spb-logo

উর্বর কৃষি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প না করার আহ্বান

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের সংবাদ সম্মেলন
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের সংবাদ সম্মেলন

উর্বর কৃষি জমি ধ্বংস, বসতভিটা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন না করার দাবিতে ১৫ সেপ্টেম্বর ’২৬ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত বক্তব্য রাখেন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও ক্ষেতমজুর সমিতির কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন রেজা।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন কৃষক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএমএ সবুর, ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষক-ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক নিখিল দাস, বাংলাদেশ কৃষক ফোরামের সভাপতি জগলুল পাশা, কৃষক ক্ষেতমজুর সংগঠনের আলমগীর হোসেন দুলাল, ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুল মজিদ প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সারা বিশ্বই কার্বন নিঃসরণ কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার সংকোচন করে ঝুঁকছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে নীতিমালা অমান্য করে ফসলি জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে কৃষক কৃষিজমি হারাচ্ছে, এর ফলে দেশের মানুষ খাদ্যসংকটে পড়বে। ময়মনসিংহের ভালুকায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য যে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি ফসলি জমি, বসতবাড়ি, স্কুল-মসজিদ, কবরস্থানের মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নেত্রকোণা, টাঙ্গাইলে ১টি করে ও কক্সবাজারে ২টি করে মোট ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে গত এপ্রিলে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) পদ্ধতিতে ২০২৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে এসব কেন্দ্র উৎপাদনে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইপিপি পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নন্দীপাড়া ও ঝালপাজা মৌজার ১৭৩.১৩ একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে জমি নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দরপত্রে অংশ নিতে হলে নির্ধারিত জমির বিপরীতে কৃষি বিভাগের অনাপত্তি প্রয়োজন। উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নে ৪৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ‘কৃষিজমি’ উল্লেখ করে প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিল উপজেলা কৃষি বিভাগ। পরে ‘চাপের মুখে’ অনাপত্তিপত্র দিতে কৃষি বিভাগ বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের মতামতের তোয়াক্কা না করে, সাংসদের স্ত্রীর নামে দরপত্র পাওয়া উক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি জবরদখলের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় কৃষি জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়। তাতে বেকায়দায় পড়েন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। এই প্রকল্পের কারণে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে ফসলি জমি ও মাছের ঘের। প্রতিদিন সেচ মেশিন দিয়ে পানি নিষ্কাশন করেও রেহাই পাচ্ছেন না হাজারো চাষি।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরাসরি কৃষি জমি বা চাষযোগ্য ফসলি জমি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। সরকারের ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী, দুই বা ততোধিক ফসলি জমি নষ্ট করে কোনো বাণিজ্যিক সোলার প্ল্যান্ট করা যাবে না।

যে জমিতে মানুষের স্থায়ী ঘরবাড়ি রয়েছে কিংবা যেসব জমি নিয়ে আইনি বিরোধ বা স্বত্বাধিকারের জটিলতা রয়েছে, সেখানে সোলার পার্ক নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় না। সরকার কর্তৃক ঘোষিত যেকোনো বিশেষ কৃষি জোন বা সংরক্ষিত কৃষি বনে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দণ্ডনীয় অপরাধ। উন্নয়নমূলক কাজে ভূমির প্রয়োজন হলে এবং তার জন্য অকৃষি খাস জমি পাওয়া গেলে খাস জমি ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতে হবে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষি জমিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী ও দলীয় লোকজনকে মুনাফার সুযোগ করে দেবে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশায় পড়বে।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য সারা দেশে একটা ম্যাপ করতে পারে সরকার। তার বাইরে যাতে কেউ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ ‘প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে কৃষককে কৃষি জমি থেকে উচ্ছেদ করে দেশের মানুষকে খাদ্যসংকটে ফেলতে পারে না। এভাবে কৃষিজমিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার পেছনে দুর্নীতি ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারে না। তাঁদের মতে, যে প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, তা সরকারকে বন্ধ করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, অতীতে কৃষকরা তাঁদের জমি রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ ও মাস্তানের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও কারাভোগ করতে হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধী নই। বরং কীভাবে তা বাড়ানো যায় সে দাবি আমাদের সবার। কিন্তু অবশ্যই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্থাপন করতে হবে। জমির স্বল্পতার কারণে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অনাবাদি বা পতিত সরকারি জমি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, রেলপথ ও সড়ক বিভাগের অব্যবহৃত খালি জায়গা এবং বিশেষ করে কলকারখানা ও বাসাবাড়ির ছাদ ব্যবহার করার দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।

সংবাদ সম্মেলনে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram