নারীর মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করুন-সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আহ্বান-
নারীর মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করুন
নারী-শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন

p11১১১তম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর উদ্যোগে ৮ মার্চ ২০২১ সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসু এবং পরিচালনা করেন সংগঠক রুখসানা আফরোজ আশা। সভায় বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয়, ঢাকা নগর সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, কেন্দ্রীয় সদস্য সুস্মিতা মরিয়ম।
বক্তাগণ নারী দিবসের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুঁই কারখানার নারী শ্রমিকেরা ১২/১৬ ঘণ্টা শ্রম, অমানবিক কাজের পরিবেশ, মজুরি বৈষম্য, অভিবাসী ও কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। হাজার হাজার নারীর এ মিছিলে পুলিশ নৃশংস হামলা চালায়। এতে আহত ও গ্রেফতার হন অসংখ্য নারী শ্রমিক। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ইউরোপের দেশে দেশে কারখানার নারী শ্রমিকেরা এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রম সময়ের দাবিতে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক মে দিবসের রক্তাক্ত শ্রমিক অভ্যুত্থান। ১৮৮৯ সালে সর্বহারা শ্রেণির মহান নেতা ফেড্রারিখ এঙ্গেলসের উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। এ সম্মেলনে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন সর্বক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমানাধিকারের দাবি জানান। এ দাবি শ্রমজীবী ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারীদেরকে অনুপ্রাণিত করে। নারী আন্দোলনকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্ডে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯০৮ সালে ভোটাধিকারের দাবিতে নিউইয়র্কের নারী দর্জি শ্রমিকরা ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯০৯ সালে নারী শ্রমিকদের সভায় নারীর ভোটাধিকারের দাবি প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আর্ন্তজাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন বহু সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ৮ মার্চকে নারী দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করেন। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপকার মহামতি লেনিনের উদ্যোগে এ প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহিত হয়। তখন থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে দুনিয়ার দেশে দেশে পালিত হয়ে আসছে।
বক্তাগণ বাংলাদেশে নারী সমাজের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন, নারী দিবস ঘোষণার ১০৯ বছর পরেও আমাদের দেশের নারীরা রাষ্ট্রীয়ভাবেই আইনী বৈষম্যের শিকার হয়ে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত। এখনও সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। ‘সমকাজে সমমজুরি’ আইনে থাকলেও, প্রায় সকল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন নেই। অন্যদিকে সারাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে। ৩ বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধাÑযেকোন বয়সের নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। ঘরে, বাইরে, পথে, গণপরিবহণে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কলকারখানায়, কর্মক্ষেত্রে, শহীদ মিনারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, পাহাড়ে, সমতলে দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে নারীরা ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন না। ধর্ষণ-নির্যাতন এমন মাত্রায় এসে পৌঁছেছে যে আমাদের দেশে কোন নারীর পক্ষে উৎকণ্ঠার বাইরে স্বাভাবিক জীবনযাপন কল্পনার বিষয়ে পরিনত হয়েছে।
বক্তাগণ আরও বলেন, পুঁজিবাদ টিকে থাকে মুনাফার উপর। পুঁজিবাদী সমাজে নারীর শ্রম সস্তা আর তার দেহ বাজারের পণ্য; দুই-ই মনুফার উৎস। নারীকে তারা অধস্থন করে রাখতে চায়, তারা চায় না নারী তার অধিকার আদায়ে সরব হোক, যেন তাদের মুনাফার সা¤্রাজ্য ধ্বসে না পড়ে। সেজন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি এবং তাদের দোসর বুর্জোয়া মালিক শ্রেণি নারী দিবসের সংগ্রামী চেতনাকে ভুলিয়ে দিতে চাই। তারা নারী দিবসকে কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবশিত করতে চায়।
নারী দিবসের সংগ্রামী চেতনাকে উর্দ্ধে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মুনাফাভিত্তিক ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা নারীকে অধিকার দেয় না, মর্যাদা দেয় না; পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখে। বক্তাগণ এক নতুন মানবিক সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে প্রত্যেক মানুষ পাবে তার মানবিক অধিকার ও মর্যাদা; প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন তথা সামাজিক সুবিচার; যা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও অঙ্গিকার। আন্তর্জাতিক নারীদিবসের চেতনার মূলেও ছিল শোষণ-বৈষম্যহীন সাম্য সমাজ গড়ার আহ্বান। সমাবেশ থেকইনম্ন লিখিত দাবি জানান হয়-

  • সারাদেশে নারী ও কন্যা শিশু হত্যা, ধর্ষণ, ফতোয়া, যৌতুক, উত্ত্যক্তকরণসহ ঘরে-বাইরে সর্বত্র সকল প্রকার নারী নির্যাতন রুখে দাঁড়ান। ১৮৬১ সালের ধর্ষণ আইন পরিবর্তন করে যুগোপোযোগী করতে হবে। স্বাক্ষ্য আইনে ধর্ষিত নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করার বিধান বাতিল করতে হবে।
  • কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে ও স্তরে সমকাজে নারী-পুরুষের সমমজুরি নিশ্চিত ও গৃহ শ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত ও ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু এবং সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে আপত্তি তুলে নিতে হবে।
  • গৃহস্থালি কাজকে অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, জিডিপি’র হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জেলায় জেলায় দুঃস্থ নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করে সকল প্রতিষ্ঠানে ৬ মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর করতে হবে।
  • ঢাকাসহ সকল নগর ও পৌর এলাকায় সরকারিভাবে ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করতে হবে। নগরে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক গণপরিবহণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করতে হবে। প্রতি উপজেলায় সরকারিভাবে নারী হোস্টেল নির্মাণ করতে হবে।
  • বিজ্ঞাপন-নাটক-সিনেমা-ওয়াজ মহফিলে নারীকে অশ্লীল ও পণ্যরূপে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে।
  • দুঃস্থ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পুনর্বাসন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের বীরগাথা, বেগম রোকেয়া, প্রীতিলতা, জাহানারা ইমাম, লীলা নাগ, সুফিয়া কামাল, ইলা মিত্রসহ মহিয়সী নারীদের জীবন-সংগ্রাম এবং গণ-অন্দোলনে নারীদের ভূমিকা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
  • অপসংস্কৃতি, অশ্লীলতা, পর্নোগ্রাফি ও মাদকের ছোবল থেকে নর-নারী, ছাত্র-যুব সমাজকে রক্ষা করুন, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন, পাঠ্যপুস্তকসহ সর্বত্র সাম্প্রদায়িকীকরণ রোধ করুন।

সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আগামী ১২ মার্চ ২০২১ বিকাল ৩টায় ঢাকার শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণনারী সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শম্পা বসুর সভাপতিত্বে উক্ত সমাবেশে আলোচনা করবেন সিপিবি নারী সেলের আহ্বায়ক লক্ষ্মী চক্রবর্তী, শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর সভাপতি বহ্নিশিখা জামালী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন কণা, ডেফ্যোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিপ্রা মন্ডল।

Translate »