সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড : ৫২ শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে স্কপ গঠিত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ

  •  
  •  
  •  

শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ ও কর্মসূচি

SKOPরূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় সজীব গ্রুপের মালিকানাধীন হাসেম ফুড লি.-এর সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড এবং ৫২ জন শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে স্কপের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ, দাবি ও কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে ৫ সেপ্টেম্বর ’২১ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে (নসরুল হামিদ মিলনায়তন) সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শ্রমিকনেতা সহীদুল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন যুগ্ম সমন্বয়ক কামরুল আহসান, স্কপের পক্ষে লিখিত বক্তব্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট পাঠ করেন অপর যুগ্ম সমন্বয়ক আনোয়ার হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন শ্রমিকনেতা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, রাজেকুজ্জামান রতন, সাইফুজ্জামান বাদশা, চৌধুরী আশিকুল আলম, নঈমুল আহসান জুয়েল, আহসান হাবিব বুলবুল, আজিজুন নাহার, শামীম আরা, ফিরোজ হোসাইন, আব্দুল ওয়াহেদ, সরদার খোরশেদ, ইমাম হোসেন খোকন, খালেকুজ্জামান লিপন, রফিকুল ইসলাম, কনক বর্মন, মোহা. রফিক, কাজী রুহুল আমিন, মন্জুরুল ইসলাম মন্জু, সেলিম মাহমুদ, সাইফুল ইসলাম শরীফ, খোরশেদ আলম, নিহত শ্রমিক রহিমা বেগমের স্বামী মোহা. সেলিম ও মেয়ে লিপা আক্তার প্রমুখ।
আপনারা জানেন ৮ জুলাই ২০২১ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় সজীব গ্রুপের মালিকানাধীন হাসেম ফুড লি.-এর সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড এবং ৫২ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় এই ধরণের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং শ্রমিকের মৃত্যু এটাই প্রথম নয়। এ যাবত ছোট বড় প্রায় ২৫০টি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, বয়লার বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন ঘটনায় ৫ হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক আহত, পঙ্গুত্ববরণ করে মৃত্যু যন্ত্রণায় ধুঁকছে। এসব ঘটনার মধ্যে রানা প্লাজা ধস এবং তাজরিন সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বিশ্ব বিবেক নাড়া খেলেও বাংলাদেশের মালিক, সরকারি কর্তৃপক্ষ যথাযথ ভূমিকা পালন না করায় এখনও কর্মক্ষেত্র শ্রমিকের জন্য নিরাপদ হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে আরও কোন ঘটনায় শ্রমিকের জীবনহানির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অতীতের ঘটনাগুলোতে যেসমস্ত দুর্বলতার কথা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে এই সব ঘটনাকে দুর্ঘটনা না বলে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলাই সঙ্গত। কারণ যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করা এবং পরিচালনা করার কথা বলা হয়েছে তা প্রতিপালন না করলে দুর্ঘটনার দায় কর্তৃপক্ষকে নিতেই হবে।
প্রতিটি দুঃখজনক ঘটনার পর বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ফলে ঘটনার সঠিক কারণ, কারখানা ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা, অগ্নিনির্বাপণের যথাযথ প্রস্তুতি, দুর্ঘটনাবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও উদ্ধার প্রস্তুতির দুর্বলতা, নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং শ্রম আইন, বিল্ডিং কোড মানা হয় কিনা সে ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কী ছিল সে বিষয়ে কোন কিছুই জানা যায় নাই। এতো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী মালিকপক্ষের কাউকে শাস্তি পেতে দেখা যায় নাই। বরং একটি ঘটনার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতে আর একটি ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে। মর্মান্তিক এসব ঘটনায় কিছুদিন আলোড়ন ঘটে তারপর ঘটনা চাপা পড়ে যায়।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-(স্কপ) প্রতিটি ঘটনায় সঠিক তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু বিশেষ ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়া এ যাবত আর কোন কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। বাস্তবে দেশি-বিদেশি মালিক, ক্রেতা এবং বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্র এবং প্রশাসন যতটা তৎপর শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার ব্যাপারে তেমন দায়িত্ব পালন করতে আমরা দেখি নাই।
সম্প্রতি সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকা-ের পর সেই পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে বলে আমাদের আশঙ্কা। সে কারণে স্কপের পক্ষ থেকে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে, শ্রমিক কর্মচারী, কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় করে তাদের পর্যবেক্ষণ লব্ধ এই প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেছে। আমরা আগেই ঘোষণা করেছিলাম সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এই প্রতিবেদন ও সুপারিশ আমরা প্রকাশ করবো। ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হচ্ছে।
আমাদের পর্যবেক্ষণে সেজান জুস কারখানায় নানা গুরুতর অসংগতি দৃশ্যমান হয়েছে যার দায় মালিকপক্ষ, অগ্নি নির্বাপণ কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রশাসন, শ্রম দপ্তর, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর কোনভাবেই এড়াতে পারে না। বিশেষ করে ভবন নির্মাণে ত্রুটি, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা বিধি অনুযায়ী পর্যাপ্ত না থাকা, প্রতিটি ফ্লোর তালাবদ্ধ করে রাখা, শিশু শ্রমিক নিয়োগ, মালিক পক্ষের শ্রম আইন ও বিধি মেনে না চলা, পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী পরিদর্শন কাজে অবহেলা, শ্রমিকদের স্বল্প মজুরিতে কাজ করানো, ট্রেড ইউনিয়ন না থাকা এই সব ত্রুটি এবং অবহেলা সেজান জুস কারখানার অগ্নিকা-কে যেন অনিবার্য করে তুলেছে। ফলে মালিকের মুনাফার লোভে শ্রমিকের জীবনকে উপেক্ষা করা এবং শ্রম আইন তোয়াক্কা না করা, অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেয়া এবং যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন তাদের সবাইকে বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এবং কারখানায় কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনার নামে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটতেই থাকবে। স্কপ-এর পক্ষ থেকে সেজান জুস অগ্নিকা-ের ঘটনার পর তাই নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হচ্ছে-
১। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক কারণ উদঘাটনের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
২। সেজান জুস কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী মালিকপক্ষ এবং কর্তব্য অবহেলার জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
৩। মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ী আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হাই কোর্টের নির্দেশনা এবং রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ক্ষতিপূরণের হারকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।
৪। ক্ষতিপূরণের একই হারে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫। ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকা অবস্থায় কর্মহীন শ্রমিকদের মজুরি প্রদান করতে হবে।

স্কপ এর কর্মসূচি :

১। সেজান জুস কারখানা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৫ দফা দাবি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করার দাবিতে ১১ সেপ্টেম্বর সারাদেশে জেলায় জেলায় শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে।
২। ১৯ সেপ্টেম্বর দায়ীদের শাস্তির দাবিতে ঢাকায় শ্রম মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং জেলায় জেলায় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।
৩। ২৪ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপ এর শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য শোনার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ। আমরা আশা করি আপনাদের মাধ্যমে আমাদের বক্তব্য ও দাবি দেশের জনগণ, শ্রমজীবী মানুষ এবং রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাবে।


  •  
  •  
  •  

Translate »