দেশের জাতীয় সম্পদের মালিকানা কার, আর কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে—দেশের মানুষের কল্যাণে, নাকি লুটেরা শাসক ও বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার জন্য? দেশের খনিজ সম্পদ, মাটি-পানি, কৃষি ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কার—জনগণের, নাকি সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু শাসকগোষ্ঠী ও বহুজাতিক কোম্পানির? দেশে যখন দুর্যোগ নেমে আসে, সেটা মোকাবিলা করে কে? পেট্রোবাংলা ও খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর সক্ষমতা কেন বাড়ে না? দেশকে সমৃদ্ধ করার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে কারা, আর সুফল ভোগ করে কারা? দিনাজপুরের ফুলবাড়ী আন্দোলনে এসব প্রশ্নই জড়িয়ে ছিল। এ আন্দোলন ছিল জাতীয় স্বার্থ বিরোধী অসম চুক্তি, পরিবেশ বিপর্যয় এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তৎকালীন বিডিআর ও পুলিশের গুলিতে নিহত হন আমিনুল ইসলাম আমিন, মো. সালেকিন ও তরিকুল ইসলাম। আহত হন প্রায় দুই শতাধিক মানুষ। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে হরতাল-অবরোধসহ আন্দোলন তীব্র হলে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ৩০ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছয় দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়নি। বরং কয়লাখনি প্রকল্প নিয়ে নতুন করে বর্তমান সরকারের আলোচনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ফুলবাড়ী আন্দোলনের পটভূমি
১৯৯৪ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লার সন্ধান ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠান বিএইচপির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়। প্রতিষ্ঠানটি কয়লার সন্ধান পেলেও অঞ্চলটির ভূতাত্ত্বিক গঠন, কৃষিজমি, বন্যাপ্রবণ ভূপ্রকৃতি ও ঘনবসতির কারণে পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির আশঙ্কায় খনন শুরু করেনি। ১৯৯৮ সালে তারা তাদের লাইসেন্স লন্ডনভিত্তিক এশিয়া এনার্জি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। বর্তমানে কোম্পানিটি জিসিএম রিসোর্সেস পিএলসি নামে পরিচিত।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়ীতে আনুমানিক ৫৭২ মিলিয়ন বা ৫৭ কোটি ২০ লাখ টন উন্নত মানের বিটুমিনাস কয়লার মজুত রয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১০ লক্ষ ২১ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা।
কেন উন্মুক্ত পদ্ধতির বিরোধিতা?
কয়লা উত্তোলনের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ভূপৃষ্ঠের ওপরের বিপুল পরিমাণ মাটি সরিয়ে কয়লা উত্তোলন করা হয়। ফুলবাড়ীর প্রস্তাবিত খনির কয়লা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৯০০ ফুট গভীরে। খনির আয়তন প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ বর্গকিলোমিটার এবং গর্ত তৈরির জন্য প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কয়লার স্তরের ওপর ৮০ থেকে ১২০ মিটার পুরু ‘ডুপিটাল’ নামক পানির স্তর রয়েছে। এ বিপুল পানি অপসারণ করেই কয়লা উত্তোলন করতে হবে। এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমি।
ফলে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন হলে ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ ভিটেমাটি ও কর্মসংস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হবে। তাঁদের বড় অংশই দরিদ্র সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। এটা ছিল জাতীয় স্বার্থ বিরোধী একটা অসম চুক্তি। কারণ, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পাবে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি, আর এশিয়া এনার্জি পাবে ৯৪ শতাংশ।
এ পদ্ধতিতে কয়লার স্তরে পৌঁছাতে বিপুল মাটি সরাতে ও পানি অপসারণ করতে হবে। যার ফলে, ধ্বংস হবে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও গাছপালা, ধ্বংস হবে বাস্তুতন্ত্র, ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পরিবেশের। ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশনের ফলে পানির স্তর নেমে যাবে, শুকিয়ে যাবে পুকুর-জলাশয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য। খনির দূষিত পানি নদী-খালে প্রবাহিত হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে বাধ্য। তাই ফুলবাড়ীর মানুষের দাবি ছিল—জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ছয় দফা চুক্তি
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জের হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন আরও তীব্র হলে ৩০ আগস্ট সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে ছয় দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়।
৩০ আগস্টের চুক্তিতে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল ও কোম্পানিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার, দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা এবং সংশ্লিষ্ট জনগণের সম্মতি ছাড়া কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, আহতদের সহায়তা, ঘটনার তদন্ত, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ও নতুন মামলা না করা এবং শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু এসব অঙ্গীকারের অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। চুক্তি বাতিল, এশিয়া এনার্জিকে বহিষ্কার ও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন বন্ধের প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়নি। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারও সম্পূর্ণ হয়নি; বরং নতুন করে হয়রানির অভিযোগ উঠছে।
এশিয়া এনার্জির তৎপরতা ও নতুন উদ্বেগ
এশিয়া এনার্জি বর্তমানে জিসিএম রিসোর্সেস নামে ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়নার সঙ্গে প্রকল্প উন্নয়ন নিয়ে সমঝোতা হয়, যার মেয়াদ পরবর্তী সময়ে বাড়ানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন পর ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ফুলবাড়ী আন্দোলন দেখিয়েছে, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে জাতীয় সম্পদ লুটপাটের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যায় না। জাতীয় সম্পদ জনগণের সম্পদ; এর ব্যবহার নির্ধারিত হতে হবে জনস্বার্থ, পরিবেশগত নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে।
তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির দাবি, ২০০৬ সালের ছয় দফা চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল ও কোম্পানিটিকে বহিষ্কারের অঙ্গীকার কার্যকর করতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করে দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার অঙ্গীকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শহীদ আমিন, সালেকিন ও তরিকুলের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফুলবাড়ীর মানুষ যে অধিকার ও দাবি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করাই হবে তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। জাতীয় সম্পদ, কৃষি, পরিবেশ ও জনগণের জীবন-জীবিকা রক্ষার সংগ্রাম তাই আজও প্রাসঙ্গিক।





