশকাল অতিক্রম করার পর স্থায়ী হিসেবে নিয়োগ পাবেন, চা-বাগানে তা মানা হয় না। পাঁচ-ছয় বছর চাকরি করেও চাকরি স্থায়ী হয়নি এমন উদাহরন শত শত। কারণ, স্থায়ী হলে শ্রমিকরা নির্ধারিত মজুরিসহ অন্য সুবিধাসমূহ প্রাপ্য হবেন। স্থায়ী হওয়া শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও আইডি কার্ড দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না। নিয়োগপত্রের বিকল্প সি-ফরম দেওয়ার নিয়ম থাকলেও একটি জরিপে দেখা যায় ৯৩ শতাংশ স্থায়ী হিসেবে কর্মরতদের কোনো নিয়োগসংক্রান্ত নথি দেওয়া হয় না।
এত বঞ্চনা তবুও চা-শ্রমিকরা বাগানেই পড়ে আছেন কেন?
শ্রমিকদের দাবি ৩০০ টাকা মজুরি এবং লাগাতার আন্দোলন দেখে অনেকেই বলছেন, এত যদি বঞ্চনা তাহলে চা-শ্রমিকরা অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নেয় না কেন? তারা চা-শ্রমিকদের জীবন এবং সংস্কৃতি, ভাষা-খাদ্যাভ্যাস, আত্মীয়তার বন্ধন এবং শত বছর ধরে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রভাব বিবেচনা করছেন না। ১৮৫৪ সাল থেকে ২০২২ সাল। এই দীর্ঘ সময় ধরে যে পরিবেশে তাদেরকে রাখা হয়েছে তাতে তার সংস্কৃতিগতভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এখানেই তাদের পূর্বপুরুষের বাস, এখানেই তারা জন্মেছেন এবং মরছেন। এই চা-বাগান ছেড়ে তারা কোথায় যাবেন আর বৃহত্তর সমাজ তাদেরকে কি গ্রহণ করবে? এই চিন্তা তাদেরকে মাটি কামড়ে বাগানেই পড়ে থাকতে বাধ্য করে। মালিকরা যথার্থই বলেছে, চা-শ্রমিকরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চা-বাগানেই জড়িয়ে থাকে। এটাই চা-শ্রমিকদের অসহায়ত্ব আর বাগান মালিকদের শক্তি।
কী দিয়ে কী পায়, চা-শ্রমিকরা?
দিনে কমপক্ষে ২৩ কেজি চা পাতা তোলে একজন চা-শ্রমিক। চা পাতাকে পাঁচ ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে চা উৎপাদন করা হয়। এতে গড়ে ৪ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ১ কেজি চা উৎপাদন হয়। সাড়ে ৫ কেজি চায়ের নিলাম মূল্য কমপক্ষে ১১০০ টাকা। ১২০ টাকা মজুরি, গড়ে ৪৬ টাকা রেশন, ৭ টাকা ঘর ভাড়া এবং অন্যান্য ভাতাসহ ১৮৫ টাকা দিয়ে থাকে মালিকরা। বাগানের ইজারা, বাগান ব্যবস্থাপনা খরচ, চা প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ, বাজারজাতকরনের খরচ আর চা-শ্রমিকদের মজুরি এসব মিলেই তো চায়ের উৎপাদন খরচ। অন্যান্য সব খরচ দেয়ার পর যা বাকি থাকে সেটাই চা-শ্রমিকদের মূল্য সংযোজন। শ্রমিকরা চা উৎপাদনে যতখানি মূল্য সংযোজন করেছে তার পুরোটা চায়নি। তাদের চাওয়া ছিল ৩০০ টাকা দৈনিক মজুরি। শ্রমিকের মজুরি ৩০০ টাকার সাথে ১০০ টাকা ভাতাসহ আনুষঙ্গিক বিষয় যুক্ত করলে শ্রমিকের জন্য খরচ দাঁড়াবে ৪০০ টাকা। ব্যবস্থাপনা খরচ, বিপণন খরচ ৪০০ টাকা ধরলেও প্রতিজন প্রমিক প্রতিদিন ৩০০ টাকা মালিককে মুনাফা এনে দেবে। ফলে শ্রমিকের প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুরি দিলে মালিকের মুনাফা কিছুটা কমবে কিন্তু লোকসান হবে না। চা উৎপাদনে বাংলাদেশের পাশের দেশ নেপাল, ভারত কিংবা এই অঞ্চলের দেশ শ্রীলঙ্কা সবার তুলনায় বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। ফলে চা-শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুরি দিলে আন্তর্জাতিক বাজার বা জাতীয় বাজারে লোকসানের আশঙ্কা নেই। বরং এর ফলে চা- শ্রমিকের জীবনমান কিছুটা উন্নত হতে পারতো।
একটা বিষয় খুবই ভাবনার উদ্রেক করে। বাগানে উৎপাদিত চা এর ৭৫ শতাংশ বিক্রি হয় সাধারণত নিলামে। নিলামে চায়ের দাম বাড়ছে না। ২০০ টাকা কেজির নিচেই থাকছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু বাজারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজির নিচে চা পাওয়া যায় না। নিলামে চায়ের দাম কম রাখার উদ্দেশ্য কী? মালিকদের লাভ কম দেখানো, শ্রমিকদের মজুরি কম দেয়া নাকি চায়ের সিন্ডিকেট করে বাজারকে বড় মালিকদের নিয়ন্ত্রণে রাখা?
আন্দোলনে উন্মোচিত হলো অনেক কিছু
চা-শ্রমিকদের এই আন্দোলন উন্মোচিত করে দিয়েছে চা-শ্রমিকদের জীবনের বঞ্চনা। চা বাগানের নীরব কান্নার শব্দ শুনেছে দেশের মানুষ। তারা সংহতি জানিয়েছেন, পত্রিকায় লিখেছেন, দাঁড়িয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকদের পাশে। ফলে এই আন্দোলন বাগান থেকে রাজপথ হয়ে গণভবন পর্যন্ত পৌঁছেছে। ভিডিও কনফারেন্সে চা-শ্রমিকদের কান্না শুনে প্রধানমন্ত্রীও কেঁদেছেন। কিন্তু মজুরি বেড়ে ৩০০ টাকা হয়নি। ১৭০ টাকার উপরে আর মজুরি বাড়ালেন না অথবা বাড়াতে পারলেন না তিনি। কারণ লাখো শ্রমিকের কান্নার শক্তির চাইতেও মালিকের মুনাফার শক্তি অনেক বেশি। দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকের কান্না বুক ভেজায় কিন্তু পকেট ভরায় না। ফলে এই আন্দোলন শুধু শ্রমিকের দুর্দশাকে উন্মোচিত করেছে তাই নয় তাদের দুর্বলতাকেও দেখিয়ে দিয়েছে। আন্দোলনে দৃঢ়তা, অভ‚তপূর্ব শৃঙ্খলা যেমন লক্ষ্যণীয় তেমনি দীর্ঘদিন ধরে লালন করা মানসিক নির্ভরশীলতাও চোখে পড়ারমতো। তবে একটা বিষয় ঠিক যে, প্রধানমন্ত্রীর কথায় সব মেনে নিলেও অভাব তো দূর হবে না।
এই অভাব ও বঞ্চনা তাদেরকে আবার পথে নামাবে। দ্বন্দ্বের আপাত প্রশমন হলেও আবার তারা আন্দোলনে নামবেন। ফলে একদিকে মালিকের মুনাফা অন্যদিকে চা-শ্রমিকের মান সম্পন্ন জীবনের উপযোগী মজুরি এই দ্বন্দ্বে শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের কর্তব্য।
SLF-260822-1২৬ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে চা-শ্রমিদের ৭ দফা দাবি মেনে নেয়ার দাবিতে সংহতি সমাবেশ ও মিছিল করে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট

ভ্যানগার্ড অক্টোবর ২০২২

Translate »