বাণিজ্যের থাবা থেকে সিআরবি রক্ষার আন্দোলন

  •  
  •  
  •  

CRB movementচট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এক অভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। প্রাণ, প্রকৃতিকে বাণিজ্যিক থাবা থেকে রক্ষা করতে প্রতিদিন পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে। এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যখন প্রকাশ পেয়েছে যে, বাণিজ্যিক হাসপাতাল তৈরির নামে চট্টগ্রামের সিআরবি পাহাড়কে পছন্দ করেছে ইউনাইটেড গ্রুপ আর সরকার তাদের জন্য রেলওয়ের জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে। পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে তৈরি হবে বাণিজ্যিক হাসপাতাল। চট্টগ্রামের জনসংখ্যার বিবেচনায় আরও হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা কেউ-ই অস্বীকার করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তিনটিÑজনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা হবে না কেন? হাসপাতালের জন্য সিআরবি পাহাড় এলাকা বেছে নেয়া হলো কেন? বেসরকারি ও ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক হাসপাতালে সাধারণ মানুষ বিকিৎসা কীভাবে পাবে? এই হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা নয়, ধনী মানুষের চিকিৎসা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ ও হতবাক মানুষের প্রশ্ন, ব্যবসার হাত থেকে কী কিছুই রক্ষা পাবে না? নদী, বন, পাহাড়, সমুদ্র সবই বাণিজ্য আর লুণ্ঠনের থাবায় ক্ষতবিক্ষত। এবার নজর পড়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আধার, সৌন্দর্য আর ফুসফুসের মতো স্থান সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং)-এর পাহাড়ের উপর। চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ে স্টেশন, স্টেডিয়াম, লাভ লেইন, টাইগার পাস, বাটালি হিলের মধ্যখানে এক দারুণ সুন্দর জায়গা এই সিআরবি পাহাড়। একে চট্টগ্রাম মহানগরের শ্বাসকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না মোটেই। ১৮৭২ সালে তৈরি করা বন্দরনগরীর প্রাচীনতম ভবন, ১৮৯৯ সালে তৈরি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের মডেল, পাহাড়ের শীর্ষে হাতির বাংলোর পাশে দাঁড়িয়ে একনজরে পুরো চট্টগ্রাম শহর দেখা, সকালে হাঁটা, বিকেলে ঘুরে বেড়ানো, পহেলা বৈশাখসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান, শত বছরের পুরনো বিশাল বিশাল গাছ দেখে বিস্মিত বা মুগ্ধ হওয়া সব মিলে এই পাহাড় চট্টগ্রামবাসীর প্রশান্তি ও ভালোবাসার স্থান। এক অর্থে একে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক বলয়। চট্টগ্রামে কেউ নতুন এলে তাকে নিয়ে সিআরবি পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া এক অবধারিত বিষয় চট্টগ্রামবাসীর কাছে।
শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, সিআরবি এলাকা জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে। এর পাশেই আছে হাসপাতাল কলোনি যা আব্দুর রব কলোনি নামে পরিচিত। সেখানে আছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব-সহ ১০ জন শহীদের কবর। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে বিসর্জন দেয়ার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বর্তমান সরকার। এখন অতীতের স্মৃতি রক্ষার চাইতে ভবিষ্যতের ব্যবসা তাদের কাছে অনেক লোভনীয় বিষয়। তাই সংবিধানের ধারাকে উপেক্ষা করতেও তারা দ্বিধা করছে না। সংবিধানের ১৮-ক ধারা অনুসারে রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবে। সিআরবিতে কোন ধরণের স্থাপনা তাই সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
জনগণের অসন্তোষ ও আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এখন নতুন কৌশল অবলম্বন শুরু হয়েছে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে ইউনাইটেড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা প্রচার করা শুরু করেছে তারা। আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে আবেগের ব্যবহার এক পুরনো কৌশল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বীরকন্যা প্রীতিলতার নামে ছাত্রী হলের নামকরণের দাবিতে যখন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তখন আন্দোলকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এধরনের নামের প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু তখন সেটা ছিল রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি। কিন্তু এখন চিকিৎসা ব্যবসায়ীর মুনাফা অর্জনের কাজ আবেগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদেরকে রক্ষা করতে আবেগের ব্যবহার করার এ এক পুরনো কৌশল। ইতিমধ্যে আন্দোলনকে বিভক্ত ও দুর্বল করার জন্য বিভিন্নমুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রশ্ন, রাষ্ট্রের সম্পদ, দেশের ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষের শ্বাস নেবার জায়গা সব কিছু কী গৌণ হয়ে যাবে মুনাফা শিকারিদের কৌশলের কাছে?
পাহাড়, নদী-সাগর মিলে চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর স্থান। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কেউ কেউ বলে উঠবেন একটু সংশোধন করে বলুন। লুণ্ঠন, দখল ও দূষণে অবস্থায় এখন যা দাঁড়িয়েছে, কিছুদিন পর বলতে হবে এক সময় খুব সুন্দর জায়গা ছিল। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় চাকতাই খালের মরণ দশার কারণে জলাবদ্ধতা, পাহাড় কেটে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্ধর্য নষ্ট করার ফলে চট্টগ্রাম মহানগর এখন যানজট ও জলজটের শহরে পরিণত হয়েছে। এ জলাবদ্ধতায় পড়ে মানুষের দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাও এখানে ঘটছে। এরপর জনগণের শ্বাস নেয়ার জায়গা সিআরবি পাহাড় এখন লুণ্ঠনকারীদের সর্বশেষ টার্গেট। প্রকৃতি, পরিবেশ, ঐতিহ্য ধ্বংসের সর্বনাশা প্রক্রিয়া বন্ধ করতে এবং দেশ ও জনগণের এই সুন্দর প্রাকৃতিক সম্পদকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুনাফা শিকারিদের হাতে ছেড়ে দেয়ার যে কোন অপচেষ্টা রুখে দাঁড়াতেই হবে।


  •  
  •  
  •  

Translate »