spb-logo

অভ্যুত্থান করে জনগণ, ফল ভোগ করে পুঁজিপতি, সাথী হয় সাম্রাজ্যবাদী মহাজন

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাসদের লাল পতাকা মিছিল, ঢাকা
৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাসদের উদ্যোগে ঢাকায় লাল পতাকা মিছিল

আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলো। সংস্কার ও সংবিধান নিয়ে বড় বড় আলোচনা হচ্ছে, সংসদ গরম, সদস্যদের বাক্যবাণে। কিন্তু সেই আলোচনায় জনজীবনের সমস্যার কথা নেই। কারা প্রতারিত কিংবা পুরস্কৃত বা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তা নিয়ে চলছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের পরস্পরের তর্ক-প্রতিযোগিতা। আশা, আশঙ্কা আর বিতর্কে দুই বছর কেটে গেল, কিন্তু জনজীবনের সংকট ও দুরবস্থা দুই দিনের জন্যও পিছু হটল না; বরং তা যেন নতুন করে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরেছে।

এত আত্মত্যাগ ও এত বড় গণ অভ্যুত্থানের পর এত অল্প সময়ে তার পতনদশা তো স্বাভাবিক ছিল না। কেন এমন হলো? অভ্যুত্থানের আগে দেয়ালে শ্লোগান লেখা হয়েছিল— ‘শোন মহাজন! আমরা অনেকজন’। অনেকের অংশগ্রহণ, আহত হওয়া, জীবন দেওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, নতুন বন্দোবস্তের নামে নতুন মহাজনেরা কুক্ষিগত করতে চাইছে সব সাফল্য। নতুন নতুন দখলবাজ নেমে পড়েছে মাঠঘাটে, বাজার, ব্যাংক ও বাণিজ্যে। ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করে মাজার ভাঙা আর প্রতিশোধের উন্মত্ত নেশায় সর্বত্র দখল চলছে বেপরোয়া গতিতে। উদ্দেশ্য তাদের একটাই—টাকা-সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া। ফলে নতুন রূপে অতীতের পুনরাবৃত্তি হতে দেখছে মানুষ। তাই তো অভ্যুত্থান করে সর্বজনীন জনগণ, আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সুবিধা লুটে নেয় পুঁজিবাদী স্বল্পজন।

বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা গেল না, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামানো গেল না, ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার হয়নি, পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনা গেল না। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাল্টিমিলিয়নেয়ার; অর্থাৎ বহুকোটি টাকার মালিক হয়েছেন ৭ হাজার জন। আর গত তিন মাসে বেড়েছে ২ হাজার ২০৯ কোটিপতি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক বছরে ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি ছিল ৮৩৪.২ ফ্রাঁ, অর্থাৎ ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। কারা এরা? কীভাবে টাকা আয় করলো এবং জমা করলো সুইস ব্যাংকে? উত্তর কে দেবে?

সংসদ সদস্যদের সুবিধা কত, দায়িত্ব কী আর তাদের জন্য বরাদ্দ কত? অতীতে সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, বরাদ্দ ব্যবহারে দুর্নীতি জনগণ দেখেছে। তাই আলোচনা ছিল—আইনসভার সদস্যরা কেন প্রকল্প, রাস্তা আর নানা সহায়তার টাকা বিতরণ ও ব্যবহার করবেন। কিন্তু পরিবর্তন তো হলো না। বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের এমপিদের পল্লী উন্নয়ন বরাদ্দ আড়াই গুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা, যার পরিমাণ অষ্টম সংসদে ছিল ২ কোটি, দ্বাদশ সংসদে ২৫ কোটি। সংসদ অধিবেশন দুটো হয়েছে, সেখানেও বরাদ্দের আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে।

অন্যদিকে ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণের কী দশা! তাদের জীবনে চলছে হাহাকার। মব তথা উশৃঙ্খল গোষ্ঠীর সহিংসতা, একদিকে বেকারত্ব, অন্যদিকে বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাই। নানা অজুহাতে কারখানার পর কারখানা বন্ধ করা হচ্ছে। বিগত সরকারের বন্ধ করে দেওয়া ২৫টি রাষ্ট্রীয় পাটকল, ৬টি চিনিকলসহ বন্ধ কারখানা চালু করা তো দূরের কথা, এই সম্পদ ব্যক্তি মালিকদের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদেরকে কুইক রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপন করতে দিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুতের দফায় দফায় দাম বাড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ। এখন বাকি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকেও বেসরকারি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গ্যাস-তেলের দাম বিশ্ব বাজারের অজুহাতে বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় বৃদ্ধিও লাগামহীন।

একটা সমাজের নারীর অবস্থান দিয়ে সমাজ কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালী, তা বুঝতে পারা যায়। অভ্যুত্থানের পর অবস্থার উন্নতি হবে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু নারীরা যেন এখন নির্যাতনের সহজ টার্গেট। মৌলবাদী আক্রমণ ও অশ্লীল আচরণ—দুটোই ঘটছে নারীর ওপর ব্যাপকভাবে। নারী নির্যাতন ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন ছিল ১ হাজার ৪২টি, আর ২০২৬-এর জানুয়ারি-জুন ৬ মাসে ১ হাজার ৬২১টি। শিশু নির্যাতন একই সময়ে ৬৭৩টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৭টি হয়েছে। এর বাইরেও যে কত ঘটনা আছে, তা পত্রিকায় আসেনি।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র শিক্ষাব্যবস্থায়। একটা উদাহরণ থেকে সংকটের তীব্রতা বোঝা যাবে। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী ফর্ম পূরণ করেনি এবং পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এরা কোথায় হারিয়ে গেল? দারিদ্র্যের কষাঘাতে শিক্ষার আঙিনা থেকে ছিটকে পড়া এই শিশুদের ভবিষ্যৎ কী? এরা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বেকারের মিছিলের সংখ্যা বাড়াবে শুধু।

মানুষ কী খাবে? খাদ্যে ভেজাল, শাকসবজিতে সীসা ও ক্যাডমিয়াম, কোথাও পানিতে মলজাত জীবাণু, শিশুখাদ্যে নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি টক্সিন, রান্নার তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক, বিস্কুট ও স্ট্রিটফুডে প্রিজারভেটিভ, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক। মাছ-মুরগি, ডিম-ফল—কোথায় বিশুদ্ধ খাবারের নিশ্চয়তা? খাদ্য নিয়ে এত মুনাফাখোরি পৃথিবীর আর কোথাও কি আছে? মানুষ যেন দাম দিয়ে ভেজাল এবং বিষ কিনে খাচ্ছে। দেখার কে আছে?

সময়মত টিকা দিতে না পারা ও চিকিৎসা অব্যবস্থাপনায় হাম রোগে নয় শতাধিক শিশু মারা গেছে। এগিয়ে আসছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আতঙ্ক। ওষুধের দামের কোনও লাগাম নেই, মানের নিশ্চয়তা নেই। চিকিৎসা এখন রোগীর জন্য দুর্মূল্য এবং হাসপাতাল ব্যবসায়ীদের সহজে মুনাফা অর্জনের অন্যতম উপায়। বর্তমানে বাজারে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০টি জেনেরিক ওষুধ আছে, তার মধ্যে সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ওষুধের দাম কোম্পানিগুলো ইচ্ছামত বাড়ায়। দেশের চিকিৎসাব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীকেই বহন করতে হয়, ফলে ওষুধের দাম চিকিৎসাকে ব্যয়বহুল ও কঠিন করে তুলছে।

একদিকে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে অপরাধপ্রবণতা—দুটোই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অর্থনীতিতে লুণ্ঠন আর রাজনীতিতে দমন-পীড়ন একে অপরের পরিপূরক। গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় অসহিষ্ণুতা, রুচি ও মননের নিম্নগামিতা বেড়েই চলেছে। যুবসমাজের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদিতা, মাদকাসক্তি, ধর্মের নামে ভ্রষ্টাচার—সবই চলছে লাগামহীন। তরুণ যুবকদের কারখানায় নিংড়ে নেওয়া, বেকার রেখে সস্তা শ্রমিক বানানো আর লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করার সেই পুরোনো পুঁজিবাদী নীতিই অব্যাহত আছে। উগ্রতা ও নোংরামি বাড়ছে।

রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা পালটে এখন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং তাদের সাথে জুলাই চেতনার নামে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বিরোধ নতুন রূপ নিয়েছে। ক্ষমতা, পদ-পদবির মোহ, অর্থলিপ্সা জাগিয়ে যুবসমাজের চরিত্র নষ্টের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কোনো নীতিবোধ, সমাজের প্রতি দায়বোধ যেন গড়ে না ওঠে, সেই উদ্দেশ্যে বামপন্থাকে হেয় করার পরিকল্পিত প্রচারণা চলছে।

বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ এককালে দেশাত্মবোধ, প্রগতিবাদী ধ্যান-জ্ঞান গড়ে তুলতে সাধনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের অনেককে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী হত্যা করেছে। তারপরও তাঁরা সমাজের প্রতি দায় পালন করেছেন। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই এখন তাদের উত্তরাধিকার বহন না করে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের আজ্ঞাবহ থেকে আত্মসুখ, বিত্ত ও খ্যাতির মোহে জাতিকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে নামকরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় বৈশ্বিক জার্নাল প্রত্যাহার করেছে। একটা জাতির জন্য এ যে কত বড় লজ্জা!

মুসলমানি লেবাস দিতে গিয়ে সংস্কৃতিকে এমনিতেই সমাজবিমুখ করা হয়েছে। তারপরও প্রাতিষ্ঠানিক যতটুকু আয়োজন ছিল, তার ওপরও আক্রমণ আসছে, সংকোচন করা হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তো বন্ধ হয়েছেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নৃত্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের ৭৫ শতাংশ আসনই ফাঁকা। সঙ্গীত বিভাগে ২০২১-২২-এ ভর্তি ছিল ৪৭ জন, ২০২৫-২৬-এ সে সংখ্যা ১৬। নৃত্যকলা বিভাগে ছাত্র ৩০ থেকে ৭ জনে নেমেছে। এভাবে শিক্ষা, সংস্কৃতি-অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন-সাহিত্য, বিজ্ঞান—সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় জাতির সর্বনাশেরই নিদর্শন দেয়।

তাহলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক—সকল ক্ষেত্রে ধস নামিয়ে উন্নয়নের কথা বললে মুষ্টিমেয় মানুষ তার সুফল পাবে আর দায় বহন করবে গোটা দেশের মানুষ। যে কারণে মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ২০ ডলার—অর্থাৎ বার্ষিক ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা করা হয়েছে, জিডিপি হয়েছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার, অথচ শ্রমিক পায় না ন্যায্য মজুরি, কৃষক পায় না ফসলের দাম। দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় মাথাপিছু আয়ের চেয়ে কম। বাকি ৫ শতাংশ এমন বিপুল পরিমাণ আয় করে যে গড়ে জাতীয় আয় ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে বৈষম্য এখন আকাশচুম্বি।

বুর্জোয়া রাজনীতিতে এর হাত থেকে মুক্তি নেই। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে সমাজের ও রাজনীতির বৈপ্লবিক রূপান্তর প্রয়োজন, দরকার সমাজতন্ত্র-অভিমুখী লড়াই পরিচালনা করা। আর এটা প্রকৃত বামপন্থি—অর্থাৎ বিজ্ঞানভিত্তিক বামপন্থি শক্তির নেতৃত্ব ছাড়া সম্ভব নয়। বাসদ সে সংগ্রামে সকল বাম-প্রগতিশীল শক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়।

— মাসিক ভ্যানগার্ড, আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram