spb-logo

সাংস্কৃতিক আন্দোলন সমাজ বদলের অন্যতম হাতিয়ার — কমরেড খালেকুজ্জামান

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে কমরেড খালেকুজ্জামানসহ নেতৃবৃন্দ
চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে কমরেড খালেকুজ্জামানসহ নেতৃবৃন্দ

চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ভ্যানগার্ড মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিখিল দাসের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান।

কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সমাজ বদলের অন্যতম হাতিয়ার। চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দ্বিতীয় কাউন্সিলে উপস্থিত সকল কমরেডদের আন্তরিক শুভেচ্ছা। আপনারা জানেন, সংস্কৃতি মানুষকে প্রাণীসত্তা থেকে মানবিক সত্তায় উত্তরণের অন্যতম বাহন। মানব শরীরের ক্ষয়পূরণ ও পুষ্টিসাধনের জন্য আহার প্রয়োজন, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা ও পরিচর্যা প্রয়োজন। কারণ সমাজবদ্ধ মানুষ সমাজের মানসিক ও মানবিক স্বাস্থ্যের আবহাওয়ার মাঝেই স্বকীয় সত্তা লাভ করে। আবার চিন্তা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত মানুষ বস্তুগত উৎপাদনের সিঁড়ি বেয়ে সমাজ-সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্র রচনা করে, পাশাপাশি ভাবগত উৎপাদনের বহুমুখী ধারার বিকাশের ক্ষেত্রও তৈরি করে। শ্রেণিতে ভাগ করা সমাজে তা শ্রেণিস্বার্থ ও শ্রেণিভাবনার গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে না। এইভাবে আর্থব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত রাজনীতি ও সংস্কৃতি পরস্পর দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রগতির পথ হারিয়ে ফেললে সংস্কৃতি স্থবির দশায় পতিত হয়। সাংস্কৃতিক বহুমুখী প্রকাশের শাখা-প্রশাখাগুলো বদ্ধতায় আটকে গেলে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রগতিমুখী ধারাও গতি হারায় কিংবা বিপথগামী হয়। সংস্কৃতি জীবনের পূর্ণতা দেয়, রাজনীতি তার উপায় করে দেয়। আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে সংস্কৃতির বহু উপাদান যুক্ত হতে হতে দাসসমাজ, সামন্তসমাজ অতিক্রম করে পুঁজিবাদী সভ্যতায় উত্তরণকালে বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে উপস্থিত হয়। পুঁজিবাদ অবাধ প্রতিযোগিতার যুগ পেরিয়ে একচেটিয়ায় প্রবেশকালে তার উত্থানের অনেক প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে যেতে থাকে; আর বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থারকালে প্রায় সবটাই নিঃশেষিত হওয়ার পথে। অর্থাৎ এখন অঙ্গীকারের মুখোশ আছে, প্রাণ নেই। এই সময় সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের লক্ষ্যাভিমুখী রাজনৈতিক সংগ্রামের মাঝেই অগ্রসর সংস্কৃতিচেতনা, ভাবনার নতুন চেহারা দাঁড়াতে পারে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিপ্লবী পার্টির পরিচালনায় চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সে জাগরণ ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা চরম হতাশার ঘোর অন্ধকার সময়ে আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারে।

কমরেড খালেকুজ্জামান আরও বলেন, আমাদের দল ১৯৮০ সালে গঠিত হওয়ার পর সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম ছিল ‘বীকন’। অর্থাৎ জাহাজের সার্চলাইট, যা অন্ধকারে আলো ফেলে গন্তব্যপথ দৃশ্যমান করে। পরে বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে, শহরেনগরে, শিল্পাঞ্চলে, মাঠেময়দানে, আনাচেকানাচে সর্বত্র চারণিক দল সংস্কৃতির বীজ বপন করবে, সংস্কৃতির আবহাওয়া ও পরিবেশ গড়ে তুলবে, যা বিপ্লবী রাজনীতির পরিপূরক হয়ে গণমানুষের মধ্যে রসসিক্ত, উদ্যমী প্রাণ-প্রাচুর্য সৃষ্টি করবে—সেই লক্ষ্যে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আবির্ভাব। আমাদের পার্টির ৫টি ফ্রন্ট, যথা : সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্ট, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মিলে সমাজের সর্বস্তরের শোষিত শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষেত্রকেন্দ্রিক ভিন্নতা ও বহু বিচিত্র ধরনের জীবনযাত্রা, ভাবনা ও সংগ্রামের সফলতা-ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাসমূহকে পার্টি যৌথ জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত করে এবং ফ্রন্টসমূহ যার যার নিজস্ব ক্ষেত্রে নানামুখী কর্মপ্রয়াসে ক্রিয়াশীল হয়। এখানে ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড বা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বা ঝোঁক প্রাধান্য পায় না। কারণ অঢেল সম্পদ আর প্রচুর টাকা দিয়েই শুধু পুঁজির চরিত্র মাপা যায় না। পদ-পদবি, নাম-ধাম, খ্যাতি সুনাম ইত্যাদি কর্তব্য পালনের উপরিপাওনা না হয়ে যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একান্ত বিষয় হয়ে ওঠে, তখনই তা পুঁজির চরিত্র ধারণ করে। অতীতের বহু বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা সে সাক্ষ্য বহন করে।

তিনি আরও বলেন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে পূর্ণতায় দাঁড় করিয়ে অপরাপর সাংস্কৃতিক সংগঠন, আন্দোলনের সাথে যৌথ প্রচেষ্টায় সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিপূরক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত করার যে সংকল্প নিয়ে আপনারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে নামবেন, তা সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে, সন্দেহ নেই। চারণের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত; যেমন : ভাষা-সাহিত্য, সংগীত-নৃত্যকলা, ছবি আঁকা, অভিনয়, নাটক-সিনেমা, যাত্রাপালা, লোকগান, বাদ্য-বাজনা, আবৃত্তি, শরীরচর্চা, খেলাধুলা ইত্যাদি। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পাঠচক্র ও পাঠাভ্যাস, পার্টি ও ফ্রন্টসমূহের পত্রিকাসহ প্রচারপত্রিকা, দল-ঘনিষ্ঠতা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সংস্কৃতিকর্মী, লেখক-সমালোচক, সংগঠন ইত্যাদির সাথে যোগাযোগ করে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা-অভিজ্ঞতা ও তাদের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিতকরণ, অতীতের সংস্কৃতি ভাণ্ডারের সাথে পরিচয়, বিশ্বপরিসরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারা অনুসন্ধান ইত্যাদি। চারণ অফিসকে সাংস্কৃতিক লাইব্রেরিসহ অনেকটা আখড়ার মতো করে গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় তুলতে হবে। অপসংস্কৃতি, পশ্চাৎপদ-প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণা, কূপমণ্ডূক চিন্তা ধর্মপালনের নীরব ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতারণামূলক স্বার্থসুবিধা লাভের মুখোশ উন্মোচন, সেমিনার ইত্যাদি আয়োজন যুক্তভাবে ও নিজস্ব সাংগঠনিক উদ্যোগে করে যেতে হবে। অতীতের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসের সাথেও আমাদের পরিচয় দরকার, যাতে মূল্যায়ন করা যায়—ঐ সমস্ত সংগঠন-আন্দোলন কতটা সময়োপযোগী অসাধারণ কর্তব্য সম্পাদন করেছে, আবার পরবর্তী পরিস্থিতিতে সে ধারাবাহিকতা কেন রক্ষা করতে পারেনি, সাংগঠনিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৩৫ সালে রম্যাঁ রোলা ও মাক্সিম গোর্কিদের উদ্যোগে অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রাইটার্স, ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ, ঢাকার প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ, লেখক শিবির, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং বর্তমানে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য ইত্যাদি। এ সবেরই মূল্যায়ন-পুনর্মূল্যায়ন দরকার; যাতে সমাজতন্ত্র-সাম্যের লক্ষ্যে চারণ সুদীর্ঘকাল তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। বিপ্লবী পার্টিসংযোগে ও পরিচালনায় তা কার্যকারিতা লাভ করে এগিয়ে যাবে। হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি নতুন সুরে বেজে উঠবে রাজনৈতিক সংগ্রামের নবপ্রদধ্বনি আর স্লোগানের প্রাণস্পন্দনে।

কাউন্সিলে নির্বাচিত কমিটি পরিচয় করিয়ে দেন কমরেড খালেকুজ্জামান। কাউন্সিলে, নিখিল দাসকে সভাপতি ও জাকির হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক, এবং শাহজাহান কবীব, কামরুজ্জামান ভূঁইয়া খোকন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন তাজুকে সহসভাপতি করে ২০ সদস্যবিশিষ্ট চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন।

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram