চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আয়োজনে ফেনীতে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের আগমনের শতবর্ষ উদ্যাপিত (১৯২৬-২০২৬)
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ফেনীতে আগমনের শতবর্ষ (১৯২৬-২০২৬) উদ্যাপন উপলক্ষে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফেনী জেলা শাখার উদ্যোগে ‘শতবর্ষের আলোয়’ শীর্ষক এক আলোচনাসভা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ২৫ জুলাই ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড খালেকুজ্জামান। অনুষ্ঠানে তিনি মাসিক আনন্দ ভৈরবী প্রকাশনারও মোড়ক উন্মোচন করেন। চারণ ফেনী জেলার আহবায়ক অর্জুন দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন লেখক ও সাংবাদিক ড. অখিল পোদ্দার, কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব, বাসদ ফেনী জেলা শাখার আহবায়ক মালেক মনসুর, সমাজসেবক ও সংগঠক ইমন উল হক, কথাসাহিত্যিক শিহাব শহিদুল, লেখক ও ট্রাস্টি ফেনী ইউনিভার্সিটি ড. এ কে এম সাহিদ রেজা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি কালচারাল অফিসার সুদীপ্তা চক্রবর্তী ও কবি আবু সাঈদ লিটন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফেনী জেলা শাখার সদস্যসচিব শামীম পাটোয়ারী।
কমরেড খালেকুজ্জামান আলোচকদের প্রতি সম্ভাষণ জানিয়ে বলেন—
সাহিত্য সেবী ও অনুরাগী সভাপতি, আয়োজক ও আলোচকবৃন্দ, ফেনী এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার সুধীবৃন্দ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানপর্বে অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকবৃন্দ এবং যারা যতভাবে এ অনুষ্ঠানে সহযোগিতা ও শ্রম দিয়েছেন, তাদের সবাইকে বাসদ এর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা, কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাই।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১৯২৬ সালে ফেনী আগমনের শতবর্ষ পালন উপলক্ষে এমন একটা সময়ে আমরা মিলিত হয়েছি যখন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী শক্তি অশান্তির আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে। কোনোরকম রাখঢাক না রেখে একদম খোলামেলা চেহারায় দস্যুতা, লুণ্ঠন-যুদ্ধ ও আধিপত্য বিস্তারের উন্মত্ততায় মেতে উঠেছে। ছুড়ে ফেলেছে তাদের এককালের বহুল উচ্চারিত মানবতা, সভ্যতার অঙ্গীকার। সাম্প্রদায়িকতাকে সুড়সুড়ি দেওয়া কিংবা সরাসরি হাতিয়ার করার কাজে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে, মানুষকে বিভক্ত করার কাজে সাম্প্রদায়িকতাকে কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী এক সাম্রাজ্যবাদের কোল থেকে আরেক সাম্রাজ্যবাদের কোলে ঠাঁই নিয়ে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অধিকতর বিপন্ন করে তুলছে। এদের কারণে ক্ষমতার হাতবদল, পালাবদল হলেও জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা, গোষ্ঠী সন্ত্রাস, আর্থিক ব্যয়ভার ও কর্মহীনতার সংকট চরমে উঠেছে। এরা জাতির অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি বিনাশের নতুন নতুন রাস্তা খুলেছে। তিন ধারায় খণ্ডিত শিক্ষাকে সর্বনিম্ন ধাপে নামিয়ে এনেছে। গরিব মানুষের স্বাস্থ্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার চেয়েও মৃত্যুকামনা বড় হয়ে উঠেছে। এসবের প্রতিকার তথা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণ অভ্যুত্থানের প্রকৃত গণ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযুক্ত শক্তি ও সংস্কৃতি গড়ে তুলে সঠিক পথের সন্ধান করাও যে এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারই অংশ হিসেবে আজকের এই আয়োজন।
শুরুতেই বলে রাখি, আমাদের এই ভূখণ্ডে—বর্তমান বাংলাদেশে—নজরুল বহুবার এসেছেন এবং নির্বাক অবস্থায় স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে আনার পর শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে জন্মস্থানের সীমানা ডিঙিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবির গৌরবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে আমাদের দলের পক্ষ থেকে নজরুলের ওপর আলোচনার ভিত্তিতে ১৯৯২ সালে মার্কসবাদী দৃষ্টিতে নজরুল নামে একটি পুস্তক প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তা বর্ধিত কলেবরে ২০১৪ সালে নজরুল স্মরণে নামে মুদ্রিত হয়। সেখানে যথাসম্ভব আমরা নজরুলের জীবন ও সংগ্রামের বহুমুখী দিকের ওপর আলোকপাত করেছি। সময়ের বিবেচনায় আজ বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। প্রাসঙ্গিকভাবে শুধু বলে রাখছি যে, নজরুলের ওপর আলোচনার গুরুত্ব এবং প্রয়োজন তখন দেখা দিয়েছিল, কারণ সেই সময় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক একটি গোষ্ঠী নজরুলকে মুসলমানের কবি চিত্রিত করে আলোচনা-অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। তাই নজরুলের ওপর একটি সামগ্রিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ হাজির করা তখন জরুরি হয়ে পড়েছিল। সেক্ষেত্রে আমরা নজরুলকে সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতে আবদ্ধ করার অসৎ উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এখানে একটি কথা বলা দরকার—সেই বইটিতে নজরুলের বিভিন্ন উপলক্ষে ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, খুলনা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বাকেরগঞ্জ ইত্যাদি স্থানের উল্লেখ থাকলেও ১৯২৬ সালে তাঁর ফেনী আগমনের তথ্য জানা না থাকায় উল্লেখ করতে পারিনি। আরও কিছু স্থানের উল্লেখও বাদ থাকতে পারে। সেজন্য বিশেষভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
সংগ্রামী বন্ধুগণ,
আপনারা জানেন, কৃষিনির্ভর অর্থনীতিরকালে ভারতবর্ষ—বিশেষ করে বঙ্গদেশ কৃষি, কৃষ্টি, পরিবেশ-প্রকৃতি, আবহাওয়া-জলবায়ু, ঋতুবৈচিত্র্য, পানি-পলি ইত্যাদি মিলে অভাবনীয় প্রাচুর্য সৃষ্টি করেছিল। তার আলোকচ্ছটা বহুদূরগামী ছিল বিধায় ভারতবর্ষে পর্তুগিজ-ওলন্দাজ, শক-হুন, তাতার-আফগান, পাঠান-মোগল, ব্রিটিশদের বণিকী লুণ্ঠনের কাহিনিতে ভরপুর। মোগলরাই শুধু স্থায়ী হয়ে শাসককুলে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাজত্ব প্রায় দুশো বছরের শাসন কায়েম শেষে বিদায় নিয়েছে। আজকের বাংলাদেশের ভূমিজুড়ে কৃষি, কৃষ্টি বা বাণিজ্যের বিকাশ বিদেশি শাসন-শোষণে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার অনন্যতা সম্পূর্ণ বিনষ্ট ছিল না। ফেনী যে তার ব্যতিক্রম নয়, তা ফেনীর অন্যতম কৃতী সন্তান নাট্য আন্দোলনের ব্যতিক্রমধারার স্রষ্টা সেলিম আলদীন ২০০৭ সালের ২৩ জুন ফেনীতেই এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন—
‘…একসময় ফেনী ছিল বাংলাদেশের অন্যতম অসাম্প্রদায়িক লীলাভূমি। আমার মনে আছে, তখন ডাক্তারপাড়া, ফেনী কলেজ, মাস্টারপাড়া সংগীত ও নাট্য চর্চায় মুখরিত। ফেনী কলেজের রেওয়াজ ছিল বার্ষিক নাট্যানুষ্ঠানের। ১৯৬৬ সালে আমি কলেজের সেই বার্ষিক নাটকে দুই দিনব্যাপী অভিনয়ে অংশগ্রহণও করেছি। তখন ফেনী শহর ছিল ছোট, কিন্তু অন্তর ছিল অনেক বড়।’ ‘ফেনী সমগ্র বাংলাদেশের একটি দৃষ্টান্তস্থল হয়ে উঠবার চেষ্টা করবে। কারণ আমাদের পূর্বজনের মধ্যে রয়েছেন কালজয়ী মানুষেরা। তাদের কেউবা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, কেউবা জহির রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সার।’
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ লিখেছিলেন উপন্যাস লালসালু, জহির রায়হানের সাহিত্যকর্মের বাইরে তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্র, শহীদুল্লাহ কায়সারের বিপ্লবী ভূমিকা ও সাহিত্যরচনা মানুষকে যুক্তিবাদী ও মানবিক করে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। সেলিম আলদীন তাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বলেন, ‘যে জাতি একদিন মসলিন বুনে ইউরোপে রূপকথার দেশে পরিণত হয়েছিল, সে জাতি এখন সেলাই মেশিনের দ্রুততম চলমানতার ওপর চোখ রাখে। ও না হলে টাকা মিলবে না। …’ কারণ ‘পণ্য সভ্যতার এক হীন ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছে মানুষ। …’
নজরুলের সাহিত্যকর্মের কথা আলোচনা প্রসঙ্গে একথা উল্লেখ করা যেতে পারে—ফেনী পরশুরামের কৃতী সন্তান হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও তার বোন শামসুন্নাহার মাহমুদকে নিয়ে কবি নজরুল কবিতা লিখেছেন।
সবকিছু বিবেচনায় এ অনুষ্ঠানের এবং এ ধরনের নানা উদ্যোগের পেছনে আয়োজকদের এ চিন্তাও কাজ করে থাকতে পারে যে, ফেনীর হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আবারও সমৃদ্ধ করে তাকে উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দিতে হবে। এই কাজের জন্য ইতিমধ্যে শতাধিক সাহিত্য-নানামুখী কর্মকাণ্ডে সাক্ষর রাখা ব্যক্তিত্বের সন্ধান আমরা পাই। তাদের অনেকের নাম করা যায় এবং কেউ কেউ উপস্থিতও আছেন। তাদের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কিছু প্রকাশনা—যেমন সম্পাদক শাবিহ মাহমুদ, নির্বাহী সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী, প্রকাশক রাবেয়া সুলতানা ও সম্পাদকমণ্ডলীর ৬ সদস্য মিলে ফেনী সাহিত্য সভা ২০২৫ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন—তা কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও প্রশংসার দাবি রাখে।
আজকের এই সভায় নজরুল সম্পর্কে দু-চার কথা বলার আগে এটা স্বীকার করতে হবে যে, বহুবিচিত্র ধারায় বিকশিত ও প্রসারিত নজরুলকে এখনও আমরা সামগ্রিক পূর্ণতায় ধারণ করে উঠতে পারিনি। এর জন্য অনেক সাধনা ও সময়ের প্রয়োজন। তারপরও যতটুকু তাকে আমরা জানতে পাই—তিনি একাধারে কবি, গল্পকার-উপন্যাসিক, নাট্যকার-অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, গীতিকার-গীত্যালেখ্য ও গীতিনাট্য রচয়িতা, সুরকার-গায়ক, বাদক, সাংবাদিক-সম্পাদক, পত্রিকা পরিচালক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র কাহিনিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সৈনিক। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারও ধারেকাছেও এত গুণের সমাহারের তুলনা চলে না।
নজরুলের উত্থানের প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গেলে আসে—প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়ার রাজ্যগ্রাসলিপ্সা ও ধ্বংসতাণ্ডব; ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের নতুন সভ্যতার উন্মেষ; কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে নব্য তুরস্কের জাগরণ, ভারতে ইংরেজদের বর্বর নিপীড়ন-হত্যাযজ্ঞ এবং ভারতীয় নবজাগরণের সম্ভাবনা, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ফণা—সবকিছু মিলে নজরুলের ভাবমনে এক দুঃখবেদনা ও মহোদ্দীপনার দ্যোতনা তৈরি করেছিল, যার ভেতর দিয়ে নজরুল বিদ্রোহী কবি নজরুল হয়ে উঠেছিলেন।
সেজন্য তিনি বলেছিলেন, ‘বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযান-সেনাদলের তূর্যবাদকের একজন আমি, …আমি জানি, এই পথযাত্রার পাকে পাকে বাঁকে বাঁকে কুটিলফণা ভুজঙ্গ প্রখর দর্শন, শার্দূল পশুরাজের ভ্রূকুটি! এবং তাদের নখর-দংশনের ক্ষত আজও আমার অঙ্গে অঙ্গে। তবুও ওই আমার পথ, ওই আমার গতি, ওই আমার ধ্রুব।’
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন শুরু থেকে ব্রিটিশের বিদায় পর্যন্ত ৪টি ধাপের সময়কাল এভাবে বিভক্ত করা যায়—
১৭৫৭-১৮৫৭ : বিদ্রোহ শুরু এবং মহাবিদ্রোহ
১৮৫৭-১৮৮৫ : মহাবিদ্রোহ থেকে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা
১৮৮৫-১৯০৫/৬ : বঙ্গভঙ্গ এবং মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা
১৯০৬-১৯৪৭ : ব্রিটিশ শাসনমুক্ত
কাজী নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এবং ১৯৪২ সালে বাকশক্তি রহিত হয়ে অসুস্থবোধ ও ক্রমাগত তার অবনতি হতে থাকে। ২৪ বছর নির্বাক হয়ে জীবিত থেকে ১৯৭৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে ১৯৭২ সালে জাতীয় কবি রূপে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং এখানেই তিনি ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে ১৯৪২ পর্যন্ত ছিল তাঁর সাহিত্যসাধনা ও সংগ্রামেরকাল।
নজরুল কীভাবে স্বাধীনতাকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তা কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির বক্তব্য থেকেই ধারণা করা যায়। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে নজরুল সম্বর্ধনায় সভাপতি বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা আগামী সংগ্রামকে কবি নজরুলের সঙ্গীতকণ্ঠে ধারণ করে শ্রীমান সুভাষের মতো তরুণ নেতাদের অনুসরণ করব। ফরাসি বিপ্লবের সময়কার কথা একখানা বইতে সেদিন পড়তে ছিলাম। তাতে লেখা দেখলাম, সে সময় প্রত্যেক মানুষ অতি-মানুষে পরিণত হয়েছিল। আমার বিশ্বাস নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধরেরা এক-একটি অতি-মানুষে পরিণত হবে।’
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব, তখন সেখানে নজরুলের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনও তাঁর গান গাইব।’
কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৮৪-১৯৭০) ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্য’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘স্বদেশী আন্দোলনের সমস্ত বীর্য নিয়ে তিনি (নজরুল) বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হলেন। তাঁর অপূর্ব তারুণ্য আর অপূর্ব স্বাধীনতাপ্রীতি দেখতে দেখতে তাঁকে প্রিয় করে তুললো বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে। নজরুল ইসলাম একালের বাঙালি, যিনি বাংলার মুসলমান ও হিন্দু উভয়ের চিত্ত আন্দোলিত করতে সক্ষম হলেন।’
১৯২৬ সালে তিনি ফেনীতে আসেন। সে সময়ে তাঁর ফেনীতে আগমনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন তিনি সে সময় কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ঢাকা বিভাগ থেকে। কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে সমগ্র ঢাকা বিভাগ ছিল (ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে)। মোট প্রার্থী ছিল ৫ জন—১. মুহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী (বরিশালের জমিদার), ২. আবদুল হালিম গজনবী (তখনও নাইট হননি), ৩. আবদুল করিম (ঢাকার নবাববাড়ির লোক), ৪. কাজী নজরুল ইসলাম, ৫. মফিজউদ্দিন আহমদ। জিতেছিলেন ইসমাইল চৌধুরী ও আবদুল হালিম গজনবী। সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটার ছিল ১৮,১১৬ জন।
তিনি ১৯২৫ সালে শ্রমিক-প্রজা স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। এই পার্টির মুখপত্র লাঙল পত্রিকা শ্রমিকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছিল যা আজও প্রাসঙ্গিক। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, সপ্তাহে সাড়ে ৫ দিন কর্মদিন করা, নারী ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ শর্ত, শ্রমিকের আবাসন ও চিকিৎসার বন্দোবস্ত আইন দ্বারা বাধ্য করা, অসুখ-বিসুখ-দুর্ঘটনা, বেকার অবস্থা ও বৃদ্ধ অবস্থায় শ্রমিক রক্ষা আইন, মালিকদের খরচায় শ্রমজীবীদের বাধ্যতামূলক শিক্ষা, লাভের ভাগে শ্রমিকদের অধিকারী করা, কলকারখানার নিকট থেকে বেশ্যালয় ও নেশার দোকান উঠিয়ে দেওয়া, শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতির জন্য কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান করা, শ্রমিক সংঘগুলিকে আইনত মানিয়া নেওয়া, আর কৃষকদের জন্য কো-অপারেটিভ কৃষি ব্যাংক স্থাপনের দ্বারা কৃষককে ঋণদান এবং মহাজনি ও লোভী ব্যবসাদারদের হাত থেকে কৃষককে উদ্ধার করার দাবি উল্লেখিত হয়েছিল।
ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামের পাশাপাশি দেশীয় শোষকদের তৎপরতাও তাঁর চোখ এড়ায়নি। তাই তাঁর আহ্বান ছিল—
‘বল! কারও অধীনতা মানি না, স্বদেশীরও না, বিদেশীরও না।
কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর/ বাঙালীর খুনে লাল হলো যেথা ক্লাইভের খঞ্জর/ ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর/ উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’
তিনি ১৯২৫ সালে লাঙল পত্রিকা প্রকাশ করেন। লাঙল পত্রিকায় কী কী থাকবে তা তিনি প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছিলেন—১. কবিতা, ২. গোর্কির মা-এর ধারাবাহিক অনুবাদ, ৩. মার্কসের জীবনী, ৪. প্রজাস্বত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা, ৫. গণআন্দোলন-সম্বন্ধীয় পুস্তকের আলোচনা, ৬. ১টি করে ছবি। এই তালিকা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সাম্যবাদী চিন্তা তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
এরপর ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট থেকে লাঙল গণবাণী নামে প্রকাশিত হতে থাকে। তার পর যুগবাণী প্রকাশিত হওয়ার এক মাসের মধ্যেই তা বাজেয়াপ্ত হয়।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নজরুলকে শুধু ব্যথিতই করেনি, দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধও করেছে। সাম্প্রদায়িকতার বিপদ এবং ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মনন গড়ে তুলতে তাঁর লেখা আজও প্রাসঙ্গিক। ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল রাজরাজেশ্বরী পূজা উপলক্ষে মসজিদের পাশে গান-বাজনাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ এক দাঙ্গার সূচনা হয়। ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল দাঙ্গায় ৪৪ জন নিহত, ৫৮৪ জন আহত হয়। ২২ এপ্রিল দাঙ্গায় ৬৬ জন নিহত, ৩৯১ জন আহত হয়। এর জবাবে ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার!’, ‘মন্দির-মসজিদ’, ‘হিন্দু-মুসলমান’, ‘যুদ্ধ’ ইত্যাদি কবিতা ও প্রবন্ধ রচনা করেন। ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিলের দাঙ্গার প্রেক্ষিতে ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন—
‘আবার হিন্দু-মুসলমানি কাণ্ড বেধে গেছে। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, তারপর মাথা ফাটাফাটি আরম্ভ হয়ে গেল। আল্লার এবং মা কালীর প্রেস্টিজ রক্ষার জন্য যারা এতক্ষণ মাতাল হয়ে চিৎকার করছিল, তারাই যখন মার খেয়ে পড়ে যেতে লাগল—দেখলাম, তখন আর তারা আল্লামিয়া বা কালীঠাকুরানির নাম নিচ্ছে না। হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়ে থেকে এক ভাষায় আর্তনাদ করছে—“বাবা গো, মা গো।” মাতৃপরিত্যক্ত দুইটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করে এক স্বরে কেঁদে তাদের মাকে ডাকে। দেখলাম, আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাদের বেদী চিরকলঙ্কিত হয়ে রইল।’
তিনি লেখেন, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তার প্রাণ।’ ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।’
রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ১৯১৭ সালে সংঘটিত হলে তা নজরুলকেও প্রভাবিত করে। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনায় ‘ফরিয়াদ’-এ লেখেন—
‘এই ধরনীর যাহা সম্বল/ বাসে ভরা ফুল, রসে ভরা ফল/ সুস্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল, পাখির কণ্ঠে গান/ সকলের এতে সম অধিকার এই তার ফরমান।’
‘বিংশ শতাব্দীতে’ লেখেন—‘পূর্বে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে/ ইউরোপ, রাশিয়া, আরব মিশর চীন/ আমরা আজিকে একপ্রাণ একদেহ/ এক বাণী—কারো অধীনে রবে না কেউ।’
‘অগ্রপথিক’-এ লেখেন—‘আয়ারল্যান্ড, আরব, মিশর, কোরিয়া, চীন/ নরওয়ে, স্পেন, রাশিয়া সবার ধরি গো ঋণ/ সবার রক্তে মোদের লোহর আভাস পাই/ এক বেদনার কমরেড ভাই মোরা সবাই।’
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অসারতা তুলে ধরে তিনি যুক্তির ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছেন, শোষককে চিনতে যেন ভুল না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘দেশে একটা কথা উঠেছে যে, মুক্তির জন্য যে আন্দোলন আমরা চালাচ্ছি, আমাদের তা ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে নিতে হবে। …আমরা শুনতে পাচ্ছি যে, আমাদের ধর্মের ভেতর দিয়ে চলতে হবে। …ওরে পতিত, ওরে চিরলাঞ্ছিত, তুই দেখ সারা বিশ্ব তোকে ধ্বংস করতে উদ্যত। …আচার তার জগদ্দলপাথর তোর বুকে বসিয়ে দিয়েছে, সমাজ তোর কণ্ঠরোধ করে ফেলেছে। ধনীর অট্টহাস্য তোর প্রাণের করুণ কাঁদুনি ঢেকেছে। …যার ঘরে বসে কথা বলার অধিকার নেই, দুপুর-রাতে দুঃস্বপ্নে যার ঘুম ভেঙে যায়, অত্যাচারকে চোখ রাঙানোর যার শক্তি নেই, তার আবার ধর্ম কী? যাকে নিজের ঘরে পরেই এসে অবহেলায় পশুর মতো মেরে ফেলতে পারে, যার ভাই-বোন, বাবা-মাকে মেরে ফেললেও বাক্যস্ফুট করার আশা নেই, তার আবার ধর্ম কী? দুবেলা দুটি খাবারের জন্যই যার বাঁচা, একটুখানি আরাম করে কাল কাটিয়ে দেওয়ার জন্যই যার থাকা, তার আবার ধর্ম কী? মানুষের দাস তুমি, তোমার আবার ধর্ম কী?’
ধর্মীয় প্রচারণার রাজনীতি ও শাসন-শোষণের পক্ষের শক্তির উদ্দেশ্যে বলেন—
‘…ধর্ম আন্দোলনের ছদ্মবেশে এরা কুৎসিত/ বলে এরা হয়ে মন্ত্রী, করবে স্বধর্মীদের হিত।’
ধর্মের নামে কড়াকড়ির ফলাফল দেখে তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘আজ বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একজন চিত্রশিল্পী নেই, ভাস্কর নেই, সংগীতজ্ঞ নেই, বৈজ্ঞানিক নেই—ইহা অপেক্ষা লজ্জার আর কী আছে? যারা জন্মগত প্রেরণা নিয়ে এসেছিল, আমাদের গোঁড়া সমাজ তাদের টুঁটি চেপে মেরে ফেলেছে ও ফেলছে।’
সাম্প্রদায়িকতা যে শাসকদের বড় অস্ত্র, তা চিনতে তাঁর ভুল হয়নি। ১৯৩১ সালে কুহেলিকা উপন্যাসের একটি চরিত্র প্রমত্তের মুখ দিয়ে তিনি বলান, ‘ইংরেজদের ভারত শাসনের বড় অস্ত্রটি কী জানিস? আমাদের পরস্পরের প্রতি এই অবিশ্বাস, পরস্পরের ধর্মকে আন্তরিক ঘৃণা ও অশ্রদ্ধা। এই ভেদনীতিই ইংরেজের বুটকে ভারতের বুকে কায়েম করে রেখেছে। …যেদিন ভারত একজাতি হবে, সেদিন ইংরেজকেও বোঁচকা পুটলি বাঁধতে হবে।’
আর এক চরিত্র অনিমেষ বলেন, ‘আমরা বিপ্লববাদী, কিন্তু গোঁড়ামিকে আজও আমরা পেরোতে পারিনি—ধর্মকে বাদ দিয়ে মানুষকে দেখতে শিখিনি।’
প্রমত্ত আরও বলেন, ‘হিন্দু-মুসলমান—এ দুটো নামের মন্ত্রৌষধই ইংরেজের ভারত সাম্রাজ্য রক্ষার রক্ষাকবচ।’
মানুষকে অস্পৃশ্য ভাবার ছোঁয়াচ থেকে মুক্ত হয়ে মানবিক বোধে উন্নীত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি যুক্তিতে এবং আবেগে—‘হিন্দু, হিন্দু থাক্, মুসলমান, মুসলমান থাক্, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়িয়ে মানব, তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি! বল দেখি—আমার মানুষ ধর্ম। দেখবে দশদিকে সার্বভৌমিক সাড়ার আকুল স্পন্দন কেঁপে উঠছে। …মানবতার এই মহাযুগে একবার গণ্ডি কেটে বেরিয়ে এসে বল যে, তুমি ব্রাহ্মণ নও, শূদ্র নও, মুসলমান নও, তুমি মানুষ—তুমি সত্য।’
নজরুল বাংলার সংগীতের এক বিশাল ভাণ্ডার সৃষ্টি করে দিয়ে গেছেন—গজল, কাওয়ালি, নাত-গীত, ভজন-কাব্যগীতি, দেশাত্মবোধক গান, কোরাস-কুচকাওয়াজের গান, ধর্মীয় সংগীত, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, রাগপ্রধান গান, শিশুসঙ্গীতসহ তিন হাজারের বেশি গান রচনা করেন। কবিতা যে কত বড় সামাজিক দায় পালন করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন নজরুল। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ‘যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে’ প্রবন্ধে ক্ষেত্র গুপ্ত লেখেন—‘শরৎচন্দ্র বাংলা কাহিনিকে এবং নজরুল বাংলা কবিতাকে অল্প ও মধ্যশিক্ষিত অগণিত বাঙালি পাঠকের কাছে নিয়ে আসেন। …নজরুল আরও একটা বড় কাজ করেছিলেন, খুব বড়—বাঙালি মুসলমানকে বাংলা সাহিত্যের আপনজনে পরিণত করলেন। বাংলা সাহিত্যের হিন্দু প্রাধান্য যদি বিংশ শতকের নবশিক্ষিত মুসলমান তরুণদের স্বতন্ত্র ইসলামী বাংলা সাহিত্যের সন্ধানে উৎসাহী করে তোলে, তাকে স্বাভাবিক বলেই মানতে হবে। কিন্তু তার ফলে বাংলা সাহিত্যের যে বিভাজন দেখা দিতে পারত—কিছুটা তো দেখা দিয়েছিল—তাকে রাশ টেনে রুখে দিলেন নজরুলই। মুসলমানদের বাংলা সাহিত্যের মূলস্রোতের অভিমুখিতা ঘটল তাঁর রচনাবলির মাধ্যমে। একই সঙ্গে বাঙালি হিন্দু পুরাণের প্রসঙ্গ এবং ইসলামী কাহিনি ও বিশ্বাসের জগতকে পেল নজরুল, গ্রহণে দ্বিধা করল না। ঠিক তেমনি মুসলমান পাঠকও এই যুক্তবেণী কাব্যস্রোতে সহজে অবগাহন করতে পারল। বাংলা সাহিত্যের পক্ষে এই ঘটনার গুরুত্ব খুবই বেশি।’ এ প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতাটি স্মরণযোগ্য—
‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে/ ভাগ হয়নি কো নজরুল/ এই ভুলটুকু বেঁচে থাক/ বাঙালি বলতে একজন আছে/ দুর্গতি তার ঘুচে যাক।’
নজরুল নিজের ভাষায় বলেছেন, ‘আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এ-সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দুদের দেবীর নাম নেই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার কাব্যের সৌন্দর্যহানি হয়েছে। তবু আমি জেনেশুনেই তা করেছি।’ সব উদ্যোগ এবং আয়োজন যেন তাৎক্ষণিক না হয়, সেই বিবেচনায় তিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা ভেবেছেন। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামে এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে সভাপতির ভাষণে বলেন, ‘আমি বলি, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের মতো আমাদেরও কালচারের—সভ্যতার জ্ঞানের সেন্টার বা কেন্দ্রভূমির ভিত্তি স্থাপনের মহৎ ভার আপনারা গ্রহণ করুন। …আমি এই রূপ কালচারাল সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি নানা কারণে। একটি কারণ তার রাজনৈতিক। পলিটিকেল নাম শুনে কেউ যেন চমকে উঠবেন না। আমি জানি, আপনাদের এই সমিতি রাজনীতি আলোচনার স্থান নয়, তবু যেটুকু না বললে নয়, আমি শুধু ততটুকুই বলব এবং সেটুকু কারও কাছে ভয়াবহ হয়ে উঠবে না। ভারত যে আজ পরাধীন এবং আজও যে স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু হয়নি—তার একমাত্র কারণ আমাদের হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি হিংসা ও অশ্রদ্ধা। …যদি পারেন, মাতৃভাষায় আপনাদের সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস-সভ্যতার অনুবাদ ও অনুশীলনের কেন্দ্রভূমি যেখানে হোক প্রতিষ্ঠা করুন।’
সমাজে যত রকমের বিভক্তি ও বিদ্বেষ চর্চা হয়, সেসবের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সক্রিয়। নারীর লাঞ্ছনায় সহানুভূতির চেয়েও সংগ্রামের পথে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। নারীর অবদানের স্বীকৃতি ও সংগ্রামের আহ্বান ছিল লেখার মূল ভরকেন্দ্র। লিখেছেন—
‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর/ …মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও শিকল/ …দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন ঐ যত আভরণ।’
নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর আহ্বান ছিল অগ্নিঝরা—
‘কারার ঐ লৌহ-কপাট/ ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট/ …লাথি মার ভাঙ রে তালা/ যত সব বন্দীশালা/ আগুন জ্বালা/ আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি।’
‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল …। এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল’।
কৃষকের বঞ্চনা ও মহাজনের শোষণের রূপ তুলে ধরেছেন তিনি তাঁর লেখায়। ‘চাষী সমস্ত বৎসর ধরিয়া হাড়-ভাঙা মেহনৎ করিয়া মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়াও দুবেলা পেট ভরিয়া ভাত-মাড় খাইতে পায় না, হাঁটুর উপর পর্যন্ত একটা টেনা বা নেঙটি ছাড়া তাহার আর ভালো কাপড় পরন সারা জীবনেও ঘটিয়া ওঠে না, ছেলেমেয়েদের সাধ-আরমান মিটাইতে পায় না, অথচ তাহারই ধান-চাল লইয়া মহাজনরা পায়ের উপর পা দিয়া বার মাসে তেত্রিশ পার্বণ করিয়া নওয়াবী চালে দিন কাটাইয়া দেন।’
তরুণ ও যুবকেরা ছিল তাঁর ভরসা। তাই তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতি নিয়ে ভেবেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘আমরা চাই আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি এমন হউক, যাহা আমাদের জীবনীশক্তিকে ক্রমেই সজাগ, জীবন্ত করিয়া তুলিবে। যে শিক্ষা ছেলেদের দেহমন দুইকেই পুষ্ট করে, তাহাই হইবে আমাদের শিক্ষা। …’
পৃথিবীতে অন্যায় থাকবে আর তাঁর বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে না—এটা ইতিহাসের শিক্ষা নয়। ইতিহাসের শিক্ষা থেকেই তাঁর প্রতিজ্ঞা, ‘আমি সেই দিন হবো শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ-কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না। আমি সেই দিন হবো শান্ত।’
সংগ্রামের পথে বাইরের বাধার চাইতেও দোদুল্যমান মানসিকতা অনেক বেশি ক্ষতিকারক। ফলে এর বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল অবিরাম। কংগ্রেসের নেতাদের আপসমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল শাণিত। তিনি তীব্র কশাঘাত করেছিলেন এই দোদুল্যমানতার বিরুদ্ধে।
‘বুকের ভিতর ছ-পাই ন-পাই, মুখে বলিস স্বরাজ চাই—স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্ছে দরাজ-তাই।’
‘ভারত হবে ভারতবাসীর’—এই কথাটাও বলতে ভয়, সেই বুড়োদের বলিস নেতা—তাদের কথায় চলতে হয়।’
তারুণ্যকে তিনি চিহ্নিত করেছেন সাহস, শক্তি আর উদ্দীপনার বাহন হিসেবে। ফলে প্রত্যাশা আর প্রতীক্ষা ছিল সেই তরুণের প্রতি যারা সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন সেই তরুণের জন্য—তরুণ নামের জয়-মুকুট শুধু তাহার—যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতি-বেগ ঝঞ্ঝার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ়-মধ্যাহ্নের মার্তণ্ড-প্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অতল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে। তারুণ্য দেখিয়াছি আরবের বেদুঈনের মাঝে, তারুণ্য দেখিয়াছি মহাসমরের সৈনিকের মুখে, কালাপাহাড়ের অসিতে, কামাল-করিম-জগলুল সানইয়াৎ-লেনিনের শক্তিতে। সংগ্রামের পথ যে কত বিপদ ও বেদনার, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘…শত্রুর সেনা যখন তোমার ঘরে রক্তস্রোত বহাইয়া দিবে, তখন তোমার চক্ষু পশ্চাতে ফিরিবে না তো? …তোমরা এ অন্ধকারে চলিতে পারিবে তো? …মাতার ক্রন্দন, প্রিয়ার ব্যাকুলতা দলিত করিয়া একা এই অন্ধকারে পথ চলিতে পারিবে তো?’
সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে যেন তরুণরা আচ্ছন্ন না হয়, পথ হারায়, সেকারণে অতীতের উদাহরণ দিয়ে তাদের মনটাকে বড় করার চেষ্টা করেছেন। নন্দলাল বসু মোগল যুগের যে প্রখ্যাত শিল্পীদের নাম করেছেন, তার মধ্যে ১০৮ জন হিন্দু, ৯১ জন মুসলমান। ঐ সময়ের বহু শিল্পকর্ম হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শিল্পীদের মিলিত ফসল। মুসলমান কবিরা সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। ভারতীয় সনাতন সঙ্গীত হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাধনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। … মধ্য যুগের প্রধানতম স্থাপত্য তাজমহল উভয় সম্প্রদায়ের স্থাপত্যশৈলীর মিলনের নিদর্শন। মন্দিরের স্থাপত্যরীতি ছায়া ফেলেছে মসজিদের গায়ে, মসজিদের গঠনে পাওয়া যায় মন্দিরের ছাপ।
তিনি বলেছেন, ‘আদম, দাউদ, ঈসা-মূসা, ইব্রাহিম, মোহাম্মদ / কৃষ্ণ, বুদ্ধ, নানক, কবীর—বিশ্বের সম্পদ / আমাদেরই এরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে / তাদেরই রক্ত কমবেশি করে প্রতি ধমনীতে বাজে।’
যৌবনের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে যেমন চেষ্টা করেছেন, তেমনি নিজেও চিন্তা, কর্ম ও সাধনায় লিপ্ত ছিলেন। নিজের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে কোথা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, তা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব—অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণস্তূপের মতো জমা হয়ে আছে—এই অসাম্য, এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম।’
আজ সমাজে যখন এত বৈষম্য ও ভেদাভেদ, তারুণ্যের শক্তির অপচয়, তখন নজরুলের সেই আকুতি যেন কিশোর-তরুণ, যুবসমাজের আহ্বানের মতো সংগ্রামের পথে অবিচল রাখে—এই প্রত্যাশা আমরা করি।
— মাসিক ভ্যানগার্ড, আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২৬





