spb-logo

ই-রিক্সা বিধিমালা সংশোধনে রিক্সা, ব্যাটারি রিক্সা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের ৯ দফা

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
জাতীয় প্রেসক্লাবে রিক্সা, ব্যাটারি রিক্সা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের সংবাদ সম্মেলন

বর্তমানে রাস্তায় চলাচলরত গাড়ি উচ্ছেদ বা জব্দ করার পরিবর্তে বিধিমালায় কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সময়সীমা ২ বছর সুনির্দিষ্ট করা, চালকের লাইসেন্স প্রদানের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা, গাড়ির নিবন্ধন-নবায়ন, ফিটনেস সার্টিফিকেট সহজলভ্য ও ফি কমানো, সিটি কর্পোরেশনের সাথে পৌরসভা/উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করাসহ ৯ দফা দাবি বা প্রস্তাবনা যুক্ত করে ই-রিকশার বিধিমালা সংশোধন করার আহ্বান জানিয়ে রিক্সা, ব্যাটারি রিক্সা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ ৩ নভেম্বর সকাল ১১.৩০ টায় জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের নির্বাহী সদস্য আল কাদেরী জয়। উপস্থিত ছিলেন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ইমাম হোসেন খোকন, জনার্দন দত্ত নান্টু। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর শাখার উপদেষ্টা আফজাল হোসেন, এস এম কাদির, সহ-সভাপতি জালাল আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দাউদ আলী মামুন, সদস্য রায়হানউদ্দীন, আখতার হোসেন, মারুফ হোসেন, সেকান্দর আলী, পায়েল আক্তার নুপুর, আব্দুল খালেকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে নেতৃবৃন্দ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের (ই-রিকশা) জন্য বিধিমালা প্রনয়ন করার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে সংগ্রাম পরিষদ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং তার ভিত্তিতে গাড়ির নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স ও রুট পারমিট প্রদানসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। ৬০ লক্ষ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সাথে যুক্ত ৩ কোটি মানুষের এই খাতের জন্য ১৩ বছর পর হলেও প্রথমবারের মত ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য সরকার একটি আনুষ্ঠানিক বিধিমালা প্রনয়ন করার সিদ্ধান্তকে সংগ্রাম পরিষদ প্রাথমিকভাবে স্বাগত জানান। বিধিমালায় ৭ টি অধ্যায়, ২১ টি বিধি ও ৫০ টির অধিক উপ-বিধি ও ৪ টি তফসিল আছে। যা পর্যালোচনা করে একে স্বাগত জানালেও এখানে বেশ কিছু গুরুতর অসংগতি বা অস্পষ্টতা থাকায় তাতে ৯ দফা সুনির্দিষ্ট দাবিনামা বা সরকার প্রণীত ই-রিকশার বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাবনা জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বিধিমালার মাধ্যমে চালককে সুরক্ষা প্রদান, রিক্সা উচ্ছেদের হাতিয়ার হিসেবে বিধিমালা ব্যবহার করা না করা, যে সমস্ত রিক্সা চলছে সেগুলোর কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কমপক্ষে ২ বছর সময় দিতে হবে জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, বিধিমালার তৃতীয় অধ্যায়ের ৬(৩) ধারায় ই-রিক্সা বুয়েট স্বীকৃত আদর্শ গঠন কাঠামো যুক্ত না হলে সেগুলিকে অবৈধ ই-রিক্সা আখ্যায়িত করে সেগুলি বন্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ আদর্শ কাঠামো অর্থাৎ “প্রযুক্তিগত মানদন্ড ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আবশ্যকীয় ডিজাইন স্পেসিফিকেশন মোতাবেক কাঠামোগত সংশোধন” বিষয়ে বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪(১৩) নং ধারায় বিদ্যমান গাড়িগুলিকে আদর্শ কাঠামোতে রূপান্তরের জন্য কাঠামোগত সংশোধন করা যাবে লেখা থাকলেও এই সংশোধনের জন্য কোন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিধিমালার নামে বিদ্যমান যানবাহনকে উচ্ছেদের ঝুঁকিতে না ফেলে বরং কাঠামোগত সংশোধনের জন্য আমরা কমপক্ষে ২ বছর সময়সীমা নির্ধারণ করার দাবি জানাই। একইসাথে ই-রিকশার আবেদন ফরমে সেই সংশ্লিষ্ট সংশোধনের ধারা সংযুক্ত করার ও আহ্বান জানাই।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বিধিমালার প্রথম অধ্যায়ের ২ নং বিধির (গ) তে চালক ও (ট) তে লাইসেন্স এর সংজ্ঞায় ই-রিক্সার উৎপাদন লাইসেন্স ও চার্জিং পয়েন্ট লাইসেন্স এর কথা বলা হলেও চালকের লাইসেন্সের কথা বিধিমালার কোথাও বলা হয়নি। যদিও চালকের প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। বিধিমালার ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ১৯ নং ধারায় চালককে বিপজ্জনক চালনা, অতিরিক্ত গতিতে চালানোসহ নানাবিধ কারণে শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। চালকের লাইসেন্স বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল সংবাদ সম্মেলনে চালকের লাইসেন্স প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ৫০/৬০ লাখ মানুষের লাইসেন্স একসাথে দেওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। ফলে শুরুতে না দিয়ে ধীরে ধীরে দেওয়া হবে। আপাতত রিক্সা মালিকরা তাদেরকে একটি পরিচিতি কার্ড দেওয়ার কথা তিনি বলেছেন। এর মাধ্যমে চালকদের নিয়োগে অনিয়ম, হয়রানি ও দুর্নীতি যেমন বাড়তে পারে তেমনি একটা সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে এবং গাড়ি, চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে। এ বিষয়ে বিআরটিএ বা বিআরটিএ যাদেরকে দিয়ে লাইসেন্স এর কাজ করায় সে রকম অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। তাদেরকে যুক্ত করলে এ বিষয়ের সুরাহা করা যাবে। আমরা বিধিমালায় চালকের লাইসেন্স প্রাপ্তি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই নীতিমালায় সিটি কর্পোরেশনের বাইরে সকল পৌরসভা/উপজেলাকে অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে স্পষ্টকরণ না করলে জটিলতা বাড়বে। ই-রিক্সা বুয়েট স্বীকৃত আদর্শ গঠন কাঠামো যুক্ত না হলে চালককে শাস্তি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ আদর্শ কাঠামো অর্থাৎ “প্রযুক্তিগত মানদন্ড ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আবশ্যকীয় ডিজাইন স্পেসিফিকেশন মোতাবেক কাঠামোগত সংশোধন” বিষয়ে বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি ও আদর্শ কাঠামোতে বর্তমান চলাচলকৃত গাড়িগুলিকে রূপান্তরের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। নেতৃবৃন্দ বিধিমালার মধ্য দিয়ে বিদ্যমান যানবাহনকে উচ্ছেদের ঝুঁকিতে না ফেলে কাঠামোগত সংশোধনের জন্য কমপক্ষে ২ বছর সময়সীমা নির্ধারণ করার দাবি জানান। একইসাথে ই-রিকশার আবেদন ফরমে সেই সংশ্লিষ্ট সংশোধনেরও আহ্বান জানান।

নেতৃবৃন্দ নিবন্ধন ও নবায়ন ফি প্রসঙ্গে বলেন, বিধিমালার ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ২ সিটের ই-রিক্সার জন্য ৮০০০ টাকা এককালীন নিবন্ধন ফি ও বাৎসরিক ৪০০০ টাকা নবায়ন ফি এবং ৪ সিটের ই-রিক্সার জন্য ১০,০০০ টাকা এককালীন নিবন্ধন ফি ও বাৎসরিক ৫০০০ টাকা নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই ফি পায়ে চালিত রিক্সার চেয়ে কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি। তাই রিক্সার ক্ষেত্রে এত বেশি নিবন্ধন ফি আমরা অযৌক্তিক মনে করি এবং ব্যয়বহুল ফি কমানোর ক্ষেত্রে অংশীজনদের সাথে পরামর্শ করে ফি পুনর্নির্ধারণ করার জোর দাবি জানাচ্ছি। একইসাথে নিবন্ধন, ফিটনেস ও নবায়ন প্রক্রিয়া সহজতর করারও আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বলেন, বিধিমালার তৃতীয় অধ্যায়ের ৭ নং ধারায় মহাসড়ক /প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোরে ই-রিক্সা চলাচল না করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে শহরের মধ্যের গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও বাস চলে। এই সমস্যা সমাধানে আমরা দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের পাশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনসহ তিন চাকার যানবাহনের জন্য সাইডলেন চালু করার দাবি করে আসছি। একই সাথে ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন মহানগরে যেমন: ঢাকা মহানগরের প্রধান সড়ক বা প্রধান বাস চলাচল সড়ক কোনটি বা দেশের জাতীয় মহাসড়ক তা উল্লেখ করা না থাকলে জটিলতা ও হয়রানি বাড়বে। এখানে কোন রাস্তায় ই-রিক্সা বা ব্যাটারি রিকশা চলতে পারবে বা পারবে না তা অংশীজনদের সাথে কথা বলে নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে ট্রাফিক বিভাগসহ অনেকেই এই জটিলতার সুযোগ নিতে পারে।

নেতৃবৃন্দ নিরাপদ পরিবহন ও গাড়ির ফিটনেস প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নেয়ার সুপারিশ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে কিন্তু সেখানেও যানবাহন নিয়ন্ত্রনকারী সরকারি সংস্থা BRTAকে এই নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই যানবাহনকে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নীতিমালার কোন পর্যায়েই BRTA অন্তর্ভুক্ত না হলে যানবাহনের ফিটনেস বা চালকের লাইসেন্স নিশ্চিত করা কঠিন হবে এবং এই ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে একটি নিরাপদ যানে রূপান্তর করা অনেক কঠিন হবে। চার্জিং স্টেশন বা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিদ্যুৎ সংযোগের বিশেষ মিটার স্থাপন অনুমোদন ও গ্যারেজের ট্রেড লাইসেন্সসহ বেশ কিছু বিষয়ে যে জটিলতা ছিল সে বিষয়েও এই বিধিমালায় কিছু বলা হয়নি। এ ধরনের আরো বেশ কিছু বিষয় আছে যা বিধিমালাতে আসে নি বা স্পষ্ট হয়নি।

নেতৃবৃন্দ বিধিমালাকে স্বাগত জানালেও যে কোন ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ না করা, প্রকৃত চালক-মালিকের লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একইসাথে বিধিমালা সংশোধনে ও সংযোজনে সংগ্রাম পরিষদের ৯ দফা দাবি বা সংশোধনী প্রস্তাবনা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংগ্রাম পরিষদের ৯ দফা দাবি বা প্রস্তাবনা:

১. বিধিমালার মাধ্যমে শ্রমিককে সুরক্ষা দিতে হবে, রিক্সা উচ্ছেদের হাতিয়ার হিসেবে বিধিমালা ব্যবহার করা যাবে না, যে সমস্ত রিক্সা চলছে সেগুলোর কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কমপক্ষে ২ বছর সময় দিতে হবে।

২. চালকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৩. অযৌক্তিক নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কমাতে হবে।

৪. ই-রিক্সার সংখ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় চালকসহ সকল অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৫. বিধিমালায় ই-রিক্সার জন্য মহাসড়কের পাশে সাইডলেন চালু করার নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৬. বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী বা বীমা ব্যবসায়ীদের কাছে শ্রমিকদের জিম্মি করা যাবে না।

৭. লাইসেন্স, ফিটনেস ও উৎপাদনের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় BRTA-কে যুক্ত করতে হবে।

৮. সিটি কর্পোরেশনের বাইরে সারা দেশকে বিধিমালার মধ্যে স্পষ্ট করে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৯. নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মসূচি:

নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন-সংযোজন করে এই ৯ দফা দাবি বা প্রস্তাবনা মেনে নেওয়ার দাবিতে আগামী ১১ নভেম্বর ১৩টি সিটি কর্পোরেশনে সমাবেশ এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে রিক্সা, ব্যাটারি রিক্সা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ।

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram