spb-logo

নেহা বোরার বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে: বজলুর রশীদ ফিরোজ

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram
বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ

জেন-জি মানেই সাম্প্রদায়িক বা ডানপন্থী শক্তি নয়; খণ্ডিত প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা সফল হবে না

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৬ষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে ভারতের বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি কমরেড নেহা বোরার শুভেচ্ছা বার্তাকে বিকৃত করে এবং তাঁর বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করে ভারত ও বাংলাদেশে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ। বাসদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। নেহা বোরা ভারতে চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ।

সম্মেলন ও শুভেচ্ছা বার্তার প্রেক্ষাপট

বজলুর রশীদ ফিরোজ জানান, গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৬ষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বক্তব্য রাখার জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বামপন্থী-প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন। পাকিস্তানের ডিএসএফ আসতে না পারার অপারগতা জানিয়ে ভিডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানায়। আইসার পক্ষ থেকে প্রথমে সভাপতি নেহা বোরা এবং পরে অদিতি মিশ্রের আসার কথা ছিল, কিন্তু পাসপোর্ট ও ভিসা জটিলতার কারণে তাঁরা উপস্থিত হতে পারেননি। পরে তাঁরা সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে ভিডিও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান।

তিনি বলেন, সেই শুভেচ্ছা বার্তাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের একদল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ডানপন্থী গোষ্ঠী এবং ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ মনে রাখা দরকার, এটি ছিল বাংলাদেশের একটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের সম্মেলনে ভারতের একটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা।

নেহা বোরা আসলে কী বলেছিলেন

বাসদ সাধারণ সম্পাদক নেহা বোরার বক্তব্যকে মোটা দাগে চারটি অংশে ভাগ করে তুলে ধরেন:

  • প্রথমত, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের ছাত্র-যুবশক্তির অংশগ্রহণ ও বিজয়কে তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বলেছেন, সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ভারতেও তাঁরা গণআন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। ছাত্র-যুবশক্তিকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
  • দ্বিতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটেছে, আর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বামপন্থী, প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক ছাত্র-তরুণরা, যাদের এখন জেন-জি বলা হয়, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। ভারতেও আইসাসহ বামপন্থী-প্রগতিশীল শক্তি হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে।
  • তৃতীয়ত, অতীতের ও বর্তমানের সরকার যেভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করছে, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র-তরুণ ও গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ আন্দোলন করছে; ভারতেও শাসকশ্রেণির একই ধরনের দমনের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে।
  • চতুর্থত, তিনি নির্দিষ্টভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতৃত্বে শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। একইভাবে ভারতে তাঁরা শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও গেরুয়াকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন।

জেন-জি মানেই ডানপন্থী শক্তি নয়

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, জেন-জি মানেই সাম্প্রদায়িক বা ডানপন্থী শক্তি নয়। নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা আলাদা, ভারতের চলমান আন্দোলনের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন। কোন আদর্শ ধারণকারী নেতৃত্ব গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেটিই প্রধান বিষয়। বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান কোটাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসন, লুটপাট, দলীয়করণ ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তাতে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তনকামী বামপন্থী আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংগঠন ও নেতৃত্বের হাতে গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত না হওয়ায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ডানপন্থী ও অতি-দক্ষিণপন্থী শক্তি নেতৃত্বে আসীন হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের প্রশ্রয় দিয়েছে এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাদের সরকার এসেছে। ফলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা অপূরণীয় রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, জেন-জি আন্দোলনে বামপন্থী-প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক শক্তি বিভিন্ন জেলায় নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা পালন করলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিল না। কিন্তু আজ জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালসহ কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বামপন্থী তরুণরাই আন্দোলন করছেন, পুলিশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ফুলবাড়ীতে পরিবেশ-প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনির বিরুদ্ধে, হকার ও রিকশা উচ্ছেদের বিরুদ্ধেও তাঁরা রাজপথে আছেন। অথচ গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ডানপন্থী শক্তির এসব বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই—এখানেই দুই ধারার পার্থক্য।

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রামু, নাসিরনগর, রংপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে বামপন্থী দল ও ছাত্রসংগঠনগুলো সোচ্চার ছিল। দীপু দাসকে পুড়িয়ে হত্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন, পিরের মাজারে হামলা ও পির হত্যা, সুফি, লালনের আখড়া ও বাউলদের ওপর আক্রমণ, মাজার-খানকা-দরগায় হামলা, তৌহিদী জনতার নামে নৌকাবাইচ ও নারীদের ফুটবল খেলায় বাধা—এসবের বিরুদ্ধেও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বামপন্থী শক্তি প্রতিবাদ-প্রতিরোধে ছিল, আছে এবং উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক অপশক্তির বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

গণআন্দোলনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজে শাসকশ্রেণি

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, প্রতিটি গণআন্দোলনে নানা শক্তি ক্রিয়াশীল থাকে, কিন্তু মূল বিষয় হলো ছাত্র-শ্রমিক-জনতা, নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। শাসকশ্রেণির দলগুলো শ্রমিক, কৃষক বা ছাত্রদের যেকোনো আন্দোলনেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায় এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে, কারণ তারা জনগণের শক্তিকে ভয় পায়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার গণআন্দোলনকে ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা বলে প্রচার করেছিল। আবার গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসও জনগণের অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে একে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এভাবে জনগণের দাবি ও আকাঙ্ক্ষাকে আড়াল করে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর গল্প সামনে আনা হয়।

ভারতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময়ও মোদি সরকার ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েছিল। এসআইআরের মাধ্যমে তেরো কোটি ভোটার বাদ দিয়ে দশ কোটি নতুন ভোটার যুক্ত করে নির্বাচনী ব্যবস্থায় ইঞ্জিনিয়ারিং করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের আন্দোলন চলছে, আর মোদি সরকার একে ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্র ও রেজিম চেঞ্জের চেষ্টা বলে প্রচার করছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, মোদি ও ট্রাম্প যেখানে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ‘হরিহর আত্মা’, সেখানে ট্রাম্পের ডিপ স্টেট কেন মোদিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইবে? তাঁর মতে, শাসকশ্রেণির ক্ষমতার মসনদ যখন নড়বড়ে হয়ে যায় এবং পায়ের নিচে মাটি থাকে না, তখনই তারা এ ধরনের আবোল-তাবোল প্রলাপ বকতে থাকে।

সতর্ক থাকার আহ্বান

বক্তব্যের শেষে বাসদ সাধারণ সম্পাদক বলেন, নেহা বোরার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতে যারা ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে চাইছেন এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে খণ্ডিত অংশ প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন, তাদের সেই অসৎ উদ্দেশ্য সফল হবে না; জনগণ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শক্তি দিয়ে তা মোকাবিলা করবে। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের শ্রমজীবী শোষিত জনগণ এবং সর্বস্তরের ছাত্র-যুবশক্তি, তরুণ সমাজ ও জেন-জি প্রজন্মকে এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে উভয় দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে তাকে সমতা ও সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে আন্দোলন বেগবান করার আহ্বান জানান।

কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের পূর্ণ বক্তব্য দেখুন নিচের ভিডিওতে:

ফেসবুকে ভিডিওটি দেখুন

শেয়ার করুন:WhatsAppXTelegram