spb-logo

জাতিসংঘ আজ যেন ঠাট্টা-মশকরার রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
মাসিক ভ্যানগার্ড — বাসদের মুখপত্র
মাসিক ভ্যানগার্ড — বাসদের মুখপত্র

একবার ভেবে দেখুন তো, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় দাঁড়িয়ে অ্যাডলফ হিটলার ভাষণ দিচ্ছেন! হিটলার, জার্মানির ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসক—যিনি এবং যার সহযোগীদের ধ্বংসলীলায় স্তম্ভিত বিশ্বনেতারা যুদ্ধ বন্ধের জন্য এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে জাতিসংঘের জন্ম দিয়েছিলেন, তিনি যদি বিশ্বের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতেন, কী বলতেন তিনি? হিটলারের বিভিন্ন বক্তৃতায় আমরা দেখেছি—তিনি জার্মানির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার কথা বলেছেন, ইউরোপের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলে বাজার দখলের জন্য বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। একই কাজ করেছিলেন ইতালির বেনিতো মুসোলিনি, স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কো। বাজার দখলের উন্মাদনায় এই যুদ্ধবাজ, দখলদারদের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত লীগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জের অসারতা চরমভাবে বিশ্ববাসীর সামনে ফুটে ওঠে। সে সময় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর বিশ্বের মিত্রশক্তিগুলোর (মূলত যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন) উদ্যোগে ৫০টি সদস্যদেশ নিয়ে জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যদেশ ১৯৩টি।

হিটলারের বক্তৃতা দেখার সৌভাগ্য না হলেও, গত ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শুরু হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বিশ্বশান্তি (!) রক্ষার মঞ্চে আমরা কি হিটলারের বক্তব্যের প্রতিধ্বনিই শুনতে পাচ্ছি না? যে মঞ্চে মানবজাতির উন্নয়নে পারস্পরিক সহায়তামূলক বিশ্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, সেই মঞ্চকে আমরা যুদ্ধবাজদের আস্ফালন, দম্ভোক্তি ও হুমকির রঙ্গমঞ্চ হতে দেখছি।

জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ৩৭ মিনিটের ভাষণে বিশ্বের দেশে দেশে তাদের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ও প্রক্সি যুদ্ধকে বৈধতা দিয়েছেন, এবং নিজেদের বিশ্বশান্তির অগ্রদূত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় নিহত ২ হাজার মানুষের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু ইসরায়েলের চালানো গণহত্যায় নিহত ৮০ হাজার ফিলিস্তিনির হত্যার কথা তিনি উল্লেখ করেননি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে এখনো অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে রাখা হয়েছে, কারণ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদের সুপারিশের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়।

ট্রাম্প ইরানকে বিশ্বের সবচেয়ে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে তাকে নিরস্ত্রীকরণ করার জন্য যা যা করা দরকার, আমেরিকা তা-ই করবে বলে সদম্ভে ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ, সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দেশ বলে বারবার বক্তৃতায় উল্লেখ করে বলেন, সামরিক শক্তিতে আমেরিকার সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার কেউ নেই।

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ট্রাম্প মাফিয়া কায়দায় শোয়ার ঘর থেকে অপহরণ করে নিয়ে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেলখানায় পুরে রেখেছে এবং তাঁর বিচার শুরু করেছেন—তাঁকে তিনি সন্ত্রাসী, গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে উল্লেখ করেন। আবার তিনিই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে ঘোষণা দেন এবং তাদের পরিচালিত সব বিচারকে মশকরা হিসেবে তাচ্ছিল্য করেন! মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে জেলে পুরে তাদের সঙ্গে ভালো তেল চুক্তি করার বিষয়ে ট্রাম্প রাখঢাক না করেই জাতিসংঘে বলেন যে, তাদের দুই দেশের মিলিত তেলসম্পদ পৃথিবীর ৬০%, যা দিয়ে অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব। ভেনেজুয়েলার আগের সরকার এটা বোঝেনি, বরং মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দিয়েছে বলে তাঁকে এহেন ‘অ্যাকশন’ নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি কিউবাকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দ্রুত কিউবায় গণতন্ত্র পৌঁছাবে বলে আলোচনা চলছে বলে জানান। এ সময় কিউবার প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ থেকে ওয়াকআউট করে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কমিউনিজম কোনো দিন আমেরিকায় পৌঁছাবে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যে শহরে বসে ট্রাম্প এই বক্তৃতা দিচ্ছেন, সেই শহরে দুইজন এবারের নগর সরকার নির্বাচনে আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির বামপন্থী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন এবং নিউইয়র্কে মেয়র হয়েছেন জোহরান মামদানি, যিনি নিজেকে একজন সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, আর্কটিক অঞ্চলে আমেরিকার এই পদচিহ্ন ন্যাটো ও ইউরোপকে শক্তিশালী করবে।

ট্রাম্প শুধু যুদ্ধকেই বৈধতা দেননি, পরিবেশ নিয়ে সচেতনতামূলক কথাবার্তা নিয়েও তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন কর বলে কিছু থাকতে পারে না, এতে ব্যাবসার ক্ষতি হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বলেও আসলে কিছু হয় না বলেই লোকে এখন একে জলবায়ু পরিবর্তন বলে—একথা বলে তিনি বৈশ্বিক উষ্ণতার ভয়াবহতাকে একটা ঠাট্টায় পরিণত করেন। সারা পৃথিবীতে খ্রিষ্টানরা আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু কেউ সেটা নিয়ে কথা বলে না—এ নিয়ে তিনি উষ্মা প্রকাশ করেন। অবৈধ অভিবাসীদের তিনি ‘এলিয়েন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং এদের ঢুকতে না দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

জাতিসংঘে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে ফিলিস্তিনের ওপর তাঁদের যুদ্ধ চালানো কতটা যৌক্তিক, তার ফিরিস্তি তুলে ধরেন। নেতানিয়াহু বক্তব্য দিতে উঠলে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার প্রতিবাদে বেশির ভাগ দেশের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ ছেড়ে চলে যান। নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই সভাকক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়া প্রতিনিধিদের ‘নৈতিক কাপুরুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী (ওউঋ)-কে পৃথিবীর সবচেয়ে নৈতিক বাহিনী (!) বলে আখ্যায়িত করেন। ফিলিস্তিনে শিশুদের স্কুল, হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, হামাস ওগুলোকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তাই তাদের এমন করতে হয়েছে। ইসরায়েল গণহত্যা শুরু করেনি, বরং গণহত্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি পৃথিবীর ইহুদিদের ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। ইউরোপে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে, যিনি নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মেনে গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছিলেন, ইহুদিবিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু তাঁর ভাষণ শোনার জন্য মাত্র ২৪টি দেশের প্রতিনিধি জাতিসংঘের সভাকক্ষে ছিলেন। বাকি ৭৭টি দেশ এই যুদ্ধবাজের বক্তব্য বর্জন করেছিল।

যুদ্ধবাজের গর্জন আর সভা বর্জনের এই জাতিসংঘের সভা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলোর দাপটের বিশ্বে কোনো সংঘ-সমিতি করে যুদ্ধ বন্ধ করা যায় না। কার্ল মার্কস পুঁজির অদম্য মুনাফার ক্ষুধার তীব্রতা বোঝাতে পুঁজি গ্রন্থে টি. জে. ডানিং-এর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। ‘যথেষ্ট মুনাফা পেলে পুঁজি অত্যন্ত দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। ১০ শতাংশ মুনাফা নিশ্চিত হলে পুঁজি যেকোনো জায়গায় বিনিয়োগ করবে; ২০ শতাংশ নিশ্চিত হলে তা প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করবে; ৫০ শতাংশ হলে তা দুঃসাহসিকতায় পরিণত হবে; ১০০ শতাংশ মুনাফা হলে তা সমস্ত মানবিক আইন পদদলিত করতে প্রস্তুত হবে; আর ৩০০ শতাংশ মুনাফা হলে এমন কোনো অপরাধ নেই, যা করতে পুঁজি ইতস্তত করবে, এমন কোনো ঝুঁকি নেই, যা নিতে সে পিছপা হবে—এমনকি তার মালিকের ফাঁসিতে ঝোলার ঝুঁকি থাকলেও।

মুনাফার খোঁজে, বাজারের খোঁজে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে যুদ্ধ থাকবেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অস্ত্র ব্যাবসার অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানির মতো দেশগুলোও এই অস্ত্র ব্যাবসার প্রতিযোগী। ফলে ব্যাবসা টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ লাগবে। আর সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে লাগবে সমাজতান্ত্রিক পৃথিবী। মুনাফা নয়, মানুষ আগে, মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা আগে, পরিবেশ আগে—এই নীতি পুঁজিবাদে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিশালী না হলে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এমন মর্মান্তিক রসিকতায় পরিণত হবে।

এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমজীবী, মেহনতি ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এই লড়াই কেবল একটি দেশের নয়; এটি বিশ্বব্যাপী শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম। শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই একটি ন্যায়সংগত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram