spb-logo

ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ নয়, চাই নিরাপদ চলাচলের অধিকার

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
লাইসেন্স ও নীতিমালার দাবিতে বরিশালে ব্যাটারি রিকশা সংগ্রাম পরিষদের মিছিল ও স্মারকলিপি পেশ
লাইসেন্স ও নীতিমালার দাবিতে বরিশালে ব্যাটারি রিকশা সংগ্রাম পরিষদের মিছিল ও স্মারকলিপি পেশ

রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান

সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও সমজাতীয় যানবাহনের চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও পরিবহণসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব যানবাহনের নির্মাণগত ত্রুটি, সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার ও ট্রাফিক শৃঙ্খলার অবনতির কথা তুলে ধরে এগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার, মামলা, কারাবরণ, পুলিশি হয়রানি, চাঁদাবাজি এবং রিকশা জব্দ ও ভাঙচুরের মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, এসবের প্রতিবাদে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আসছি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, দিনাজপুরসহ সারাদেশে সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচি জানানো দাবি, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিরাপদ ও বৈধ চলাচল নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এসব সমস্যার সমাধান যানবাহন বন্ধ করে নয়; বরং কারিগরি ত্রুটি দূর করা, নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট চলাচল বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব।

শ্রমিকের জীবন-জীবিকা ও গণপরিবহণে রিকশার ভূমিকা

রিকশা বাংলাদেশের নগর ও গ্রামীণ জীবনের বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত বাহন। শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে রিকশাচালকেরা যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। অমানবিক শারীরিক শ্রম কমানো, পরিবেশবান্ধব, যাত্রী পরিবহনে স্বাচ্ছন্দ্য আনা এবং চলাচলের খরচ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দেশীয় উদ্যোগে প্যাডেলচালিত রিকশায় ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটর সংযোজন শুরু হয়। বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক শহরের অলিগলি, আবাসিক এলাকা ও গ্রামীণ জনপদে যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। স্বল্প দূরত্বে সহজে যাতায়াতের সুবিধার কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এসব যানবাহনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সারাদেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ চালক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এর সঙ্গে যুক্ত। যানবাহন তৈরি, মেরামত, খুচরা যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারি উৎপাদন-বিপণনের সঙ্গেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া এসব যানবাহন বন্ধ করা হলে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ ও তাঁদের পরিবার অর্থনৈতিক চরম সংকটে পড়বেন। যা স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই কাম্য নয়। শ্রমিকের জীবন-জীবিকার এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেউই মেনে নেবে না।

দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষণ

নেতৃবৃন্দ বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কাঠামোগত ত্রুটি, দুর্বল ব্রেক, অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়—এসব সমস্যা আমরা অস্বীকার করি না। তবে সমাধান যানবাহন বন্ধ করা নয়, বরং নিরাপত্তার মান উন্নয়ন, কারিগরি ত্রুটি সংশোধন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা দক্ষ প্রকৌশলীদের সহায়তায় ব্রেক, গতি নিয়ন্ত্রণ, কাঠামো ও অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থার অভিন্ন কারিগরি মান নির্ধারণের দাবি আমরা জানিয়ে আসছি। পাশাপাশি চালকদের ট্রাফিক আইন ও নিরাপদ চালনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান, লাইসেন্স প্রদান এবং যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়ে আছে। মোটরসাইকেল, বাস-ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, সড়কের নকশার ত্রুটি, অপব্যবহার ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাসহ এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাস্তবতার দাবি। কোনো একটি শ্রেণির যানবাহনকে এককভাবে দায়ী করা অযৌক্তিক, যার দ্বারা সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়।

যানজটের সমাধান নিষেধাজ্ঞা নয়, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং ও প্রধান সড়কে প্রবেশ যানজটে কিছু ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র এই বাহনকে দায়ী করলে ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য, অযৌক্তিক ব্যবহার, পর্যাপ্ত গণপরিবহণের অভাব, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের সংকটের মতো সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যায়। তাই সড়কের ধরন ও যানবাহনের গতি বিবেচনায় নিয়ে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন বা সার্ভিস রোড নির্মাণ করতে হবে। নির্দিষ্ট চলাচল পথ, পার্কিং ও যাত্রী ওঠানো-নামানোর স্থান নির্ধারণের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এক্ষেত্রে চালক, যাত্রী ও পথচারী—সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে চাই শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থা

ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও অনিরাপদ ব্যবস্থার অভিযোগ তুলে সব চালককে দায়ী করা যুক্তিসংগত নয়। চালকরা গ্যারেজ বা চার্জিং স্টেশনে নির্ধারিত অর্থ দিয়ে যানবাহন চার্জ করেন। তাই অনিয়মের দায় নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ না করে ঢালাও কথা বললে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে সরকারকে চার্জিং স্টেশন স্থাপন, বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ মাশুল নির্ধারণের নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ব্যবহৃত ব্যাটারির পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলায় নিরাপদ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের আধুনিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি প্রতিস্থাপন করা ও তার জন্য সরকারি ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

নিবন্ধন ও লাইসেন্সের দায়িত্বে চাই সমন্বিত কর্তৃপক্ষ

নেতৃবৃন্দ বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ, রুট পারমিট এবং পৃথক লেন নির্মাণসহ ৭ দফা দাবিতে আমরা গত ১৩ বছর ধরে আন্দোলন করে আসছি। আমাদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ‘ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৩’ অনুমোদিত হলেও ‘থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা, ২০২৪’ এখনো চূড়ান্ত ও কার্যকর হয়নি। গণ অভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, শ্রমিকদের আত্মত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের পরিবর্তে, স্থানীয় সরকার আইনে সংশোধন এনে বিআরটিএকে বাদ দিয়ে সিটি করপোরেশনগুলোতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের টোকেন বা কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের আশঙ্কা, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহি ছাড়া এ ব্যবস্থা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের বিকাশ এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়াবে। গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য নতুন নীতিমালা ও বিধিমালা দ্রুত কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু বিআরটিএকে বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকারকে নিবন্ধন, লাইসেন্স ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। আমরা মনে করি, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া স্থানীয় সরকার নিবন্ধন ও তদারকিতে ভূমিকা রাখতে পারবে না; যানবাহনের ফিটনেস যাচাই, কারিগরি মান নির্ধারণ এবং লাইসেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে বিআরটিএর বিদ্যমান দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, স্থানীয় সরকার, ট্রাফিক পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করছি। নীতিমালা প্রণয়নের আগে চালক, মালিক, উৎপাদক, শ্রমিক সংগঠন, প্রকৌশলী, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও যাত্রী প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। কোনো বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে শ্রমিক ও দেশীয় অটোমোবাইল খাতকে জিম্মি হতে দেওয়া যাবে না।

নিষেধাজ্ঞা নয়, চাই অধিকার ও দায়িত্বের সমন্বয়

ব্যাটারিচালিত রিকশা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বয়স্ক ব্যক্তি, শারীরিকভাবে সীমিত সক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত অনেক শ্রমজীবীও এই পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট বাড়বে। সংগ্রাম কমিটির দাবি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক বন্ধ নয়, নিরাপদ ও বৈধ চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যাটারি রিকশা নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান, প্রশিক্ষণ, ফিটনেস পরীক্ষা, রুট পারমিট, কারিগরি মান উন্নয়ন ও বৈধ চার্জিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, জব্দ-ভাঙচুর ও হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশার সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিষেধাজ্ঞা ও বন্ধ নয়, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায়। শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা এবং জনগণের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইককে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সুশৃঙ্খল স্থানীয় গণপরিবহণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram