spb-logo

শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ, গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্ররাজনীতির আদর্শবাদী বিপ্লবী ধারাকে শক্তিশালী করার আহ্বান

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলনের র‍্যালি, লাল পতাকা ও ব্যানার হাতে শিক্ষার্থীরা
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে ৭ অক্টোবর ঢাকায় র‍্যালি

সবার জন্য শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা, উন্নত সংস্কৃতি অর্জন আর নৈতিকতার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বানে অনুষ্ঠিত হলো সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন। ৭ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সম্মেলনের উদ্বোধন ও র‍্যালি এবং বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আলোচনাসভা, কমিটি পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ-এর সভাপতিত্বে সম্মেলন উদ্বোধন করেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান।

বিকেলের আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজিম তিতিল, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলী রায়হান সরকার, শ্রীলঙ্কার সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (SSU)-এর ন্যাশনাল কমিটির সদস্য ডিলান আরোসা, অল নেপাল ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্ট স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (রেভ্যুলিউশনারী) (ANNISU)-এর সহসভাপতি কৃষ্ণ বাহাদুর সোনার এবং ছাত্র ফ্রন্টের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক রিনা মুরমু। সম্মেলনে ভারতের আইসার পক্ষ থেকে সভাপতি নেহা বোরা ও পাকিস্তানের ডিএসএফ-এর পক্ষ থেকে কাফি সোমা ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছে। উভয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন—রাজনীতির জমিনে বর্তমানে চলছে ভূমিকম্প, নীরব দুর্ভিক্ষ নিঃশব্দে এগিয়ে চলছে জনজীবন লন্ডভন্ড করে। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা সংকটকালের বড়ো দুঃসময়ে, নবজাগরণ ও মুক্তির দুর্বার সংকল্প নিয়ে যৌবন-তারুণ্যের অদম্য শক্তির আশা জাগানিয়া আজকের এই সমাবেশকে জানাই বিপ্লবী অভিনন্দন।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সম্মানিত সভাপতি, ছাত্র ফ্রন্টের জন্মলগ্ন থেকে যারা মেধা, শ্রম ও সাধনা দিয়ে সংগঠনকে আজকের জায়গায় আনতে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে যারা আজ উপস্থিত হয়েছেন নানা কারণে যারা আসতে পারেননি এবং যারা চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছেন, তাদের সকলের প্রতি রইল অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। উপস্থিত আমন্ত্রিত স্বদেশি ও বিদেশি সংগঠনসমূহের নেতা ও কর্মীবৃন্দ, বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও গণসংগঠনসমূহের নেতাকর্মীবৃন্দ, বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হওয়া সুধীজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যবৃন্দ, আজকের আয়োজনে যারা অর্থ দিয়ে, ভরসা দিয়ে, নানামুখী সহযোগিতা দিয়ে অংশীজন হয়েছেন, তাদের সবার প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন।

সংগ্রামী বন্ধুগণ, একটু পরেই হবে সম্মেলনের উদ্বোধন। বিকেলের অধিবেশনে আমাদের নেতৃবৃন্দ বিস্তারিত কথা বলবেন। আমন্ত্রিত ছাত্র নেতৃবৃন্দ তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। আমি উদ্বোধনের আগে আপনাদের সামনে দু-চারটি বিষয়ে কথা বলে নিতে চাই। অনেক প্রশ্ন দেশের জনগণের মনে। অনেক জিজ্ঞাসা চারদিকে; এর সব বিষয়ে আমরা আজকের আলোচনায় তুলে ধরতে পারব না।

এখন যে কথাটা সামনে আসছে—বারেবারে এ দেশে অভ্যুত্থান হয়, গণ আন্দোলন হয়; ছাত্র-শ্রমিক, কৃষক-নারী, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী সর্বস্তরের মানুষ জীবন দেয়, সংগ্রাম করে, রক্ত ঝরায় এবং সংগ্রামে জয়লাভ করে। কিন্তু অভ্যুত্থান বা আন্দোলনে বিজয়ের পরে জনগণের কাছে তার সুফল আসে না কেন? যতদিন আন্দোলন চলে, ততদিন তারা সামনে থাকে। যখন আন্দোলন শেষ হয়, তখন গোটা আন্দোলনের ফসল একটি লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর হয়েছে, ’৯০-এর অভ্যুত্থানে হয়েছে, ’২৪-এর অভ্যুত্থানে হয়েছে। এর কারণ, আমাদের দেশের মানুষ দুই শ্রেণিতে ভাগ হয়ে আছে—৫ ভাগ শোষক, ৯৫ ভাগ শোষিত। আন্দোলন যখন চলে, তখন ৯৫ ভাগ মানুষের আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন, চাওয়া, জীবনদান—সেগুলো সামনে থাকে। কিন্তু যারা কায়েমি স্বার্থবাদীর দল, শোষকগোষ্ঠী, তারা আন্দোলনে গা লাগিয়ে থাকে—যেই বিজয় অর্জিত হয়ে যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র লুটেরা গোষ্ঠী সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। যে কারণে বিজয় পর্যন্ত সামনে থাকে জনতার শক্তি, আর বিজয়ের পর কর্তৃত্বে আসে শোষকের শক্তি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। আওয়ামী লীগ মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল, কিন্তু এটা আওয়ামী যুদ্ধ ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার পর যখন প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হলো, তখন আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে, আন্দোলন পরিচালনাকারী সরকার ভারতে; পুলিশ-আর্মি, বিডিআরের সদস্য—যারা বাহিনী থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল—তাদের হাতে যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল, তা ১০ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা তখনও ভারতে ট্রেনিং নিচ্ছে। এই ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে জুন-জুলাই মাসে। ফলে সংগঠিত প্রতিরোধ না থাকায় এই তিন-চার মাস পাকিস্তানি বাহিনী দেশে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে। এদের প্রতিহত করার জন্য দেশে তখন সামরিক কোনো শক্তি নাই, বাহিনী নাই, অস্ত্রশস্ত্র নাই। তখন নিরস্ত্র মানুষ রামদা-বল্লম, তীর-ধনুক, লাঠি, যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে তাদের প্রতিহত করেছে। নিজেরাই স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে রাস্তা কেটে, ব্রিজ ভেঙে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিরোধ করেছে।

সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ আগেই শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে ১৯ মার্চ পাকিস্তান আর্মি জয়দেবপুর রাজবাড়িতে অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্রীকরণ এবং তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবর পেয়ে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং এলাকা দখলে নেন। ২৮ মার্চ শত সহস্র মানুষ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করে। এরা রংপুর জেলার বিভিন্ন থানা থেকে এসে জড়ো হয়েছিল। এখানে ব্যাপক সংখ্যায় আদিবাসীরা অংশ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের দলিল থেকে দেখা যায়, পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণে এই অসম যুদ্ধে ৫০০ থেকে ১ হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হয়। এরকম গণপ্রতিরোধের অসংখ্য ঘটনা আছে দেশ জুড়ে। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা এত বেশি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেই অনেকে ’৭২ সালকে টেনে আনেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আকাঙ্ক্ষা আকস্মিকভাবে ’৭২ সালের সৃষ্টি নয়। যারা সে ইতিহাস জানেন না, তারাই আজ ইতিহাসের বয়ান দিচ্ছে। ইতিহাস সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখা। তাই বিজ্ঞান গবেষণার যেমন নিয়ম আছে, ইতিহাস অনুসন্ধান ও গবেষণারও বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ম আছে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নিয়মে ইতিহাসকে বর্তমানে হাজির করতে হয়, ব্যাখ্যা করতে হয়। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে ’৭১-এর যুদ্ধ পর্যন্ত জাতিগত চেতনার উদ্ভাসিত মূর্ত রূপ হলো ’৭২। সাম্য-মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি আন্দোলনে মূর্ত রূপ নেওয়া এই চেতনাসমূহ—এগুলো শাসকগোষ্ঠী অস্বীকার করতে পারেনি। এগুলো ছিল শাসকদের বুলি আর, জনগণের প্রকৃত চেতনা। এখন গায়ের জোরে, উচ্চকিত শব্দে মূর্খামির স্রোত তৈরি করে একদল সবকিছু ভাসিয়ে নিতে চায়। কাব্য-দর্শন, রাজনীতি-অর্থনীতি, ঐতিহাসিক বিবরণ—সর্বত্রই এই গোঁজামিল চলছে। এটা চলছে ক্লাসরুমে, বক্তৃতা-বৌদ্ধিক মঞ্চে; কিন্তু এই নিকৃষ্ট-চটকদার উৎপাদিত বস্তুর বাজার বেশি দিন থাকবে না।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাসকগোষ্ঠীর কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয়ে গেল চেতনার সাইনবোর্ড; পরবর্তী শাসকরা তাকে পণ্য প্রচারের বিলবোর্ডে পরিণত করেছে। আর স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা একে তাদের পুনর্বাসনের জাল দলিলে পরিণত করেছে। উড়ে এসে জুড়ে বসা অন্তর্বর্তী সরকার একে তাদের খায়েশপূরণের রিসেট বাটনে পরিণত করতে চেয়েছিল। এখন পুরোনো বিলবোর্ডে রং করার কাজ চলছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বারবার শাসকেরা এগুলো কেন করতে পারল? যদি জনগণের শক্তি—কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-নারীর শক্তি—একটি আদর্শবাদী, প্রগতিশীল বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি সারা দেশের গ্রামগঞ্জে, শহরবন্দরে, কলকারখানায় সব জায়গায় খুঁটির মতো দাঁড়াতে পারত, তাহলে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়নের বদলে চেতনা বাণিজ্য করা সম্ভব হতো না।

স্বাধীনতার আগের সমস্ত গণ আন্দোলন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৫ বছরের রাজনীতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ষষ্ঠ সম্মেলন করছে। জনগণের প্রত্যাশা যে, তারা ইতিহাসের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায় এগোবে, যাতে জনগণের সংগ্রাম-পরিশ্রমের ফসল লুটেরা গোষ্ঠী আত্মসাৎ করতে না পারে। তারা বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মশাল জ্বালিয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে শিক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি সর্বস্তরের শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে; যাতে ভবিষ্যতে মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হয়।

কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ইদানীং একটা কথা চালু হয়েছে—ইনক্লুসিভনেস বা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা। সেটা কী? ৫ ভাগ মানুষের খোঁয়াড়ে ৯৫ ভাগ মানুষকে ঢুকিয়ে দেওয়া। এই ইনক্লুসিভ আমরা মানি না। বিপরীতে আমরা বলি, ৯৫ ভাগ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে—শ্রমিকের সাথে কৃষকের, কৃষকের সাথে ছাত্র-মধ্যবিত্তের, ছাত্র-তরুণ, নারী তথা শোষিত মানুষের পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আমরা সত্যিকারের জনতার ইনক্লুসিভনেস তৈরি করব।

এখন একটা সুবিধাবাদী কথা চালু হয়েছে। কী? রাজনীতিতে নাকি শেষ কথা নাই। তাহলে কি কোনো নৈতিক অবস্থান বলে কিছু থাকবে না? নীতি-আদর্শের প্রশ্নে অবশ্যই শেষ কথা আছে। এই কথার আড়ালে আছে নীতিহীন সুবিধাবাদ ও স্বার্থান্বেষী অবস্থান। সুবিধাবাদীরা নিজেদের সুবিধার জন্য নীতি ত্যাগ করে, আর অজুহাত হিসেবে বলে—‘রাজনীতিতে তো শেষ কথা নাই।’ দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সততা, ৯৫ ভাগ মানুষের স্বার্থ রক্ষা, মানবিকতার কথা বলে—এর বিপরীতে আমি যেতে পারি না। এখানে শেষ কথা আছে। আর নীতি বাস্তবায়নে পরিস্থিতি সাপেক্ষে কৌশলের পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে সময় পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্য কৌশল হচ্ছে অপকৌশল। তা আমরা গ্রহণ করতে পারি না।

বামপন্থিরা যখন বৈষম্য দূর করার নীতির কথা বলে, তখন আর যুক্তি করতে না পেরে একটা কথা চালু করে দেওয়া হয়েছে যে, বামপন্থিরা শুধু দল ভাঙে। আমরা বলি, শুধু ভাঙা দেখেন, গড়া দেখেন না। ভাঙা যেমন আছে, গড়াও আছে। আবার সব ভাঙন একরকম নয়। কিছু ভাঙন বিনাশ করে দেয়, কিছু ভাঙন নবনির্মাণ করে। ১৯১২ সালে রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি দুই ভাগে ভাগ হয়ে বলশেভিক ও মেনশেভিক হয়েছিল। ওই ভাগের ৫ বছর পর বলশেভিক পার্টি বিপ্লব করেছিল। আবার ইউরোপের অনেক পার্টি ভাঙনের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পুরোনো ভুলের আবর্তে থাকা নাকি সঠিকতার লক্ষ্যে নতুন পথ বেছে নেওয়া—এটাই হওয়া উচিত বিতর্কের বিষয়। হাত থেকে ডিম পড়ে ভাঙলে ডিম নষ্ট হয়, আবার মুরগি তা দিয়ে ডিম ফুটালে নবজীবনের আবির্ভাবও হয়। ফলে, সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিচার দরকার।

১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে আমরা যুক্ত হয়েছিলাম। এরপর স্বাধীনতা এসেছে, স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর পার হয়েছে, শিক্ষার দাবিপূরণ হয়নি। আন্দোলনের মধ্যে জেগে ওঠা শিক্ষার দাবিকে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এক স্লোগানে নিয়ে এসেছে—সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার, বৈষম্যহীন একই পদ্ধতির গণতান্ত্রিক শিক্ষা চাই। শাসকগোষ্ঠী অখণ্ড শিক্ষার দাবি ও ব্যবস্থাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করে চালু রেখেছে। এর ফলাফল হচ্ছে, মাদ্রাসা শিক্ষা মানুষকে নিয়ে যায় মধ্যযুগে, ইংরেজি মাধ্যম টানে ইউরোপ-আমেরিকার দিকে, আর সাধারণ শিক্ষা অসাধারণ দৈন্যদশায় নিম্নমুখী হয়ে শিক্ষা-বাণিজ্য, ড্রপআউট আর জ্ঞানবর্জিত ডিগ্রি বিতরণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

বিদ্বজ্জন জানেন এবং মানেন যে, স্বায়ত্তশাসন ও গবেষণা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হয় না। এখন পাবলিক-প্রাইভেট মিলে দেশের ১৭১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৪টিতে নামমাত্র স্বায়ত্তশাসন আছে। শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি যে স্কুলে, তাদের ৪০-৬০ ভাগ প্রাইমারি-মাধ্যমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকের পদ খালি। নিয়মিত ক্লাসবর্জিত পরীক্ষা এবং ব্যবসায়িক কোচিং চলছে ক্রমবর্ধমান হারে। শিক্ষা হয়েছে বাণিজ্যের পণ্য।

শিক্ষাকে বিজ্ঞানভিত্তিক তো করাই হলো না; বরং একদল এখন আবার বলছেন, আমাদের সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকে মুসলমানি করাতে হবে। এরা রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিতে চায়, কারণ রবীন্দ্রনাথ হিন্দু। নজরুলের ডিএনএ পরীক্ষা চলছে। নজরুল কত শতাংশ মুসলমান আর কত শতাংশ হিন্দুয়ানি—তার হিসাবনিকাশ চলছে। এগুলো প্রশ্রয় দিলে আমাদের অনেক কিছু হারিয়ে যাবে। বাংলা সাহিত্য রচনায় রবীন্দ্র-নজরুল-সহ শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সাহিত্য-সংস্কৃতির এক ভুবন রচনা করে গেছেন। আমরা তাকে আত্মস্থ করে আরও এগোতে চাই। আমাদের সংকল্প হওয়া উচিত ছিল যে, আমরা রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করতে চাই। এখন পর্যন্ত তাঁর ধারেকাছেও আমরা পৌঁছাতে পারলাম না; কীভাবে অতিক্রম করব? সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডল একদিনে গড়ে ওঠে না। বহু মানুষের সৃষ্টির অবদানে, যুগ যুগ ধরে লালনের ফলে মানুষের অগ্রসর মানবিক মননজগৎ তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিতে গিয়ে একদলের অবস্থা আমরা দেখছি। তারা ১০টা কথা বললে—৪টা হয় গালি, ৩টা হয় নোংরা অশ্লীল কথা। কারণ তারা সভ্যতার ভাষা হারিয়ে ফেলছে, মানবিকতার মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে পড়ছে।

গণতান্ত্রিক অধিকার ও সমাজ প্রতিষ্ঠা না করে এখন বুর্জোয়াশ্রেণি সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আসছে। সামন্ত যুগে বুর্জোয়ারা সাম্প্রদায়িকতাকে পরাস্ত করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদে উন্নীত হয়েছে, তখন সে আর এককালে নিজের সৃষ্ট প্রগতির পথে হাঁটতে পারছে না, এগিয়ে যেতে পারে না। তাই পুরোনো সব আবর্জনা আবার নতুন করে তুলে আনছে। এখন পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা অর্থনৈতিকভাবে নজিরবিহীন সংকটে পড়ে দিশাহারা; মানুষের দাবিকে আড়াল করতে তাই তারা ধর্ম ব্যবহার করছে। সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে মানুষকে বিভক্ত করছে, উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার প্রতিযোগিতায় নামলে বড়ো সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ছোট সাম্প্রদায়িক শক্তি হেরে যাবে। তাহলে সাম্প্রদায়িকতা কী দিয়ে মোকাবিলা করবেন? করতে হবে অসাম্প্রদায়িকতা দিয়ে, বিজ্ঞান দিয়ে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবিলা করতে হবে সমাজতন্ত্র দিয়ে, সাম্য চেতনা দিয়ে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতা দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপি দখলে নিয়েছিল। স্বাধীন স্বকীয় সত্তা নিয়ে বাঁচতে হলে আমাদের বুঝতে হবে যে, পুঁজিবাদী শক্তি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবিলা করা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদকে মোকাবিলা করতে গেলে সমাজতন্ত্র লাগবে।

গত শতাব্দীতে বিশেষত, ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ সালের মহামন্দা (Great Depression) পরবর্তীতে আরও কয়েকটি আর্থিক সংকট সারা পৃথিবীতে দেখা দেয়; তখন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতকে সেটা স্পর্শ করেনি। এখন কিউবা দেখাচ্ছে, সমাজতন্ত্রের শক্তিতে চরম প্রতিকূলতা ও সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট দুরবস্থার মধ্যেও সে কীভাবে লড়ছে।

পুঁজিবাদের নেতা যেহেতু সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদকে তো তাদের আদেশ-নির্দেশ মানতে হয়। যাদের গরু-ছাগল পালার যোগ্যতা নাই, তারা হাতি কিনতে গেলে কী অবস্থা দাঁড়ায়? আমাদেরও একই অবস্থা। আমাদের ঘাড় ধরে বোয়িং বিমান, এয়ারবাস, যুদ্ধবিমান কিনতে বাধ্য করছে। আমরা কেন মেনে নিলাম? নিলাম তাদের অনুগ্রহে ক্ষমতায় থাকার মোহে। এভাবে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলে শ্রমজীবী মানুষকে হাত-পা বেঁধে শোষণ বলবৎ রাখা হচ্ছে।

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, অপরাধ বাড়ছে। পুঁজিবাদী শোষণ যত তীব্র হবে, অপরাধ তত বাড়বে। পুলিশ দিয়ে অপরাধ দূর করা যাবে না। যদি তা সম্ভব হতো, তাহলে পুলিশ তো আছেই; কিন্তু অপরাধ কমছে না কেন? যদি এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া যায়, তাহলে ৭০ ভাগ অপরাধ কমে যাবে। পুলিশ বাড়ালে অপরাধ কমবে না; বরং রাষ্ট্রের বোঝা আরও ভারী হবে। মানুষের অধিকার বাড়ালে অপরাধ কমে। শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার অধিকার, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে অপরাধ কমবে না। ঘটা করে হকার উচ্ছেদ করছেন, কিন্তু কেন হকার সৃষ্টি হয় তা দূর করার পদক্ষেপ না নিলে এরা যাবে কোথায়? যে দেশের মানুষ জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, তাদের অনেকে এখন বলছেন, এ দেশ বসবাসের উপযোগী নয়—এর চেয়ে অপমানের আর কী হতে পারে?

’৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল—আমরা বলেছি, প্রয়োজন হলে আমরা ৪০ বছর যুদ্ধ করব, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হব না। এই চেতনায় সেদিন যুদ্ধ হয়েছে। আর আজকে ওরা আমাদের ঘাড় ধরে, আমরা ওদের পা ধরি।

গণ অভ্যুত্থানের পর মানুষ হতাশ হয়েছে ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড দেখে। কিন্তু এই শিক্ষা ভুলে গেলে চলবে না যে, গণ আন্দোলনের জন্য সংস্কৃতি লাগে, শিক্ষা লাগে, আদর্শ লাগে, নেতৃত্ব লাগে। সঠিক আদর্শ, সংস্কৃতি-শিক্ষা, নেতৃত্ব না থাকলে গণ আন্দোলনের শৌর্য তৈরি হয় না, উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর মব-সন্ত্রাস তৈরি হয়। একটা মানুষকে দায়বদ্ধ করে, আরেকটা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে। একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিবেককে বিকশিত করে, অন্যটা ব্যক্তির স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। আন্দোলনের সামনে যারা থাকে, তারা যদি আদর্শহীন, লোভী, সুবিধাবাদী এবং শোষকগোষ্ঠীর অন্তর্গত হয় তা হলে অনেক অর্জন বিসর্জনে যায়। এতে সামনে উদ্দেশ্যহীন বেপরোয়া মনোভাব সমাজের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়।

নারী-শিশুরা সমাজে কতটা নিরাপদ এবং মর্যাদার অধিকারী ও বৈষম্যহীন কর্ম ও জ্ঞান লাভে উন্মুক্ত—সেটা দিয়ে সভ্য সমাজের মানদণ্ড পরিমাপ করা হয়। ’৭১ সালে মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য তরুণ-যুবকেরা জীবন দিয়েছে; আজকে কিশোর গ্যাং নারী-শিশু ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধ করছে। মাদক, পর্ন ইত্যাদিতে আসক্তি বাড়ছে। যে সাংস্কৃতিক মানে, আদর্শবোধে, নৈতিক জাগরণে এই জাতি একদিন দাঁড়িয়ে ছিল, ৫৫ বছরে শাসকগোষ্ঠী জাতিকে কোথায় নামিয়েছে—এগুলো তারই প্রকাশ।

কমরেড খালেকুজ্জামান আরও বলেন, কিছুদিন ধরে আলোচনায় আসছে—স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। স্থানীয় সরকার বলতে বাস্তবে বাংলাদেশে কিছু নাই। সংবিধানে কী আছে দেখেন—চতুর্থ ভাগের তৃতীয় পরিচ্ছদে বলা আছে ‘স্থানীয় শাসন’। ধারা ৫৯। (১) ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’

যেমন ধরি—গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্র। এই ছয়টি স্তরে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা শাসিত হওয়ার কথা। বাস্তবে স্থানীয় শাসনের নামে কেন্দ্রীয় শাসনের সম্প্রসারিত বাহু হিসাবে স্থানীয় শাসন চলছে। স্থানীয় শাসন, ইংরেজি অনুবাদে আছে Local Government; বাংলায় করা হয়েছে স্থানীয় শাসন। Government-এর বাংলা কী শাসন হয়? কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকার ও পার্লামেন্ট আছে; বিভাগে আছে বিভাগীয় কমিশনার (Divisional Commissioner)। অর্থাৎ একজন আমলা বিভাগ চালান। জেলায় আছে District Commissioner; Commissioner-এর বাংলা করা হয়েছে জেলা প্রশাসক। কিন্তু Commissioner-এর বাংলা তো প্রশাসক হয় না। তিনি জেলা চালান। উপজেলায় আছে ইউএনও (UNO—Upazila Nirbahi Officer); তিনি উপজেলা চালান। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বাস্তবে স্বাধীন সত্তা বা ক্ষমতা নেই। উপজেলা থেকে তাদের সিদ্ধান্ত অনুমোদন নিতে হয়। তাহলে বিভাগে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নাই, জেলায়ও নাই। এগুলো সংবিধানের দুর্বলতা। কিন্তু এগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নাই। আছে কী? সংবিধান ছুড়ে ফেলে দাও। সংবিধান পুনঃলেখন কর—ইত্যাদি।

বিগত সরকারগুলো গণতন্ত্রকে ভোটতন্ত্র বানিয়েছে। আর অভ্যুত্থানের পরে জনগণের ক্ষমতায়নের গণতন্ত্রের বদলে শুরু হলো গোষ্ঠী-সন্ত্রাসের মবতন্ত্র। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা মান্য করা হয়, কিন্তু সংখ্যালঘু বা বিরোধীদের মত ও অধিকার সুরক্ষিত থাকে। মবতন্ত্র হচ্ছে মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসী শক্তিতে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া, আইনকে তোয়াক্কা না করা। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়; জীবন-সম্পত্তি, চলাচলের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—সবই বিপন্ন হয়। আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থা বলে কিছু থাকে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, দেশের সংস্কৃতির ভিত ও পরিমণ্ডল, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু, নারী-শিশু, শ্রমজীবী মানুষ।

গণতন্ত্রের ধারণা ইউরোপ থেকে এসেছে। এটা মূর্ত রূপ লাভ করেছে যুক্তফ্রন্টের আন্দোলন ও আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে।

ধর্মনিরপেক্ষতা—এটা নাকি আমরা ভারত থেকে নিয়ে এসেছি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটি যুক্ত হয়েছিল। আর ভারতের সংবিধানে আমাদের চার বছর পর ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনী (The Constitution (Forty-second Amendment) Act, 1976) দ্বারা সংবিধানের প্রস্তাবনায় (Preamble) তিনটি শব্দ যোগ করা হয়: Socialist (সমাজতান্ত্রিক); Secular (ধর্মনিরপেক্ষ); Integrity (অখণ্ডতা)।

১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার পর নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। ১৯৫৩ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নাম রাখা হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’। স্বাধীনতার পর নাম রাখা হলো ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’। মওলানা ভাসানির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ৫৫ সালে ভাসানীর সভাপতিত্বে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে রাখা হয়েছে ‘আওয়ামী লীগ’। তখন এ ভূখণ্ডে ধর্মনিরপেক্ষতার আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল বলে তারা সংগঠনের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিতে বাধ্য হয়েছিল। এতে সংগঠন দুর্বল না হয়ে শক্তিশালী হয়েছে। আদমজী থেকে আন্দোলনকারী শ্রমিকরা প্রথমে স্লোগান তুলেছিল—শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ। তার পরই ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’ স্লোগান উঠে এবং পাকিস্তানি শোষক ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই, শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভেতর থেকে সমাজতন্ত্র উঠে এসেছে। মওলানা ভাসানী ভাষা দিয়েছিলেন—কেউ খাবে, কেউ খাবে না; তা হবে না, তা হবে না। স্বাধীনতার পর জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলে ঘরে ঘরে সমাজতন্ত্রের বাণী পৌঁছে দিয়েছিল। এগুলো আমাদের জাতির সংগ্রাম থেকে উঠে এসেছে। এগুলো সংগ্রামের শিক্ষা, সংগ্রামের অর্জন, সংগ্রামের চেতনা।

আজকে সমাজে অনেকগুলো বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এই বিভ্রান্তি দূর করা আন্দোলনের শর্ত। একটা দল যদি সামনে এগোতে হয়, তাহলে তৎকালীন সময়ে যত বিভ্রান্তি আছে, সেগুলোকে মোকাবিলা করতে হয়। ১৮৪৮ সালে মার্কস-এঙ্গেলস বলেছিলেন, ইউরোপ ভূত দেখছে—কমিউনিজমের ভূত! পৌনে দুই শ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ সকল শাসক বুর্জোয়ারা এখন কমিউনিজমের ভূত দেখছেন। তাদের তল্পিবাহক প্রচার গোষ্ঠী নানাভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সমাজতন্ত্র যেহেতু বিজ্ঞান, আর বিজ্ঞান ক্রমাগত উন্নত হয়; সকল প্রশ্নের মীমাংসা করেই সামনে এগোয়। মার্কসের চিন্তাকে আরও বিকশিত করেছেন এঙ্গেলস; পরবর্তীতে লেনিন, স্তালিন, মাও সেতুং তাকে আরও বিকশিত করেছেন। নতুন নতুন পরিস্থিতির সামনে পড়ে, সমস্যার মুখে সে চিন্তা আরও বিকশিত হবে, উন্নত হবে। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লাখো বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, এখনো চলছে, সেটা থামবে না। কিন্তু বিজ্ঞানের যুক্তির পথেই সে মিথ্যা-বিভ্রান্তিকে আস্তাকুঁড়ের বর্জ্য হিসেবে নিক্ষিপ্ত করবে।

শোষকের চিন্তা যত দ্রুত ছড়ায়, শোষিতের চিন্তা তত দ্রুত যায় না। কারণ মিডিয়া তাদের পক্ষে, বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবীর দল তাদের হয়ে ভাড়ায় খাটে, রাষ্ট্রশক্তি তাদের হাতে। পাকিস্তান আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের বৈষম্য বোঝাতেন। ছাত্রদের সামনে জ্ঞানগর্ভ বিষয় আলোচনা হতো; আর আজকে শিক্ষকদের অনেকে শাসক দলের সুবিধাভোগীতে পরিণত হয়েছেন।

গণ অভ্যুত্থানে জীবন দিয়েছে শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র, নারী-শিশু, জনগণ; আর অভ্যুত্থানের পর নেতা পরিচয়ে হাজির করা হয়েছে ক্লিন্টনের দরবারে। যারা জীবন দিয়েছে, সেই জনগোষ্ঠীর কাছে এরা যায়নি। কৃষকের কাছে, শ্রমিকের কাছে, নারী-ছাত্রদের কাছে তারা যায়নি। এরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে ১৫ মাসেই যেন ১৫ বছরের লুটপাটকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এদের যৌবনের শক্তিকে লোভ-লালসা, ক্ষমতার দিকে ধাবিত করা হলো। গোটা যুবসমাজকে এরা বিপথগামী, লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছে। বুর্জোয়ারা জানে, যুবসমাজের চরিত্র নষ্ট না করতে পারলে পুঁজিবাদ টেকানো যাবে না। উলটা দিক থেকে যুবসমাজের নৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে না পারলে বিপ্লবও হবে না। সেই লড়াইয়ের মধ্যে আমাদের থাকতে হবে। আজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে চলছে। মার্কিন শাসক দস্যুরা নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বেডরুম থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। তাই ভয়ে আমাদের শাসকরা আগেই মাথা বাড়িয়ে দিয়ে বসে আছে। কিন্তু মানুষ এই অপমান ও লুণ্ঠন মেনে নেবে না। তাই আজকে নতুন করে জাগরণের ঢেউ বিশ্বের দেশে দেশে দোলা দিচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, একটা নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা তার ধ্বংসের আগে বড়ো ধরনের একটা ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে ইতিহাসের মঞ্চ থেকে বিদায় নেয়। হাজার হাজার দাসকে হত্যা করে দাস ব্যবস্থা বিদায় নিয়েছে। সামন্তবাদও একই কাজ করেছে। আজকে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদেরও অন্তিম লগ্ন। তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগে ইতিহাসের মঞ্চ থেকে বিদায় নেবে—সে লক্ষণই দেখা যাচ্ছে।

পলিতে গড়া বাংলাদেশ আর সংগ্রামের উত্তাপে গড়া বাংলার জনগণ—এর বাইরে থাকতে পারে না। অতীত ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পতাকা উড়াবে তরুণ-যুবসমাজ। প্রেরণা জোগাবে মানুষ, ঐক্যের বাঁধনে এগিয়ে আসবে শ্রমজীবী জনগণ। আমি সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীবৃন্দ, প্রগতিশীল আন্দোলনের সংগঠনসমূহকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে শোষক এবং শোষিতের সীমারেখা টেনে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। বিরোধগুলোকে বিবেচনায় রেখে ঐক্যের পথ তৈরি করতে হবে। ৯৯ ভাগ অনৈক্যকে পাশে রেখে এক ভাগ ঐক্যকে নিয়ে আসুন, আমরা মাঠের লড়াইয়ে নামি। আর বিরোধসমূহকে বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে নিষ্পত্তি করি। সেই সংগ্রামে ছাত্র ফ্রন্টের কর্মীদের প্রেরণা যেন হয় রবীন্দ্রনাথের গানের কলি—‘…বজ্রানলে আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’; আর নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার—‘…আমি সেই দিন হব শান্ত / যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, / অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’

এই অঙ্গীকারে অতীত সংগ্রামী ঐতিহ্যকে নতুন উচ্চতায়, নতুন ইতিহাস গড়বে—এই আহ্বান রেখে আমি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন উদ্বোধন ঘোষণা করছি।

কমরেড খালেকুজ্জামানের উদ্বোধন ঘোষণার পর একটি সুসজ্জিত র‍্যালি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ, কাঁটাবন ঘুরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। বিকেলে সেখানে আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নতুন কমিটিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত ২-৫ আগস্ট ২০তম কাউন্সিলের মাধ্যমে ২১তম কমিটি নির্বাচিত হয়। ১৬ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটিকে পরিচয় করিয়ে দেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ। নবনির্বাচিত কমিটি—

সভাপতি : রিনা মুরমু; সহসভাপতি : অনিক কুমার দাস; সাধারণ সম্পাদক : হারুন অর রশিদ; সাংগঠনিক সম্পাদক : মিজানুর রহমান; দপ্তর সম্পাদক : ইনজামামুল হক; অর্থ সম্পাদক : অদিতি ইসলাম; প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক : গোলাম মাওলা; স্কুলবিষয়ক সম্পাদক : শারমিন সুলতানা; আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক : সোহাগী সামিয়া।

সদস্য : বিশ্বজিৎ নন্দী; মিরাজ উদ্দিন; সুজন আহমেদ; রাজিব সূত্রধর; তানজিল হোসেন মুনীম, সাইফুল ইসলাম ও সুপ্রকাশ রায়।

— মাসিক ভ্যানগার্ড, অক্টোবর-নভেম্বর ২০২৬

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram