ঢাকা-তিস্তা রোডমার্চ শুরু-তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলুন

ঢাকা-তিস্তা রোডমার্চ শুরু
তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলুন
উত্তরবঙ্গ তথা বাংলাদেশকে মরুভূমি হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা করুন

19-21 march-21Tista March-190321-1তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের উদ্যোগে ১৯ মার্চ ২০২১ সকাল সাড়ে ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রোডমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় পাঠচক্রের সদস্য নিখিল দাস ও জুলফিকার আলী। সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক।
19-21 march-21Tista March-190321-2নেতৃবৃন্দ বলেন, মানব দেহের শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা নদী ও পলি দিয়ে গঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আজ পানির অভাবে মরুকরণের হুমকির মুখে। এই অভাব প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানুষের সৃষ্টি। চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে আসা নদীগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে জালের মতো ছড়িয়ে গেছে। এই নদীগুলোই বাংলাদেশের প্রাণ প্রবাহ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন ও নীতি লঙ্ঘন করে ভারত ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার আগ্রাসী তৎপরতার ফলে পানির প্রবাহ কমে গিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে নদী দখল ও দূষণ। এক সময় দেশে ১ হাজার ২০০টি নদী ছিল। সরকারসমূহের ভ্রান্তনীতি ও দখল-দূষণের কারণে নদী মরে গিয়ে এখন ২৩০-এ নেমে এসেছে। খরা মৌসুমে বেশিরভাগ নদীতেই পানি থাকে না। একসময়ের প্রমত্তা অনেক নদীই এখন খাল-নালায় পরিণত হয়েছে।
19-21 march-21Tista March-190321-6দেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত জলপ্রবাহ নিয়ে এর অববাহিকার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার বর্গ কি.মি.। যার মধ্যে বাংলাদেশে ২০ হাজার বর্গ কি.মি. আর ভারতে ১০ হাজার বর্গ কি.মি.। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কি.মি. উজানে গজলডোবায় বাঁধ দেয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ২০১১ এর পর থেকে পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। খরা মৌসুম আসতে না আসতেই পানি প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে কখনো ৫০০ কিউসেক এর নিচে নেমে যায়। অথচ ঐতিহাসিক গড় (১৯৭৩-১৯৮৫) অনুযায়ী পানির প্রবাহ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক। তিস্তা ব্যারেজের বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে সেচ মওসুমে লক্ষ্যমাত্রা রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী কমান্ড এলাকায় ১ লক্ষ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে যে সেচ সুবিধা প্রদান করা হতো; এখন তা কমে শুধু নীলফামারীতে ৮ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবার কারণে বিকল্প সেচ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
19-21 march-21Tista March-190321-5নেতৃবৃন্দ বলেন, আজ প্রমত্তা তিস্তার এই বেহাল দশা কেন? পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের পরে তিস্তা চতুর্থ বৃহত্তম নদী। উত্তর সিকিমে কৈলাস হ্রদ থেকে শুরু করে হিমালয় পর্বতের বুক চিরে সাপের মতো এঁকে বেঁকে ভারতের জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ছাতনাই দিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে তিস্তা। ৩১৫ কি.মি. দীর্ঘ তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী হওয়া সত্বেও ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে একতরফা বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের জন্য পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না।
19-21 march-21Tista March-190321-4নেতাবৃন্দ আরও বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাসহ ভারত থেকে আগত সকল আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি ভারতের শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে সমস্ত প্রকারে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। বাংলাদেশের বর্তমান ভোট ডাকাতির সরকারসহ অতীতের সকল সরকার নির্লজ্জভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের প্রতি নতজানু থেকেছে। আমাদের শাসক শ্রেণির একাংশ ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র এবং আরেকাংশ হিন্দু রাষ্ট্র বলে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা তুলতে চায়। কিন্তু বাস্তবে ভারত বন্ধু বা হিন্দু রাষ্ট্র নয়, একটি সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। ফলে সা¤্রাজ্যবাদী চরিত্র অনুযায়ী ভারত পাশর্^বর্তী দেশের উপর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক-সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়। সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারে একের পর এক চুক্তি করে যাচ্ছে। অথচ তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং নেপাল-ভুটানের সাথে যোগাযোগের জন্য মাত্র ৩০ কি.মি. করিডোর করতে দিচ্ছে না। তদুপরি সীমান্ত হত্যা, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। বাংলাদেশে নজরদারি করার জন্য উপকূলে রাডার স্থাপন করছে ভারত। তাছাড়া সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর, তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প যা চীন নিজ খরছে সমীক্ষা করে দিয়েছে সেটাও না করতে ভারত বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে। একি বন্ধুত্বের নমুনা!
19-21 march-21Tista March-190321-7নেতৃবৃন্দ বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা আসবেন। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে ভারত সরকার তিস্তা চুক্তি পাশ কাটিয়ে গেছে। এটা একটা ছেলে ভুলানো যুক্তি। কারণ চুক্তি হবে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে। ভারত সরকার আন্তর্জাতিক নীতি লংঘন করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ন্যূনতম স্বার্থ বিবেচনা না করে একের পর এক নদীর পানি প্রত্যাহার করছে। বাংলাদেশের সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক সমস্ত ফোরামে বিষয়টি উপস্থাপন করা। কিন্তু সে ধরনের কোন পদক্ষেপ আজও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাসদসহ বিভিন্ন বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলসমূহের পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের কারোরই কানে এই দাবি প্রবেশ করছে না। কারণ ভোটের রাজনীতির কাছে দেশ, জনগণ, নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ কোন কিছুই গুরুত্ব পায় না। সম্প্রতি তিস্তা ড্রেজিং করে গভীরতা বৃদ্ধি, দুপাড় সংরক্ষণ, পর্যটন, শিল্পায়ন নিয়ে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় পানি আগ্রাসন ও দেশের অভ্যন্তরে প্রকল্পের নামে দুর্নীতি বহাল থাকলে এই প্রকল্পও তিস্তা ব্যারেজের মতো ব্যয়বহুল ব্যর্থতার নিদর্শন হওয়ার আশঙ্কা আছে।
19-21 march-21Tista March-190321-8ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার আর সরকারের নতজানু নীতির প্রতিবাদে এবং তিস্তাসহ সকল নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর পক্ষ থেকে ১৯ মার্চ তিন দিনব্যাপী রোডমার্চ কর্মসূচি শুরু হয়েছে যা ২১ মার্চ নীলফামী জেলার তিস্তা ব্যারেজে গিয়ে সমাপনী সমাবেশের মধ্যদিয়ে শেষ হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, তিস্তা বাঁচাতে, নদী, পানি ও প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে সকল বাম প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, পরিবেশ ও নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আমাদের আহ্বান-আসুন সোচ্চার হই। ভারতের পানি আগ্রাসন ও নদী দখলদারদের রুখে দাঁড়াই। তিস্তা রোডমার্চ কর্মসূচি সফল করি।

Translate »