ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় তান্ডব অগ্নিসংযোগের দায় প্রধানত হেফাজতের-আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কেন বাঁধা দেয়নি তার দায় সরকারেরবাম গণতান্ত্রিক জোট

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে
বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় তান্ডব অগ্নিসংযোগের দায় প্রধানত হেফাজতের
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কেন বাঁধা দেয়নি তার দায় সরকারের

LDA-Press Conference-0080421-2২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ ২০২১ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হফাজতের ডাকা বিক্ষোভ ও হরতাল চলাকালে পুলিশী হামলায় হত্যাকা- ও হেফাজতের তান্ডবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা,, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের প্রকৃত ঘটনা জানতে বাম জোটের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল গত ৪ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়ীয়া পরিদর্শনে যান। প্রতিনিধি দলে জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ এর নেতৃত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন সাইফুল হক, আব্দুল্লা আল কাফি রতন, বাচ্চু ভুইয়া। প্রতিনিধি দলের সাথে সিপিবি জেলা নেতা শাহরিয়ার মো. ফিরোজ, সাজিদ হোসেন ও এডভোকেট জামাল হোসেনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধি দলের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সফরের অভিজ্ঞতা ও করণীয় দাবি তুলে ধরতে ৮ এপ্রিল ২০২১ সকাল সাড়ে এগারটায় মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলানায়তনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাম জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা কমরেড মানস নন্দী, ইউসিবিএল’র কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের বাচ্চু ভুইয়া, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের হামিদুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ, বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আব্দুল আলী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তান্ডব ’৭১ এর পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ এর ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তান্ডবের জন্য প্রধানত হেফাজতে ইসলামই দায়ী। কিন্তু হেফাজতের তান্ডবের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসন কেন নিষ্ক্রিয় ছিল? গোয়েন্দা সংস্থাগুলি কি সরকারকে কোন আগাম সংবাদ দেয়নি? আগের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পরেও কেন তান্ডব? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, হাটহাজারীতে আগেও এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কেন সরকার পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় নি? বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বার বার ডাকার পরও সময় মতো কেন পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস আসেনি? এর জবাব সরকারকে দিতে হবে। ফলে তান্ডব ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার দায় সরকারও এড়াতে পারবে না।
সংবাদ সম্মেলন থেকে নেতৃবৃন্দ ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন এবং উক্ত দাবি বাস্তবায়নের দাবি জানান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরেজমিন পরিদর্শন করে নেতৃবৃন্দ যা প্রত্যক্ষ করেছে এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে যা জানতে পেরেছে তার ভিত্তিতে বাম জোট সংবাদ সম্মেলন থেকে নিম্নোক্ত দাবি তুলে ধরা হয়।
১. ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৬-২৮ মার্চ সাম্প্রদায়িক নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধীতা করে হেফাজতের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হবার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
২. ২৬-২৮ মার্চ বিক্ষোভ হরতাল চলাকালে ৫০ এর অধিক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির উপাসনালয় ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের ঘটনার সাথে জড়িতদের এবং উস্কানিদাতাদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দায়ীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
৩. জেলার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য ডিসি, এসপিসহ সংশ্লিষ্টদের অপসারণ করতে হবে। কেন নিষ্ক্রিয় ছিল তদন্ত করে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৪. ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মধ্যে এখনও আতংক ও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
৬. আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন, মন্দির, সাংস্কৃতিক ক্লাবসহ ক্ষতিগ্রস্থ বেসরকারি স্থাপনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে উপরোক্ত দাবি আদায়ে এবং সরকারের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সকল বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ এর ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগে ভস্মিভূত স্থাপনা পরিদর্শন, স্থানীয় জনসাধারণ ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা এবং করণীয় সম্পর্কে দাবিনামা তুলে ধরতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য
মৈত্রী মিলনায়তন (৫ম তলা), মুক্তি ভবন, ২ মনিসিংহ সড়ক, পুরানা পল্টন, ঢাকা
০৮ এপ্রিল ২০২১, বৃহস্পতিবার

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে আপনাদের জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা। দেশের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিষয় সম্পর্কে বাম গণতান্ত্রিক জোটের বক্তব্য দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
আপনারা জানেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র নেতা আরএসএস এর প্রচারক নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো ও তার আগমনের বিরোধীতা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুব সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। ছাত্র-জনতার এই বিক্ষোভে পুলিশ ও সরকারি ছাত্র সংগঠন উপুর্যুপরি হামলা ও নির্যাতন চালায় এতে বামপন্থি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা আহত হয়। মোদির আগমনের বিরোধীতা করে ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচিতে পুলিশ ও সরকার দলীয় ছাত্র যুব সংগঠন বর্বর হামলা, দমন-পীড়ন নির্যাতন ও হত্যাকা- চালায়।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত সরকার-মূলত ভারতের আপামর জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। সোয়া কোটি মানুষকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। এ জন্য বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই ভারতের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সা¤্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী ভারতের শাসকশ্রেণির সরকারগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আশা আকাঙ্খা বিরোধী যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে তার বিরোধীতা ও প্রতিবাদ করার অধিকার স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ভোট ডাকাতির সরকার দেশের মানুষের সেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে ঠেঙাড়ে বাহিনী দিয়ে নির্যাতন দমন পীড়ন করা হচ্ছে। জনগণের বাক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার আজ স্বৈরাচারী শাসনে পিষ্ট। দেশের চলছে এক ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদী শাসন। রক্তে কেনা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবে জনগণকে দূরে সরিয়ে রেখে সরকার ও সরকার দলীয় একটি গোষ্ঠীর উৎসবে পরিণত করেছে। নরেন্দ্র মোদির সফর নির্বিঘœ করতে স্মৃতিসৌধে জনসাধারণের প্রবেশ সীমিত করেছে, ঢাকা শহরে সভা-সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাস্তবে দেশে এক দমবন্ধ করার পরিবেশ তৈরি করেছে। এটা সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের নগ্ন প্রকাশ। বদ্ধ জলাশয়ে যেমন শেওলা আবর্জনা জমে, তেমনি গণতন্ত্রহীন পরিবেশে অন্ধত্ব, ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির প্রসার ঘটে।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
২৬-২৮ মার্চ ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ও বর্বর ঘটনাবলি সরেজমিন প্রত্যক্ষ ও স্থানীয় জনসাধারণের সাথে মতবিনিময় করতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল গত ৪ এপ্রিল ২০২১ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া যান। সেখানে নেতৃবৃন্দ সুর স¤্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন, ভূমি অফিস, টাউন হল, প্রেসক্লাব, পৌরসভা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্লাব, ব্যাংক, এশিয়া ভবন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ অফিস, জেলা পরিষদ ভবন, জেলা পরিষদ ডাক বাংলা পরিদর্শন করেন। বাম জোটের প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আব্দুল্লাহ আল কাফী রতন ও গণসংহতি আন্দোলনের সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য বাচ্চু ভূইয়া, স্থানীয় সিপিবি নেতা শাহরিয়ার মোহাম্মদ ফিরোজ, সাজিদ হোসেন, এ্যাডভোকেট জামাল হোসেনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
পরিদর্শনকালে যে ভয়াবহতা ও বিভৎসতা প্রত্যক্ষ করেন তা ’৭১ সালের পাক হানাদার বাহিনীর বর্বতার সাথেই কেবল তুলনা করা যেতে পারে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গনের সম্পূর্ণ ভবনের আসবাবপত্র, ফ্যান, বই পুস্তক, কম্পিউটার, বাদ্যযন্ত্র সবকিছু অগ্নিসংযোগে ভস্মিভূত করা হয়েছে। ভূমি অফিসে সকল দলিল দস্তাবেজ, রেকড পত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রস্টান নির্বিশেষে সকল জনসাধারণের জমির কাগজপত্র নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। এতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়বে। এমনকি ভূমিদস্যুদেরও কোন ষড়যন্ত্র এতে আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার টাউন হলটি ছিল অত্যাধুনিক, সেখানে ১০০ টন এসি লাগানো ছিল। ওই হলে সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠন অনুষ্ঠান করতো। পৌরসভার রেকর্ড রুম, একাউন্টস অফিসসহ ভবনটি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ১৫৪ বছরের পৌরসভার সকল রেকর্ডপত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে করে পৌরসভার সেবা কার্যক্রম এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। ভবনে থাকা কর্মকর্তা কর্মচারীরা আগুন লাগানোর পর ঝুঁকি নিয়ে লাফ দিয়ে বেরুতে গিয়ে অনেকেই মারাত্মক আহত হয়েছে। জেলা পরিষদ ভবনেও সকল রুম ভাংচুর করে কাগজপত্র, কম্পিউটার, গাড়ী, মোটর সাইকেল ভস্মিভূত করা হয়েছে। জেলা পরিষদের ডাক বাংলায়ও একইভাবে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রেল স্টেশনে অগ্নিসংযোগের ফলে সেখানে স্টেশন কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক দামি রেলের কন্ট্রোল প্যানেল সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়েছে। নথিপত্র পুড়েছে এমনকি টিনের চাল ও ব্যবহার অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। আজ পর্যন্ত স্টেশনটি সচল করা যায়নি।
নেতৃবৃন্দ পরিদর্শনকালে পৌরসভার প্রকৌশলী, জেলা পরিষদের সচিব, স্থানীয় জনসাধারণ ও সাংবাদিকবৃন্দ প্রতিনিধি দলকে বলেন, হেফাজতি তান্ডবে যখন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জ্বলছিল তখন আশ্চার্যরকমভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল জেলার পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ডিসিসহ সিভিল প্রশাসন।
এমনকি টাউন হল, পৌরসভা থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে অবস্থিত ফায়ার সার্ভিসও আগুন নেভাতে কোন পদক্ষেপ নেয়নি, বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও। জেলা পরিষদ সচিব বলছেন, তিনি নিজে এসপি, ডিসি, সরাইলে বিজিবি ক্যাম্পে ফোন করে জানিয়েছেন। তার পরেও যথা সময়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন যথাসময়ে পদক্ষেপ নিলে এতো ক্ষয়ক্ষতি হতো না বলে মনে করে স্থানীয় জনগণ।
পরিদর্শনকালে আমাদের প্রতিনিধি দলের কাছে মনে হয়েছে এ ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত ও পেশাদার সন্ত্রাসীদের কাজ। কোন দাহ্য পদার্থ ছাড়া এ ধরনের অগ্নিকা-ের এবং ভস্মিভূত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে না। স্থানীয় জনগণেরও একই মত। আমাদের প্রতিনিধি দল যখন স্থাপনাসমূহ পরিদর্শন করছিলেন তখনও সেখান থেকে পোড়া গন্ধ ভেসে আসছিল। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন যে, হেফাজতের এই তান্ডবের সাথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ এবং জামাত শিবিরের কিছু কিছু লোক অংশ নিয়েছে।
হেফাজতে ইসলাম এ ধরনের তান্ডব করতে পারলো কেন বা কাদের আশ্রয়ে বা মদদে? দীর্ঘদিন ধরে হেফাজতের এই উগ্র সাম্প্রদায়িক আস্ফালনের এবং সহিংসতার দায় কোন মতেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এড়াতে পারে না। কারণ ২০০৯ সালে নারী নীতি প্রণয়নের সময়ে তার বিরোধীতা করে ২০১০ সালে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ। তারা নারী নীতি বাতিল চেয়ে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে। সরকার মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে নারী নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে আসে। তার পরে হেফাজতকে সরকার গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে মাঠে নামায় এবং হেফাজত শাপলা চত্বরে জমায়েত করে সারা ঢাকা শহরে তান্ডব চালায়। তাদের ১৩ দফা মেনে প্রগতিশীল যুক্তিবাদী লেখকদের লেখা পাঠ্য পুস্তক থেকে বাদ দিয়ে পাঠ্য পুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ করে। বিমানবন্দরের প্রবেশ মুখে লালন ভাস্কর্য্য স্থাপনে বাধা, হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে থেমিসের ভাস্কর্য্য স্থাপনে বিরোধীতা করে। সরকার তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে ভাস্কর্য্য স্থাপন থেকে বিরত থাকে। হেফাজতের কাছে নতি স্বীকার করে তাদের দাবি শুধু মেনেই নেয়নি চট্টগ্রামে রেলওয়ের ৩০ কোটি টাকার সম্পত্তি হেফাজতের মাদ্রাসাকে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী কওমী মাদ্রাসার দাউরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমর্যাদার ডিগ্রী সনদ দেয়ায়, হেফাজত প্রধানমন্ত্রীকে কওমী জননীও উপাধি দেয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও যখন ঘোষণা করেন মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবেন এবং ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা ব্যয় করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করছেন। এসব কারণেই হেফাজত ও মৌলবাদী শক্তি সহিংসতা ও বর্বরতার ঔদ্ধত্য দেখাতে পারছে।
এ ছাড়াও এটা তো সবারই জানার কথা যে দুধ কলা দিয়ে সাপ পোষলে কোন না কোন সময়ে ছোবল দেবেই। ক্ষমতার মোহে গদি রক্ষার জন্য ধর্মান্ধ শক্তির পৃষ্ঠপোষকতার ফল এখন আওয়ামী সরকারকে পেতে হচ্ছে। লালন, থেমিস ভাস্কর্য্য স্থাপনে পিছিয়ে আসার ফলেই এখন শেখ মুজিব ভাস্কর্য্য ভাঙার ঔদ্ধত্য দেখাতে পারছে। এবং সারাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে। যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিস্যাত করতে চলেছে। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার স্বার্থে মৌলবাদী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
বাম গণতান্ত্রিক জোট মনে করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় তান্ডব, অগ্নিসংযোগের ঘটনার দায় প্রধানত হেফাজতে ইসলামের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এ অগ্নিসংযোগ তান্ডব চালানোর সময় কেন বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসন বাধা দেয়নি। পাশেই ফায়ার সার্ভিস থাকা সত্ত্বেও কেন আগুন নেভাতে এলো না? সরকার কি তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্বার্থে হেফাজতকে এ ধরনের তান্ডব নির্বিঘ্নে করার সুযোগ দিয়েছিল? এই বিষয়গুলোর উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী হেফাজতের ২৬, ২৭ মার্চ বিক্ষোভ ও ২৮ মার্চ এর হেফাজতের ডাকা হরতাল কর্মসূচি চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, হাটহাজারীতে পুলিশের গুলি বর্ষণে ১৭ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। হাটহাজারীতে থানা আক্রমণ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় সুর স¤্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন, রেল স্টেশন, ভূমি অফিস, প্রেসক্লাব, পৌরসভা, টাউন হল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্লাব, ব্যাংক এশিয়া, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ অফিস, জেলা পরিষদ ভবন, জেলা পরিষদ ডাক বাংলা, পুলিশ ফাঁড়ি, মুক্তমঞ্চ, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, ম্যুরাল, কালিমন্দির, আনসার ব্যাটালিয়ান অফিসসহ ৫০ এর অধিক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাংচুর অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। আমরা সকল হত্যাকা-, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে সকল ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা অত্যান্ত জরুরি বলে আমরা মনে করছি। বামপন্থি সংগঠনসমূহের মোদির আগমনের বিরোধীতা এবং হেফাজতের বিরোধীতা কোনক্রমেই এক উদ্দেশ্যে নয়। আমরা বামপন্থিরা মোদির আগমনের বিরোধীতা করেছি, মোদি ব্যক্তিগতভাবে সাম্প্রদায়িক এবং একটি সাম্প্রদায়িক দলের নেতা, ভারতে উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতা উসকে দিয়ে ভারতের জনগণের অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে বিনষ্ট করছে। সি এ এ, এন আর সি’র মাধ্যমে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অসৎ পাঁয়তারা করছে। ইতিপূর্বে গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে গোধরাকা- ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে। তাছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী ভারত রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সাথে অমিমাংসিত বহু বিষয়ে নিষ্পত্তি না করে বরং জিইয়ে রেখে আমাদের কাছ থেকে নানা সুবিধা একের পর এক আদায় করে নিচ্ছে। সামীন্ত হত্যাকা- বন্ধ করছে না, বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে না, তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করছে। নেপালের সাথে সংযোগের জন্য মাত্র ৩০ কি.মি. পথ করিডোর হিসেবে দিচ্ছে না, ভূটানের সাথেও যোগাযোগের জন্য করিডোর দিচ্ছে না।
সীমান্তে ফেনসিডিলের কারখানা এবং পাচার বন্ধ করছে না অথচ আমাদের কাছ থেকে সড়ক পথে ট্রানজিট, নৌ ট্রানজিট, বন্দরসহ সব কিছুই গ্রহণ করছে উপরন্তু আমাদের উপকূলে নিরাপত্তার নামে রাডার বসিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ ছাড়াও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনে বাধা প্রদান, তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প না করার জন্য চাপ প্রয়োগ, আমাদের টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে প্রদর্শনে নানা করারোপের মাধ্যমে বাধাদান, এন্টি ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানিতে বাধা ইত্যাদি নানা প্রকারে আমাদের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব করতে ভারত মরিয়া। আমাদের দেেেশর শাসক শ্রেণিও গত ৫০ বছর ধরেই ভারতের কাছে নতজানু থেকে দেশ পরিচালনা করে আসছে। মোদির আগমনের বিরোধীতা আমরা বামপন্থিরা করছি উপরোক্ত কারণে।
অপরদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী হেফাজতে ইসলাম মোদির আগমনের বিরোধীতা করেছে সম্পূর্ণ মুসলিম সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোন থেকে। ফলে বামপন্থিদের মোদির বিরোধীতা আর হেফাজতসহ অন্যান্য মৌলবাদীদের মোদি বিরোধীতা কোন মতেই এক হতে পারে না।
তাছাড়া ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা জোরদার হলে বাংলাদেশে মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তির লাভ আবার বাংলাদেশে মুসলিম সাম্প্রদায়িক জোরালো হলে ভারতের হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির লাভ হয়। এরা একে অপরের সহযোগি। আমরা বামপন্থিরা মুসলিম ও হিন্দু উভয় সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সরেজমিন পরিদর্শন করে যা প্রত্যক্ষ করেছি এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে যা জানতে পেরেছি তার ভিত্তিতে আমরা নিম্নোক্ত দাবি তুলে ধরছি-
১. ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় ২৬-২৮ মার্চ সাম্প্রদায়িক নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধীতা করে হেফাজতের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হবার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
২. ২৬-২৮ মার্চ বিক্ষোভ হরতাল চলাকালে ৫০ এর অধিক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির উপাসনালয় ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের ঘটনার সাথে জড়িতদের এবং উস্কানিদাতাদের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দায়ীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
৩. জেলার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য ডিসি, এসপিসহ সংশ্লিষ্টদের অপসারণ করতে হবে। কেন নিষ্ক্রিয় ছিল তদন্ত করে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।
৪. ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার মানুষের মধ্যে এখনও আতংক ও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
৬. আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন, মন্দির, সাংস্কৃতিক ক্লাবসহ ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিগত স্থাপনার মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
আমরা এ প্রেক্ষাপটে উপরোক্ত দাবি আদায়ে এবং সরকারের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সকল বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।

শুভেচ্ছান্তে

বজলুর রশীদ ফিরোজ
সমন্বয়ক
বাম গণতান্ত্রিক জোট
কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ

Translate »